Thursday, September 23, 2021

মুজিববর্ষে এটিই আমাদের বড় উৎসব : প্রধানমন্ত্রী

মুজিববর্ষে ঘর পাচ্ছে ৯ লাখ পরিবার

মুজিববর্ষে ৯ লাখ পরিবারকে বাড়ি করে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের ৭০ হাজার পরিবারকে জমিসহ পাকা ঘর করে দেয়া হয়েছে। আগামী মাসে আরও এক লাখ পরিবার পাবে এমন বাড়ি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী এ কার্যক্রম চলমান আছে।
শনিবার (২৩ জানুয়ারি) প্রথম ধাপে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ৭০ হাজার পরিবারের হাতে বাড়ির কাগজপত্র হস্তান্তর করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে সত্যি আমার জন্য একটি আনন্দের দিন। কারণ এই দেশের যারা সব থেকে বঞ্চিত মানুষ, যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, ঘর-বাড়ি নেই। আজকে তাদেরকে অন্তত একটা ঠিকানা, মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পেরেছি।
তিনি বলেন, মুজিববর্ষে আমাদের অনেক কর্মসূচি ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তা করতে পারিনি। করোনা আমাদের জন্য যেমন অভিশাপ নিয়ে এসেছিল, আবার আরেকদিকে আশীর্বাদও। কারণ আমরা এই একটি প্রকল্পেই নজর দিতে পেরেছি। এটাই আমাদের আজকে বড় উৎসব; গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষদের ঘর দিতে পেরেছি। এর চেয়ে বড় উৎসব বাংলাদেশে হতে পারে না। এ সময় সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালীদের নিজ নিজ এলাকার ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর তৈরি করে দেয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এই প্রকল্প জাতির পিতার চিন্তার ফসল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশের মানুষের জন্যই কিন্তু আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি আমাদের কথা কখনো চিন্তা করেননি। সারাজীবন চিন্তা করেছেন এই দেশের মানুষের কথা। স্বাধীনতার পরে তিনি (বঙ্গবন্ধু) মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। এই দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নানাভাবে সামাজিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দারিদ্রের কারণে ভিটেমাটি বিক্রি করে শূন্য হাতে রাস্তায় বের হয়। এইভাবে মানুষগুলো জীবনযাপন করে। তিনি (বঙ্গবন্ধু) স্বাধীনতার পরপরই গৃহহীন মানুষগুলোকে ঘর দেয়ার জন্য গুচ্ছগ্রাম পরিকল্পনা হাতে নেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) নোয়াখালীর চরাঞ্চলে গিয়ে গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করেন। সাধারণ মানুষের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করার চিন্তাটা তিনিই করেছিলেন।
নিজেরও ঘর বাড়ি ছিল না দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সালে দেশে মানুষের শক্তি নিয়েই আমি দেশে ফিরে আসি। আমার কিছু ছিল না। ঘর নেই, কোথায় উঠবো তাও জানি না, কিভাবে চলবো তাও জানি না। কিন্তু তখন আমার মনে একটাই কথা ছিল আমাকে যেতে হবে। কারণ দেশের মানুষ সামরিক শাসকদের হাতে নিষ্পেষিত হচ্ছে, তাদেরকে মুক্তি দিতে হবে, অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, তার জন্য কাজ করতে হবে। এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে, যা আমার বাবা চেয়েছিলেন। সেই আদর্শ সামনে নিয়েই আমি ফিরে আসি। কখনো আমি ছোট ফুফুর বাড়ি, মেঝ ফুফুর বাড়িতে দিন কাটিয়েছি। তখন আমার লক্ষ্য ছিল একটাই, আমি কিভাবে থাকবো সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু দেশের মানুষের কষ্ট-দুঃখ-হাহাকার কিভাবে দূর করবো, সেই কাজ করবো। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদেশ থেকে প্রণোদনা নিয়ে সাহায্য করা হতো না। এরকম দূভার্গ্যে তারা পড়েছিল, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। জাতির পিতা তো সব পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, গৃহহীনদের ঘর দিবেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল করে চিকিৎসা সেবা দিবেন। লেখাপড়ার ব্যবস্থা করবেন, মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন, এটাই ছিল জাতির পিতার লক্ষ্য। তার পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন করতে পারতো তাহলে দেশের মানুষ আরও আগে উন্নত জীবন পেতো।
আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে নৌকার জয় হয়েছিল জনগণের আন্দোলনের ফসল হিসেবে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে আমাদের লক্ষ্য ছিল দেশের খেটে খাওয়া, গরীব, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা এবং বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা। আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও স্বামী পরিত্যক্তদের ভাতা দেয়া শুরু করলাম। গৃহহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্প নিলাম। কারণ তখন দেখা গিয়েছিল আলাদা ঘর দিলে সেটা বিক্রি করে দিতো, শূন্য হাতে ফিরে আসতো। সেই জন্য ব্যারাক করে দিয়ে প্রত্যেককে একটি ঘরের মালিক করে দিয়ে ভূমিহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর দেয়া শুরু করলাম। তিনি আরও বলেন, এরপর কমিউনিটি ক্লিনিক করে চিকিৎসা সেবা মানুষের দোরগোড়ায় নেয়ার ব্যবস্থা করলাম। নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি। আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন জাতি গড়ে তোলার কাজ করলাম। বস্তিবাসীদের মধ্যে যারা নিজের গ্রামে ফিরে যাবে, তাদের জন্য ঘরে ফেরা কর্মসূচি নিলাম। নিজ গ্রামে ফিরে গেলে ছয় মাস বিনা পয়সায় খাবার পাবে, বাচ্চাকে স্কুলে দিতে পারবে, বিনা পয়সায় একটা ঘর করে দিব। সেই সঙ্গে টাকা দেব যেন তারা কাজ করে খেতে পারে। এর মাধ্যমে ঘরে ফেরা কর্মসূচি শুরু করলাম।
তিনি আরও বলেন, গৃহায়ন তহবিল করি বাংলাদেশ ব্যাংকে। এই তহবিলের টাকা আমরা এনজিওদের মাধ্যমে দিলাম, তারা যেন আমাদের ভূমিহীন মানুষদের ঘর তৈরি করে দিতে পারে। এক শতাংশ সার্ভিস চার্জে টাকা দিতাম, ৫ শতাংশের বেশি তারা সুদ নিতে পারবে না, স্যানেটারি পায়খানা তারা বিনা পয়সায় করে দিবে এই শর্তে এনজিওদের দিলাম। এই প্রক্রিয়ায় ২৮ হাজার পরিবার ঘর পেয়েছিল। ১১ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের বিল্ডিং তৈরি করেছিলাম, তার মধ্যে চার হাজার চালু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি এসে তা বন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, ২০২০ সাল জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা একইসঙ্গে পালন করে যাচ্ছি। করোনায় সারাবিশ্ব স্থবির। আজকে আমাদের ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলতে হচ্ছে। আমার খুব আকাঙ্খা ছিল নিজের হাতে দাঁড়িয়ে জমির দলিল তুলে দেব। কিন্তু সেটা পারলাম না। তারপরেও ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে বলে আজকে আমি আপনাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারছি। আমি ধন্যবাদ জানাই, আমাদের সর্বস্তরের প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কারণ তারা নিজেরা আন্তরিকতার সঙ্গে ঘর তৈরিতে কাজ করেছেন। আমার অফিস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রতিনিয়ত তদারকি করেছে, যাতে ঘরগুলো মানসম্মত হয়, কাজগুলো ঠিকমতো হয়।
একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঘর দেয়ার নজির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এত দ্রুত সময়ে আমি জানি না, পৃথিবীর কোনো দেশে কখনো অথবা আমাদের দেশে কোনো সরকার এত দ্রুত এতগুলো ঘর করেছে। এই ঘরগুলো তৈরি করা সহজ কথা নয়। যেহেতু আমাদের যারা প্রশাসনে আছেন তারা সরাসরি ঘরগুলো তৈরি করেছেন, তাতে ঘরগুলো মানসম্মত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা সবসময় আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে। সেই সঙ্গে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি যারা সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান হতে শুরু করে সব জনপ্রতিনিধি সহযোগিতা করেছে। এই একটি কাজে আমরা দেখেছি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এবং সকলেই এই অসাধ্য কাজ সাধন করেছেন। এছাড়া সব শ্রেণীর মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যাতে সবাই মানসম্মতভাবে বাঁচতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, মুজিববর্ষে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি মানুষও গৃহহীন, ঠিকানাবিহীন ও গৃহহারা থাকবে না। হয়তো আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। তাই আমরা সীমিত আকারে করে দিচ্ছি। সব মানুষের জন্য ঠিকানা আমরা করে দেব। কারণ আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষ ঘরে থাকলে আমার বাবা-মা যে ত্যাগ শিকার করেছিলেন এই দেশের মানুষের জন্য। তাতে তাদের আত্মা শান্তি পাবে। আজকে আমরা সবচেয়ে খুশি এত অল্প সময়ে এতগুলো মানুষকে ঠিকানা দিতে পারছি। এই শীতের মধ্যে এই সব মানুষ ঘরে থাকতে পারবে।
