Monday, September 20, 2021

সালতামামি ২০২০ : সাহেদ-সাবরিনা ও প্রদীপ-পাপিয়া


২০২০ সালের পুরোটাই ছিলো করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিধ্বংসী এক বছর। হতাশা, আতঙ্ক আর বিষাদের বছর! নানান আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্য দিয়েই পার হলো বছরটি। বছরের তৃতীয় মাসে বিশ্বের সঙ্গে মহামারী করোনাভাইরাসে জর্জরিত হয় বাংলাদেশ। তাই বছরটিকে মনে রাখা হবে নানা কারণে। তবে সেখানে বেদনার গদ্বানিই বেশি। বছরটি প্রিয়জন হারানোর বেদনা দিয়েছে অনেক বেশি।
বছরের শুরুতেই মানুষকে হতবাক করে দেয় মহামারি করোনাভাইরাস। চীন থেকে শুরু হয়ে দেশে দেশে যখন ভাইরাস ছড়িয়ে পঙছিলো তখন বাংলাদেশের মানুষ উৎকণ্ঠায় ছিল কবে বাংলাদেশে শনাক্তের খবর পাওয়া যাবে। মার্চের ৮ তারিখে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের নিয়মিত ব্রিফিং-এ জানানো হয়; বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগীর খবর। এরপর শুরু মানুষের মনে ভয়, আতঙ্ক সঙ্গে বিভ্রান্তি। সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। বেশি সংক্রমিত এলাকায় লকডাউন করা হয়। সব ধরণের পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়। এরপরে দফায় দফায় পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের তরফ থেকে করণীয় সম্পর্কে ঘোষণা এসেছে। বেড়েছে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা। টিকা আবিষ্কার হলেও এখন পর্যন্ত তা বাংলাদেশে আসেনি। মানুষের কাছে সাবধান থাকার জন্য বার বার হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আর মুখে মাস্ক পরা – এগুলোই একমাত্র করণীয়।

সাহেদকা- : বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল করোনা টেস্ট জালিয়াতি। উত্তরার বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল ছিল এ জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দু। হাসপাতালটি টেস্ট না করেই করোনা রিপোর্ট দিতো। এছাড়াও সরকার কর্তৃক করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে রোগীদের কাছ থেকে টাকা না নেয়ার কথা থাকলেও রিজেন্ট হাসপাতাল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব অভিযোগ ওঠার পরই দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়। অভিযান চালায় রিজেন্ট হাসপাতালে। অভিযানে গিয়ে অভিযোগের প্রমাণও পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একপর্যায়ে হাসপাতালটির দুটি শাখা (উত্তরা ও মিরপুর) সিলগালা করে দেয়।
এসব মামলায় ১৫ জুলাই ভোরে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর সীমান্তের লাবন্যবতী নদীর কুমড়োর খালের বেইলি ব্রিজের নিচ থেকে সাহেদকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল ও তিন রাউন্ড গুলি ও ২ হাজার ৩৩০ রুপি উদ্ধার করা হয়। গত ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ত্র আইনে করা একটি মামলায় সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত।

জেকেজির সাবরিনাকা- : রিজেন্টের সাহেদ কেলেঙ্কারিতে তোলপাড় শুরুর মধ্যেই ওঠে আসে আরেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ারের নাম। এ প্রতিষ্ঠানটিও করোনাভাইরাস পরীক্ষার টেস্ট না করেই রিপোর্ট সরবরাহ করত। জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরী। এ দু’জনের বিরুদ্ধেই করোনা টেস্ট জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠে। শুরু হয় দেশজুড়ে তোলপাড়। বিশেষ করে ডা. সাবরিনা আসেন আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে। ডা. সাবরিনা ছিলেন জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক। পাশাপাশি তিনি জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান। অভিযোগ উঠার পরই তাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে তার স্বামী আরিফকেও গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জনকেই কয়েক দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। বর্তমানে তারা কারাগারে বন্দি।

