Thursday, September 23, 2021

সহানুভূতির পুরস্কার!

রাজা সিরাজ
মতিঝিল থেকে মগবাজার হয়ে মিরপুর যাতায়তের জন্য একটিমাত্র সার্ভিসই চালু আছে-যার নাম আল মক্কা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস। সাতরাস্তা থেকে নাবিস্কো পর্যন্ত তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত-মিরপুরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের চলাচলের একমাত্র বাহন ‘আল মক্কা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস। ফলে অফিসে যাওয়া এবং আসার সময় অনেককেই বাদুরঝুলা হয়ে ঝুলে বাসে চড়তে দেখা যায়। কোট টাই পরা কোন লোক যখন বাসের হে-েল ধরে বাদুরের মত ঝুলতে থাকে তখন ফুটে ওঠে মধ্যবিত্তের বহুবিধ বিড়ম্বনার চিত্র। আল মক্কা বাস সার্ভিসটি মিরপুর ১ নম্বর থেকে ছেড়ে মিরপুর ০২, ১১, ১২, কালশি, ইসিবি চত্ত্বর, বনানী, মহাখালি, নাবিস্কো, তিব্বত, মৌচাক, শান্তিনগর, কাকরাইল ও গুলিস্থান হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যাতায়ত করে। বাস সার্ভিসটি চালু করার সময় মালিক পক্ষ ঘোষণা করেছিল এটি পুরোপুরি সিটিং সার্ভিস, দাড়িয়ে কোন যাত্রী বহন করবে না। ভাড়া নির্ধারন করা হয়েছে মিরপুর থেকে তিব্বত পর্যন্ত ২০ টাকা এবং তিব্বত থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ টাকা। কিন্তু কেউ যদি ইসিবি মোড় থেকে ওঠে বনানীতে নেমে যায় তাকেও ২০ টাকাই দিতে হবে। কয়েকদিন সিটিং সার্ভিস চালানোর পরই বেরিয়ে পড়েছে ওদের আসল চেহারা। এই পথে একটিমাত্র সার্ভিস থাকায় কয়েকদিনেই এটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে অনেকের কাছে। তাছাড়া মিরপুর ১০, কাজিপাড়া, শেওড়াপাড়া ও ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল চলাচলকারী বাসগুলো মেট্রোরেলের কাজের কারণে যানজটে পড়ে বিলম্বে পৌঁছায়- ফলে অনেকেই ১৫ টাকা (মিরপুর ১২ হতে মতিঝিল পর্যন্ত এপথে ভাড়া ২৫ টাকা) বেশি ভাড়া দিয়ে আল মক্কায় যাতায়ত শুরু করেন। এ সুযোগে বাস মালিক, ড্রাইভার, কন্ডাক্টার ও সুপার ভাইজারদের যেন ঈদ লেগে যায়। সকাল বেলা অফিসে যাবার সময় এবং বিকাল বেলা অফিস থেকে ফেরার সময় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয় এপথে চলাচলকারী মানুষদের। তিব্বত ও নাবিস্কো এলাকায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে লড়াই করেও বাসে উঠতে পারেন না অনেকে। কন্ডাক্টারকে যদি প্রশ্ন করা হয় ‘এটিতো সিটিং সার্ভিস, দাড়িয়ে যাত্রী নিচ্ছ কেন? সকাল বেলা সে সোজা সাপটা উত্তর দেবে ‘এখন অফিস টাইম, সবাইকে অফিসে যেতে হবে, কাজেই সবাইকে একটু কষ্ট করতে হবে, যাদের এভাবে যেতে অসুবিধা হয় তারা এ গাড়িতে ওঠবেন না, অন্য গাড়িতে