Thursday, May 19, 2022

সরকারি জলাশয় ভরাট করে বছিলায় ওয়েস্ট ধানম-ি হাউজিং

মোঃ আলীর হাউজিং-এ চার হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ!

দেশে একদিকে যেমন গ্যাসের অপচয় হচ্ছে তেমনি এই খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের খবরও মিলছে। জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে এই সরকারি পরিষেবাকে কেন্দ্র করে একটি দুর্নীতির চক্র গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে দফায় দফায় বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্যাসের দাম। আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সরকারি সিদ্ধান্তে। সরকারি গ্যাস কোম্পানিগুলোর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে অবৈধ সংযোগের রমরমা ব্যবসা চলছে দেশের নানা জায়গায়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জ্বালানি গ্যাস লুটপাটের এমন চক্রে রাজনীতিক ও প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সঙ্গে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততারও খবর পাওয়া যাচ্ছে।
রাজধানীর বসিলায় মোহাম্মদ আলীর ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিং সোসাইটিতে প্রায় চার হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগের সন্ধান পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায় মো: আলী তিতাস গ্যাসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজসে তার হাউজিংসহ আশপাশ এলাকায় এই অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়েছিল চার হাজারেরও বেশি। সম্প্রতি এক অভিযানে কিছু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। প্রতিটি অবৈধ সংযোগের জন্য মো: আলী ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রতিটি সংযোগ থেকে প্রতিমাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা হারে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আদায় করে মো: আলীর মনোনীত লোকজন। তবে এটাকা মো: আলী একা খান না, এর ভাগ পায় তিতাসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক ক্যাডার ও প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি। মোহাম্মদ আলীর ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিং সোসাইটিতেও রয়েছে বড় রকমের ঘাপলা। অনুসন্ধানে কেচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে গেছে বলা যায়। এই মোহাম্মদ আলীর ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিং সোসাইটির বেশিরভাগ জমিই সরকারী খাস জমি। এগুলো ছিল সরকারী জলাশয়। ভুয়া ক্রেতা-বিক্রেতা সাজিয়ে জাল দলিলের মাধ্যমে কারো নামে প্রথমে পুরনো দলিল বানিয়ে মালিক সাজিয়ে পরে নিজের নামে ক্রয় করে নিয়ে হাউজিং বানিয়েছে মোহাম্মদ আলী। এসব কাজে মোহাম্মদ আলীকে সহযোগিতা করেছে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা, বিনিময়ে তারাও পেয়েছে লাখ লাখ টাকা। সুষ্টু তদন্ত হলে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাবে। এই হাউজিং সোসাইটিতেই মোহাম্মদ আলীর রয়েছে কমপক্ষে ২০ হাইরাইজ ভবন। ১০ তালা বিশিষ্ট প্রতিটি বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্লোরে ৪টি করে ফ্ল্যট বানিয়ে বেশকিছু বিক্রি করা হয়েছে আবার বেশকিছু ভাড়া দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এই হাউজিং এর সমস্ত প্লটগুলো মো: আলী একাই বিক্রি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি কত টাকার মালিক সেটা নিজেও জানেন না। সবসময় বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরতে যান বিদিশে। ভারত, নেপাল, থাইল্যা-, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন ্একঝাঁক বন্ধু-বান্ধব ও সুন্দরী নারী নিয়ে। দেশের নায়িকাদের প্রতি তার ছিল বিশেষ আকর্শণ। সেকারণে সিনেমা প্রযোজনায় হাত দিয়েছিলেন তিনি। সিনেমায় ব্যবসা হোক বা না হোক তা নিয়ে তার কোন ভাবনা ছিল না। নায়িকাদের সাথে ফুর্তি করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য।
অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিং সোসাইটিতে প্লট কিনে হাইরাইজ ভবন তৈরি করেছেন এবং করছেন। তবে দুদক ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের নজর থেকে বাঁচতে বিল্ডিং-এর মালিক ১০ থেকে ২০ জন উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছেন। কাগজপত্র পর্যালোচনা করলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে। বর্তমানে অসংখ্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এই ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিং সোসাইটিতে বাড়ি বানাচ্ছেন।