মেজর সিনহা হত্যা : বছরের আলোচিত ঘটনার মধ্যে একটা হত্যাকা- পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে ব্যাপক রদবদল ঘটায়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। হত্যার অভিযোগে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ১৫ জনকে আসামি করে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১৪ জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা এখন কারাগারে রয়েছে। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ সংবাদ সম্মেলন করে জানান এই হত্যাকা- ছিল পরিকল্পিত। মেজর সিনহা হত্যার পর পুলিশ এবং সেনাপ্রধান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তাদের দুই বাহিনীর পক্ষ থেকে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেয়া হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তোলেন দুই বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে কিনা। এই ঘটনায় কক্সবাজারে জেলায় পুরো পুলিশ প্রশাসনে রদবদল করা করা হয়।
যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়াকা- : ২২শে ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা পাপিয়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তুলেছিলেন পাপের সাম্রাজ্য। অবৈধ-অনৈতিক ব্যবসার মাধ্যমে কামিয়ে নিয়েছিলেন কোটি কোটি টাকা। যুব মহিলা লীগ নেত্রীর পরিচয়ে অভিজাত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে হেন অপরাধ নেই যা পাপিয়া করেননি। বিয়ের পর স্বামী মফিজুর রহমান সুমনের হাত ধরে রাজনীতি ও অপরাধকা-ে জড়ান পাপিয়া। মাসের পর মাস ব্যবহার করেছেন পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। চলাফেরা করতেন সামনে পিছনে গাড়ির বহর নিয়ে। প্রভাবশালী অনেক রাজনীতিকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগে তাদের সঙ্গে ছবি তুলে প্রকাশ করেছেন নানা মাধ্যমে। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, তদবিরবাজি, চাঁদাবাজি, জিম্মি করে টাকা আদায়, নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা, অশালীন ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং, অন্ধকার জগতের সব পথেই পা দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন অপরাধ জগতের রানী। বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট করেছেন। বিদেশে টাকা পাচারসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলা : সিনহা হত্যাকা-ে দেশে তোলপাড় চলার মধ্যেই ২ সেপ্টেম্বর রাতে ঘটে আরেকটি ঘটনা। সেই রাতে দিনাজপুরের ঘোঙাঘাটে ইউএনওর সরকারি বাসভবনে হামলা চালানো হয়। সরকারি বাসভবনে ঢুকে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখকে নির্মমভাবে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়।
হামলার ঘটনায় ইউএনও ওয়াহিদা খানমের বড়ভাই শেখ ফরিদ উদ্দীন বাদী হয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে ঘোড়াঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ইউএনও অফিসের বরখাস্তকৃত কর্মচারী (মালি) রবিউল ইসলামসহ ৫ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় অন্য ৪ আসামি হলেন, ঘোড়াঘাট পৌর যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা আসাদুল ইসলাম, রংমিস্ত্রি নবীরুল ইসলাম, সান্টু কুমার দাস ও ইউএনওর বাসভবনের নৈশ্যপ্রহরী নাদিম হোসেন পলাশ।
ঘটনার প্রথমেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় হামলার কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে। একপর্যায়ে অভিযোগ ওঠে এ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মী জড়িত। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যুবলীগের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন, ঘোড়াঘাট উপজেলার আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও উপজেলা যুবলীগের সদস্য আসাদুল ইসলাম এবং ঘোঙাঘাট সিংঙা ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা মাসুদ রানা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে দল থেকে বহিষ্কার করে যুবলীগ।
ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ দল। একে একে ইউএনওর দুই গাড়িচালক, বাসভবনের নৈশপ্রহরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রত্যেককেই রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে ওঠে আসে ইউএনও ওয়াহিদার অফিসের বরখাস্তকৃত কর্মচারী (মালি) রবিউল ইসলামের নাম। গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় রবিউল। এরপরই ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার কারণ বেরিয়ে আসে। সে একাই এ হামলা চালায় বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। হামলার ঘটনার ঠিক ২ মাসের মাথায় গত ২০ সেপ্টেম্বর একমাত্র আসামি করে তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়।

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণ : তল্লার মসজিদে অগ্নিকা-ের ঘটনায় লাশের মিছিলের রেশ কাটিয়ে উঠার আগেই ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হন। ওই গৃহবধূ তার স্বামীকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ওই সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী গৃহবধূকে জোর করে ছাত্রাবাসে তুলে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ সময় গৃহবধূর স্বামীকে কলেজের সামনে বেঁধে রাখা হয়। এরপর পুলিশ নির্যাতিতা নারীকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করলে ওসিসিতে তিন দিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান তিনি।
এ ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। গোটা দেশে তীব্র প্রতিবাদে নেমে পড়েন শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, শিক্ষক, বিভিন্ন পেশাজীবী, রাজনীতিবিদসহ সাধারণ মানুষ। ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ শুরু হয়। এর মধ্যেই ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
এ ঘটনায় ভিকটিমের স্বামী বাদী হয়ে ওই রাতেই শাহপরান থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরো তিনজনকে আসামি করা হয়। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন, এমসি কলেজ ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, অর্জুন লস্কর, বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মী রবিউল এবং তারেক আহমদ। মামলার অপর তিন আসামি অজ্ঞাত।
এ ঘটনার পর সিলেটসহ সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযানে চালায়। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯) ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া সিলেট জেলা পুলিশ দুইজনকে, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর আট আসামিকে পর্যায়ক্রমে পাঁচদিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় তারা। জবানবন্দিতে প্রধান আসামি সাইফুরসহ তারেক, রনি ও অর্জুন ধর্ষণের কথা স্বীকার করে। রবিউল ও মাহফুজুর ধর্ষণে সহায়তা করার কথা স্বীকার করে। এরপর ২৯ নভেম্বর আসামিদের ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পান তদন্ত কর্মকর্তা। ৪৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত, আসামিদের জবানবন্দি বিচার-বিশ্লেষণ করে ঘটনার ৯৮ দিনে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।

বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে নির্যাতন করে ভিডিও : এমসি কলেজের গণধর্ষণকা-ে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদে সারা দেশ যখন উত্তাল- এর মধ্যেই ৪ অক্টোবর ঘটে আরেকটি ঘটনা। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ৩২ দিন আগে ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছডড়য়ে পঙে। এর ফলে দেশব্যাপী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়।
পরে জানা যায়, ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় একলাসপুরের কুখ্যাত দেলোয়ার বাহিনী জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের গৃহবধূর (২৮) বাড়িতে হামলা করে তার স্বামীকে ঘরের বাহিরে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। এ সময় তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে। এ ব্যাপারে ওই নারী ৪ অক্টোবর ৯ জনের নাম উল্লেখ করে বেগমগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টা ও বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার দুই মামলায় প্রধান আসামি দেলোয়ার হোসেন প্রকাশ দেলুসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে গত ১৫ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার্জশিটে গ্রেপ্তার দুই আসামি রহমত উল্যা ও মাইন উদ্দিন শাহেদকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই দুই ঘটনাকে ঘিরে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ, আন্দোলন আর ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ-ের দাবি ওঠে। পরে ১৩ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরে মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে আইনটি পাস হয়।

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ- : বছর জুরে কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনায় মানুষ ব্যাপক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। বছরের শুরুতেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বিবিসিকে তিনি বলেন, সন্ধ্যায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চঙে বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য একসাথে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি কুর্মিটোলা এলাকায় বাস থেকে নামেন। সেখান থেকেই অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার মুখ চেপে ধরে পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সেখানেই জ্ঞান হারান ছাত্রীটি। নির্যাতনের এক পর্যায়ে জ্ঞান ফিরে পান তিনি এবং আবার জ্ঞান হারান। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণের বিচার না পাওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরণের চরম হতাশা তৈরি হয়।

ভাস্কর্য ইস্যু : বছরের শেষ দিকে ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ইসলামপন্থী-দলগুলো কঠোর অবস্থান নেয়। ঢাকার দক্ষিণে ধোলাইপাঙ মোড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থী কয়েকটি দল ঐ এলাকায় সমাবেশ করে। এই দলগুলো শেখ মুজিবের ভাস্কর্যকে ‘মূর্তি’ আখ্যা দিয়ে এর নির্মাণ বন্ধ করা না হলে আরো কর্মসূচি দেয়ার হুমকি দেয়। ডিসেম্বরের ৪ তারিখে ভাস্কর্য বিরোধী মিছিল বের করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হক বলেছিলেন দেশে ইসলামি অনুশাসন চালু হলে ভাস্কর্য রাখার অবকাশ থাকবে না।
ভাস্কর্যের পক্ষে আওয়ামী লীগ সমমনা বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রতিবাদ জানায়। এরই মধ্যে কুষ্টিয়াতে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন একটা ভাস্কর্য ভেঙে ফেললে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। পুলিশ এই ঘটনার সঙ্গে জডড়ত সন্দেহে চারজনকে আটক করে। ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে সারা দেশে সরকারি আমলারা এক নজিরবিহীন সম্মেলন করেন। ভাস্কর্যের স্থানে মুজিব মিনার করার দাবি জানায় ঐ দলগুলো। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে ভাস্কর্য তৈরির পক্ষেই অনঙ অবস্থানে দেখা যায়। এক পর্যায়ে প্রথমবারের মত বেশ কিছু ইসলামী চিন্তাবিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসা যাবে।
এবিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, সংবিধানের বাইরে যাবো না, কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানবো না। মিনার নাকি ভাস্কর্য সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। ২০২০ সালে ঘটনাগুলোর মধ্যে ভাস্কর্য ইস্যু এখনো একটা চলমান বিষয়। আরো বৈঠক হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পরিচয়হীন নবজাতক : জন্মই ‘আজন্ম পাপ’। ঘৃণা, লোকলজ্জা, সমাজের চোখ রাঙানি ও তিরস্কারের কষ্টগাথা মায়ের হৃদয় যেন ছিন্নভিন্ন করে দেয়। জন্মের পরই মা-বাবার কোলের বদলে ডাস্টবিনে, ড্রেনে, ফুটপাত ও হাসপাতালের আঙিনায় অনেক নবজাতকের ঠাঁই হচ্ছে। আবার ডাস্টবিন, জঙ্গলে এসব নবজাতককে কুকুর, পিঁপড়া আক্রমণ করছে। এরমধ্যে কাউকে জীবিত আবার কাউকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই পরিত্যক্ত অবস্থায় মিলছে নবজাতক। গত বছরে শুরু থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২১টির মতো অজ্ঞাত পরিচয়ের মৃত নবজাতকের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দিন যত যাচ্ছে পরিত্যক্ত নবজাতক উদ্ধারের সংখ্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...