Sunday, September 19, 2021

যেভাবে নারী নেতৃত্বাধীন দেশগুলো করোনা মোকাবিলায় এতটা সফল

আভিভাহ উইটেনবার্গ-কক্স

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বিশ্বের যেসব দেশ সফল হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে মিল কোথায়? মিল হলো, এদের বেশিরভাগের নেতৃত্বেই রয়েছেন নারীরা। আইসল্যান্ড থেকে শুরু করে তাইওয়ান, জার্মানি আর নিউজিল্যান্ড, সর্বত্রই নারীর জয় জয়কার। নারীরাই বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে কীভাবে করোনাভাইরাসের মতো জটিল বিষয় সামাল দিতে হয়। ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ডেনমার্কেও একই কাহিনী। অনেকে অবশ্য বলবেন যে, এসব দেশগুলো ছোট দেশ, বা দ্বীপরাষ্ট্র বা অন্য কোনো ব্যতিক্রমের কথা টানবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জার্মানি অনেক বড় দেশ। দেশটি করোনা মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। অপরদিকে যুক্তরাজ্যও একটি দ্বীপরাষ্ট্র।
কিন্তু সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ। এই নারী নেত্রীরা কী করেছেন, যা পুরুষরা করতে পারেননি?

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের কথাই ধরুন। তিনি সংকটের শুরুতেই সোজাসাপ্টাভাবে মানুষকে বলেছেন, এই রোগ অত্যন্ত ভয়াবহ। দেশের ৭০ শতাংশ নাগরিক এতে আক্রান্ত হতে পারে। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত গুরুতর। একে গুরুত্বের সঙ্গে নিন।” কোনো ধানাইপানাই বা রাখঢাক রাখেননি। তিনি নিজে একে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। নাগরিকরাও তার কথা শুনেছেন। অন্যান্য দেশে যেমন, অস্পষ্টতা ও হুমকির বিষয়টি অস্বীকার করা বা আড়াল করার প্রবণতা দেখা গেছে, তেমনটি জার্মানিতে দেখা যায়নি। দেশটি সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার হার বাড়িয়েছে। অনেক বড় দেশ হলেও দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক অনেক কম। এমনকি অন্যান্য দেশের তুলনায় জার্মানি আগেভাগেই চলাচলের ওপর কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধ লঘু করতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সবার আগে সবচেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দেশগুলোর একটি হলো তাইওয়ান। জানুয়ারিতে যখন এই নতুন রোগের উপসর্গ দেখা দিতে লাগলো, দেশটির নেত্রী সাই ইং-ওয়েন রোগের বিস্তার প্রতিরোধে ১২৪টি পদক্ষেপ নিলেন। এর মধ্যে লকডাউন অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অথচ, অন্যান্য দেশকে অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে শেষ পর্যন্ত লকডাউনের আশ্রয় নিতে হয়েছে। তার দেশের অবস্থা এতই ভালো যে তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ১ কোটি মাস্ক পাঠাচ্ছেন। সিএনএন’র মতে, বিশ্বে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাইওয়ান। দেশটিতে এই মহামারী একেবারেই নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। মারা গেছেন মাত্র ৬ জন রোগী।

নিউজিল্যান্ডে জ্যাসিন্ডা আর্ডের্ন খুব দ্রুতই লকডাউন ঘোষণা করেন। তিনি এই বিষয়ে স্পষ্ট ছিলেন যে, দেশকে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কেন এই ব্যবস্থা তা-ও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনি। দেশে যখন মাত্র ৬ জন রোগী ধরা পড়ে, তখনই তিনি নিউজিল্যান্ডে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের সেলফ-আইসোলেশন বাধ্যতামূলক করেন। শিগগিরই তিনি দেশে বিদেশীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। স্পষ্টতা ও ত্বরিতগতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারায় আজ নিউজিল্যান্ড অনেকটাই সুরক্ষিত। মধ্য এপ্রিল নাগাদ, নিউজিল্যান্ডে মৃতের সংখ্যা মাত্র ৪ জন।

প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন জ্যাকবসদত্তিরের নেতৃত্বে আইসল্যান্ড দেশের সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। কভিড-১৯ রোগের বিস্তার নিয়ে দেশটি হয়ে উঠবে এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাস্থল। দক্ষিণ কোরিয়াকে পরীক্ষার দিক দিয়ে অনেকেই অনুকরণীয় ভাবেন। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে আইসল্যান্ড দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও ৫ গুণ বেশি পরীক্ষা করিয়েছে। দেশটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ট্রাকিং সিস্টেম চালু করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে দেশটিতে লকডাউন আরোপ করতে হয়নি। এমনকি স্কুলও বন্ধ করা হয়নি।

ফিনল্যান্ড সানা ম্যারিন যখন রাষ্ট্রপ্রধান হন ডিসেম্বরে, তখন তিনি ছিলেন বিশ্বের কনিষ্ঠতম রাষ্ট্রপ্রধান। মিলেনিয়াল যুগের এই নেতা করোনাভাইরাস সংকট মোকাবেলায় সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে। তিনি বুঝতে পারেন যে, সবাই পত্রপত্রিকা বা সংবাদমাধ্যম দেখে না। ফলে তথ্যভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন।

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এরনা সলবার্গও কম সৃজনশীল নন। তিনি টেলিভিশন ব্যবহার করে সরাসরি দেশের শিশুদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ৩ মিনিটের প্রেস কনফারেন্স করার মডেল ব্যবহার করেন তিনি। তার আগে ডেনমার্কের নারী প্রধানমন্ত্রী মেত্তে ফ্রেডেরিকসেনও একই মডেল ব্যবহার করেন। সলবার্গ আবার আলাদা সংবাদ সম্মেলন করেন, যেখানে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না। শুধু শিশুরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি সারাদেশের শিশুদের প্রশ্ন শোনেন ও সময় নিয়ে জবাব দেন। ‘

এই দরদ হয়তো কেবল নারীরাই দেখাতে পারেন। তাদের তুলনায় স্ট্রংম্যান বলে পরিচিত নেতাদের কাজ কারবার দেখুন? অন্যদের দায়ী করা, বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা, সাংবাদিকদের খাটো করা, পুরো দেশকে একেবারে পঙ্গু করে ফেলা, সুরক্ষার নামে নজরদারি বাড়ানো ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা – কী করেননি ট্রাম্প, বলসোনারো, অব্রাদর, মোদি, দুতের্তে, অরবান, পুতিন, নেতানিয়াহু?

অনেক বছর ধরেই গবেষণায় উঠে এসেছে যে, নারী নেতৃত্বের ধরণ হয়তো আলাদা, কিন্তু খুবই উপকারি। অনেক রাজনৈতিক সংগঠন ও কোম্পানি যেখানে নারীদের আরও পুরুষের মতো কাজ করতে বাধ্য করছে, সেখানে এই নারী নেতারাই দেখিয়ে দিলেন যে, কেন নারী নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যই পুরুষ নেতাদের শেখা উচিৎ।

(ফোর্বস ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইট থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত।)

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...