এছাড়া রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে ওঠা অননুমোদিত কারখানাগুলো বিশেষ কম্প্রেসার সিস্টেম ব্যবহার করে বাসাবাড়ির বৈধ লাইনে থাকা গ্যাসও টেনে নিচ্ছে নিজেদের সরবরাহ লাইনে। এতে করে তিতাস গ্যাসের বৈধ সংযোগ রয়েছে এমন বাসাবাড়িতে গ্যাস পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে বাঁচতে রান্নার কাজে লাকড়ি, কেরোসিন চুলা ও এলপি গ্যাস এখন প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে কামরাঙ্গীরচরবাসীর। তিতাসের গ্যাস না পেলেও ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। কামরাঙ্গীরচরে ব্যাটারি তৈরির কারখানা এবং বিস্কুট-রুটির বেকারিসহ চারশোর বেশি অননুমোদিত কারখানা রয়েছে। যার প্রায় প্রতিটিতে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। ১৯৯৮ সালে প্রথম গ্যাস সংযোগ পান কামরাঙ্গীরচরবাসী। এরপর দীর্ঘ ২২ বছরে এলাকায় জনসংখ্যা, বাসাবাড়ি ও কলকারখানা বাড়লেও এখন নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। গ্যাস ঘাটতি সামাল দিতে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই আবাসিকে সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে সরকার। তবে সে সিদ্ধান্ত লিখিত আকারে ছিল না। উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৩ সালের ৭ মে আবার সীমিত আকারে কিছু আবাসিক সংযোগ দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর জ্বালানি বিভাগ থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আবাসিকে নতুন আবেদন নিতে মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়। পাশাপাশি এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া চলে। অবশেষে ২০১৮ সালের এপ্রিলে দেশে এলএনজি আসে। এখন দেশে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক ১৫ লাখ টনের বেশি এলপিজি সরবরাহ করতে হয়। তবে আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে বার্ষিক প্রায় ১০ লাখ টন। এর মধ্যে মাত্র ২০ হাজার টন এলপিজি সরকারিভাবে বিক্রি হয়। তাই গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে একটা বড় রকমের ঘাটতি রয়েছে, তা সহজেই বোধগম্য। দেশে গ্যাসের আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ। এ খাতে দিনে ৪৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় গত কয়েক বছরে বিতরণ কোম্পানিগুলোতে নতুন সংযোগের জন্য এক লাখের ওপর আবেদন জমা হয়েছে।
অবৈধ সংযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের একটি অনুসন্ধানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিনজিরা, ফতুল্লা, সোনারগাঁ, নরসিংদী ও গাজীপুর- এই পাঁচ এলাকায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৫টি অবৈধ চুলা বা সংযোগ চিহ্নিত করা হয়। প্রতি মাসে প্রতি চুলা বাবদ ৬৫০ টাকা হারে ওই গ্যাসের দাম হয় ৯২ কোটি ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে আবাসিকে ডাবল চুলা ও বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহকের হিসাব যুক্ত হলে টাকার অঙ্ক প্রতি মাসে দ্বিগুণ হবে। উপরোক্ত পাঁচটি এলাকায় অবৈধ সংযোগের এ হিসাব থেকে অনুমান করা যায় সারা দেশে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হচ্ছে গ্যাস খাত থেকে। এছাড়া দুদকের অনুসন্ধানে শিল্প-কারখানা, আবাসিকের আরও বহু দুর্নীতির দিক বেরিয়ে এসেছে, দুর্নীতিবাজরা যেখান থেকে ফি-মাসে শতকোটি টাকা উসুল করে নিলেও সরকারের হিসাবে জমা হয় না এক টাকাও।
জ্বালানি খাতে সরকারি কোম্পানির দুর্নীতিকে ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। এসব কোম্পানির এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার কারণে জনগণের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সিস্টেম লসের নামে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। একদিকে তিতাস যখন সিস্টেম লসের মধ্যে রয়েছে, তখন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ২৫ দশমিক ২০ শতাংশ ‘সিস্টেম গেইন’ করেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে সক্ষমতার সঙ্গে পরিচালনা করলে সরকারি জ্বালানি খাতও লাভজনক হওয়ার কথা। গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা এবং এমন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

গ্যাস চুরির ‘মহোৎসবে’ নেতা-পুলিশ সিন্ডিকেট