যান, অথবা প্রাইভেট কার দিয়ে চলাফেরা করুন। আর বিকাল হলে বলবে ‘আমরা কি কাউকে জোর করে ওঠাই? আপনারাইতো জোর করে ওঠেন, সবাইকেতো বাড়ি যেতে হবে। ওপথে চলাচলকারী যাত্রীদের কাছে এ অত্যাচারটা এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় অত্যাচারটা শুরু হয় ওয়েবিল সাইন হবার পর। বিভিন্ন স্থানে ওদের সুপারভাইজাররা দাড়িয়ে থাকে, ওদের দায়িত্ব হচ্ছে গাড়ীতে কতজন যাত্রী আছে তা ওয়েবিলে লিখে স্বাক্ষর করে দেয়া, ওয়েবিল সাইন হবার পর যে যাত্রীরা ওঠবে তাদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়ার টাকাটা ড্রাইভার ও কন্ডাক্টার ভাগাভাগি করে নেয়, অতএব ওয়েবিল সাইন হবার পর ওদের আসল অত্যাচারটা শুরু হয়। ইসিবি থেকে তিব্বত পর্যন্ত গাড়িতে তিল পরিমান জায়গা ফাঁকা থাকলেও তা ভরার জন্য পুরো রাস্তা জুড়েই থামিয়ে থামিয়ে যাত্রী ওঠায় এবং তিব্বতে ওয়েবিল সাইন হবার পর একেবারে মতিঝিল পর্যন্ত চলে ওদের এই অত্যাচার। একেকজন কন্ডাক্টার ড্রাইভার এভাবেই প্রতিদিন বাড়তি আয় করে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকারও বেশি।
এবার আসা যাক আসল কথায়। পল্টন মোড় থেকে বিকাল ৫ টায় আল মক্কা বাসে ওঠলাম, যাবো মিরপুর। বাসটিতে কিছু আসন খালি ছিল, পল্টন মোড়ের সিগন্যাল পার হতেই সময় লাগলো ২৫ মিনিট। ইতিমধ্যে বাসটির সকল আসন পূর্ণ হয়ে গেছে। কয়েকজন যাত্রী উচ্চ স্বরে বললো ‘এই ক-াক্টার গেট বন্ধ কর, সীট ভরে গেছে। কন্ডাক্টার অর্ধেকটা গেট বন্ধ করে বাকী অর্ধেকটায় নিজে দাড়িয়ে থাকলো এবং পল্টন মোড় পার হতেই ঝরের গতিতে ১০/১২ জন যাত্রী উঠিয়ে নিল। বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কির সামনে আসতেই শুরু হলো যানজট। বিজয়নগর থেকে কাকরাইল মোড় পার হতে সময় লাগলো পুরো এক ঘন্টা। এরপর শান্তিনগর মোড়ে ১৫ মিনিট, মালিবাগ মোড় হয়ে মৌচাক পেরুতে লাগলো আরো আধঘন্টা, এরপর সিদ্ধেশ^রী কলেজের সামনে থেকে শুরু হলো যানজট। মগবাজারের মোড় পেরুতে সময় লাগলো এক ঘন্টা। মগবাজার মোড় পেরুবার পর পেয়ে বসলো ট্রেনের সিগন্যালে, কেটে গেল আরো ১০ মিনিট, এরপর একটানে হাতিরঝিলে ওয়েবিল সাইন হবার পর আরেক টানে বিজি প্রেসের সামনে বসে থাকলাম ২০ মিনিট, এটা বিজয় স্মরণী থেকে তৈরী করা অপরিকল্পিত (যা তৈরি করেছিল ওয়ান ইলিভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার) নতুন রাস্তার যানজট। তিব্বত এসে বাসটি থামতেই শুরু হলো বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের যুদ্ধ। কার ঘারের উপর দিয়ে কে উঠবে সে লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে কয়েকজন তরুণী যেন চিড়া চ্যাপ্টা হয়ে গেল, এর ভেতরেই একজন প্রায় ২৫/৩০ বছর