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের গাজীরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটি অনুমোদনহীন ডোলার (কিচেন র্যাক) কারখানা। কারখানাটির বড় বড় চুলায় দিনরাত পুড়ছে গ্যাস। আগুনের তাপে লোহা গলিয়ে তৈরি হচ্ছে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য ডোলা। কারখানাটিতে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, অননুমোদিত এই কারখানায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই কাজ চলে। দীর্ঘ এই সময়ে যত গ্যাস পোড়ানো হয় তার সবই আসে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। তবে শুধুমাত্র এই একটি কারখানাই নয়, এ রকম দুই শতাধিক অননুমোদিত ডোলার কারখানা রয়েছে কামরাঙ্গীরচরজুড়ে। যার সবকটিতেই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন মূল্যবান রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সম্পদ গ্যাস পোড়ানো হচ্ছে বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে ওঠা অননুমোদিত কারখানাগুলো বিশেষ কম্প্রেসার সিস্টেম ব্যবহার করে বাসাবাড়ির বৈধ লাইনে থাকা গ্যাসও টেনে নিচ্ছে নিজেদের সরবরাহ লাইনে। এতে করে তিতাসের বৈধ সংযোগ রয়েছে এমন বাসাবাড়িতে গ্যাস পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে বাঁচতে রান্নার কাজে লাকড়ি, কেরোসিন চুলা ও এলপি গ্যাস এখন প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে কামরাঙ্গীরচরবাসীর। তিতাসের গ্যাস না পেলেও ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডোলার কারখানা ছাড়াও কামরাঙ্গীরচরে ব্যাটারি তৈরির কারখানা এবং বিস্কুট-রুটির বেকারিসহ চারশোর বেশি অননুমোদিত কারখানা রয়েছে। যার প্রতিটিতে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। এই অবৈধ গ্যাস সংযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েক নেতা, পুলিশ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সমন্বয়ে বড় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও দেশ রূপান্তরের জিজ্ঞাসায় বিষয়টি স্বীকার করে পরস্পরের ওপর দোষ চাপিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে প্রথম গ্যাস সংযোগ পান কামরাঙ্গীরচরবাসী। এরপর দীর্ঘ ২২ বছরে এলাকায় জনসংখ্যা, বাসাবড়ি ও কলকারখানা বাড়লেও নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। সরকার ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রেখেছে তিতাস গ্যাস র্কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে সংযোগ না পেয়ে আবাসিক ভবনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করেছেন বাসিন্দারা। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই এলাকার যত্রতত্র গড়ে ওঠা চারশোর বেশি কারখানায় ঠিকই মিলেছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। এর মধ্যে কামরাঙ্গীরচরের নয়াগাঁও এলাকায় পলাশ, ছোটলাল মিয়া, হাবীব, ভাগিনা মনির, মোস্তাক, জুয়েল, কালাম, রফিক, টিপু, সবুজ, আকরাম, আনোয়ার, আইয়ুব আলী, বেলায়েত, দুলাল, ফারুক, জয়নাল, মহিউদ্দিন, নান্টু, পারভেজ, রাকীব, রুবেল, সাগর, শফিক ও আজীমের ডোলার কারখানা রয়েছে। এছাড়া রক্সি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় তাহের, তারেক এবং নার্সারি গলিতে মিলন, কালাম ও টিপুর কারখানা রয়েছে। এর বাইরে খোলামোড়া ঘাট, ঝাউলাহাটি, গাজীরঘাট ও আলীনগর এলাকায়ও রয়েছে ছোট-বড় বেশ কিছু ডোলার কারখানা। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কারখানা বিশেষ কম্প্রেসার সিস্টেম ব্যবহার করে বাসাবাড়ির বৈধ লাইনে থাকা গ্যাস টেনে নিচ্ছে তাদের অবৈধ সরবরাহ লাইনে। এতে একই সময়ে কারখানার চুলায় গ্যাস মিললেও বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাস থাকে না। ফলে কামরাঙ্গীরচরবাসীর ভোগান্তি এখন চরমে উঠেছে।
অননুমোদিত কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিতে গড়ে ওঠা চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫ ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের যোগসাজশ আছে বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য। এমনকি তিতাস গ্যাসের ঠিকাদারও এই কাজে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরে আলমের প্রভাব খাটিয়ে তার ভাগিনা পরিচয়ে শাকিল ও মাসুদ নামে দুই ব্যক্তি অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেন। এজন্য প্রতি মাসে কারখানাগুলো থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করেন তারা। তবে মাসুদ ও শাকিল নামে তার কোনো ভাগিনা নেই বলে দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেছেন কাউন্সিলর নুরে আলম। গ্যাসের অবৈধ সংযোগের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও এই কাউন্সিলরের ভাষ্য। অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে কারখানা থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধেও। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নিজের বাসায়ই গ্যাস পাই না। আপনি চাইলে দেখতে পারেন। কামরাঙ্গীরচরে যাই হোক, সবাই আমার নামে দোষ দেন। পুলিশ ও কয়েকজন নেতা আছে তারা এই বিষয়টি দেখেন।’
অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারকারী বেশ কয়েকজন কারখানা মালিকও পুলিশকে চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আমিনুল ইসলাম নামে এক কারখানা মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বাণিজ্যিক লাইন দিচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে অবৈধ সংযোগে কারখানা চালাচ্ছি। এমনিতে ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। তার ওপর পুলিশ, অমুক নেতা, তমুক নেতাকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। এতে আমাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি।’
তিতাস গ্যাসের ঠিকাদার মুজিবুল হক রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কামরাঙ্গীরচরের গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ এখন ঠিকাদারের হাতে নেই। রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ মিলে বিষয়টি দেখে। পুলিশের লোকজন টাকা খেয়ে এসব ঠিক রাখে।’
অবৈধ গ্যাস সংযোগে পুলিশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কামরাঙ্গীরচর একটি অপরাধপ্রবণ এলাকা। পুলিশের কাজ গ্যাসের লাইন দেখভাল করা নয়। এটা তিতাসের কাজ। তিতাস গ্যাস র্কর্তৃপক্ষ লাইন বন্ধ করলে আমরা কী করতে পারি?। আমি চাই এসব সংযোগ বন্ধ হোক।’ কামরাঙ্গীরচর এলাকাটি তিতাসের মেট্রো ঢাকা বিপণন বিভাগ-৫-এর অধীনে পড়েছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিভাগটির উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী অশোক কুমার গোলদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ৬ বার অভিযান চালিয়েছি। আমি নিজেই গিয়েছিলাম সেখানে। আমাদের কাছে তথ্য আছে, লাইন কাটার পর পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা সেগুলো আবার ঠিক করে দেয়। খুব দ্রুত আমরা আবারও অভিযান পরিচালনা করব। তবে পুলিশ যদি সহযোগিতা না করে তাহলে এটা টেকসই হবে না।

অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন নাকি মৃত্যুফাঁদ
রাজধানী ঢাকার আশেপাশে ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন শনাক্ত হয়েছে যেখান থেকে হাজার হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়েছেন বিপুল সংখ্যক গ্রাহক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা না করেই এমন সঞ্চালন লাইন করা হয়েছে যা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিরাট ফাঁদ তৈরি করেছে।
এখন এমন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে ঠিকই, কিন্তু যখন প্রকাশ্যে এমন সরবরাহ লাইন নির্মাণ করা হয় তখন কেন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি?
গাজিপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার জহিরুল ইসলামের বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ গতকালই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
মাত্র এক বছর আগে যখন সংযোগ আসে তখন তার স্ত্রীর বেশ উপকারই হয়েছিল। তিনি জানতেন সংযোগটি অবৈধ। কিন্তু বৈধ হবে এমন আশায় তিনি সংযোগ নিয়েছিলেন। এখন দুদিন ধরে তার বাড়িতে আবার কেরোসিন দিয়ে রান্না হচ্ছে।
শুধু গাজিপুরেই নয়, রাজধানী ঢাকার আশেপাশে তিতাস গ্যাস কোম্পানির বিতরণ লাইনের এলাকাগুলোতে মি. ইসলামের মতো অসংখ্য গ্রাহক অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়েছিলেন।
মূলত গ্যাস সংকটের কারণে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে শিল্প কারখানায় এবং এর এক বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালে জুলাইয়ে বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখে সরকার।
কিন্তু গত চার-পাঁচ বছরে চাহিদা বেড়েছে। বলা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তিতাসের কাজ করতো এমন কন্ট্রাকটররা অবৈধ সংযোগ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
সংযোগ দিতে গিয়ে কোন নিয়মকানুনের বালাই ছিলনা, মানা হয়নি কোন নিরাপত্তা ঝুঁকির দিকও। কোথাও বা গাছের ওপর দিয়েও গ্যাসের পাইপ টানা হয়েছে।
এমন কথাই বলছিলেন তিতাস গ্যাস কোম্পানির নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান। সংযোগ যখন বন্ধ ছিল তখন ১লাখ ৬৫ হাজার সংযোগ অবৈধভাবে নেয়া হয় এবং তিতাসের পক্ষ থেকে তাদের বৈধ হবার সুযোগ দেয়া হয়। এর বাইরেও অসংখ্য অবধৈ গ্রাহক রয়ে যায়। আর এই বৈধ করার প্রক্রিয়ারই সমালোচনা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
কিন্তু যখন প্রকাশ্যে এমন সরবরাহ লাইন নির্মাণ করা হয় তখন কেন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি?

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...