বয়সের মোটামুটি সুন্দরী তরুণী আমার পাশে এসে দাড়াল। তিল ধারনের ঠাই নেই বাসে তারপরও মানুষ বলছে ‘একটু ভিতরে চাপেন ভাই, আমাদেরকেও যেতে দেন। কন্ডাক্টার বললো ‘গাড়ি টান দেন ওস্তাদ, আর জায়গা নাই। ড্রাইভার হঠাৎ এমনভাবে গাড়ি টান দিল যে, বাসের ভেতরের সকল দাড়ানো যাত্রী একে অপরের উপর হেলে পড়লো, মহিলাটি পড়লো আমার মাথার উপর, এ সুযোগে মহিলার দুই দিকে দাড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তরুণীর শরীরের সাথে নিজের শরীরের ঘষা লাগিয়ে স্পর্শসুখ অনুভব করতে লাগলো। বাসটি স্থির হয়ে চলতে থাকার পরও স্পর্শসুখ কা- চলতে থাকায় তরণীর চেহারাটা বিষাদে ভরে ওঠলো, মুখ বাঁকা করে বললেন ‘একটু সোজা হয়ে দাড়ান ভাই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। নারীর অবস্থা দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগলো, জিজ্ঞেস করলাম ‘ কোথায় যাবেন? নারীটি বিরক্তি সহকারে উত্তর দিল ‘মহাখালি আমতলী। চিন্তা করলাম এ সময়টুকুর জন্য তরুণীকে আসনটি ছেড়ে দিলে খুব একটা অসুবিধা হবে না, তাই আসনটিতে তাকে বসতে দিয়ে তার পাশে দাড়ালাম। মহাখালী বাস টার্মিনালের যানজট পেরিয়ে মহাখালি কাঁচা বাজারের কাছে আসার পর কয়েকজন যাত্রী নেমে গেল, এই সুযোগে আরো কয়েকজন যাত্রী উঠল, সেই সাথে উঠল একজন তরুণী। তরুণীটি দাড়িয়েছিল দরজার কাছাকাছি। আমি যাকে আসন ছেড়ে দিয়েছি তিনি আমাকে একটু পেছনে যাবার নির্দেশ দিয়ে তরুণীটিকে ডেকে নিজের কাছে নিয়ে এলেন এবং বাসটি আমতলী আসার পর আসনটিতে তরুণীকে বসিয়ে দিয়ে দ্রুত বাস থেকে নেমে গেলেন, আমি শুধু দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখলাম। আমি বোকার মত দাড়িয়েছিলাম আমার ছেড়ে দেয়া আসনটিকে ধরে। ঠেলা-ধাক্কা খেতে খেতে মনে মনে নিজের সাথেই রাগে ফুঁসছিলাম। বাসটি ইসিবি চত্ত্বরে আসার পর অনেক যাত্রী নেমে গেল, অনেক দাড়িয়ে থাকা যাত্রী সীট পেলেও আমি আমার ছেড়ে দেয়া আসনটির পাশে দাড়িয়ে থাকার কারণে কোন সীট পেলাম না। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে ৯ টা বাজে, পল্টন মোড় থেকে ইসিবি মোড় পর্যন্ত আসতে সময় লাগলো সাড়ে চার ঘন্টা। ইসিবি মোড় থেকে বাসটি ছাড়ার পর আমার আসনটিতে বসা তরুণীটি বিরক্তি সহকারে বললো ‘এবারতো বাসটি অনেক ফাঁকা হয়েছে, মাথার উপর থেকে সরেন না কেন? মেয়েলোক দেখলে খালি ঘষা দিতে মন চায়? তরণীর কথায় খুবই বিব্রত হলাম, বাসের সব যাত্রী তাকালো আমার দিকে। সহানুভূতির এমন পুরস্কারটির (!) বেদনা বুকে নিয়ে কালশী মোড়ে নেমে গেলাম বাস থেকে, এরপর বাকী রাস্তাটুকু পায়ে হেটেই বাসায় পৌঁছালাম। সেই রাতে আর ঘুম আসেনি দুচোখে।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...