তিনি বলেন, আমাদের রিফিউজিদেরকে ভাসানচরে ঘর করে দিচ্ছি। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকার সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে যে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেই কক্সবাজারে খুরশকুলে ঘর করে দিয়েছি। আরও ১০০ বিল্ডিং তৈরি করে দেব। আজকে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ঘর তৈরি করে দিয়েছি। আরও ১ লাখ ঘর তৈরি করবো।
উদ্বোধন শেষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপকারভোগীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে ঘর পাওয়া পারভীন নামে এক নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করেন এবং সুস্থতা কামনা করেন।
পারভীন ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আমার স্বামী কাজ পায় না। মাঝে মধ্যে না খেয়ে থাকতে হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। কোনোদিন ভাবিনি ঘর হবে। আপনি আমাদের ঘর দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন। আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন। কয়েকটি বাক্য বলেই উপকারভোগী এ নারী কৃতজ্ঞতায় কাঁদতে থাকেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলেন, আপনি কাঁদবেন না। আমি মনে করি, এটা আমার কর্তব্য। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির পিতার কন্যা হিসেবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো, এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার স্বপ্ন পূরণ করবো। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে সেজন্য আমি আমার জীবনকে উৎসর্গ করেছি। বাংলাদেশে একটি মানুষও যেন গৃহহীন ও ভূমিহীন না থাকে আমি সেই ব্যবস্থা করবো। সেই সঙ্গে আপনারা যেন আপনাদের জীবন-জীবিকার পথ খুঁজে পান সেই ব্যবস্থাও করবো।
সারাদেশে যারা ঘর পেয়েছেন তাদেরকে ঘরের সামনে একটি করে গাছ, বিশেষ করে ফলজ গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। নদী ভাঙণে যাতে আর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ
মুজিববর্ষে উপকারভোগী ভূমিহীন-গৃহহীন প্রান্তিক মানুষরা আজন্মলালিত স্বপ্ন নীড়ের মালিকানা উপহার পেয়ে নিখাদ তিলোত্তমা হাসি আর আনন্দাশ্রুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। উপহার প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতা বদন্যতায় তারা দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রী জানান, অসহায় মানুষের এমন অনিঃশেষ আনন্দ প্রাপ্তি পূরণই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। আর তিনি এটাকে তার কর্তব্য বলে জানান। তাই আঞ্চলিক গানের কথা সুরে উপকারভোগীরা প্রধানমন্ত্রীকে গরীব দুঃখী মানুষের ‘মা জননী’ হিসাবেও আখ্যায়িত করেন।
গত ২৩ জানুয়ারি সকালে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপকারভোগী ও প্রধানমন্ত্রী এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন।
একসঙ্গে সর্বমোট ৬৯ হাজার ৯০৪ জন ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদানের ঘটনা বিশ্বে এটিই প্রথম। এদিন জমিসহ একক ঘর প্রদান করা ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারকে। আর ব্যারাক হাউজে তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। মুজিববর্ষে পিতার স্বপ্ন পূরণের সারথি হিসেবে আরেকটি মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। উদ্বোধন ঘোষণা শেষে প্রধানমন্ত্রী গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সে চার জেলার উপজেলা প্রান্তে মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রী খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রাম, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুর গ্রাম, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিভিন্ন উপজেলার মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা উপকারভোগীদের হাতে বাড়ির চাবি, দলিল ও সনদ হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তার সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানটি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয় এবং ৪৯২টি উপজেলা প্রান্ত ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে মুজিববর্ষে দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নেন। উপকারভোগীরা মুজিববর্ষে দুই শতক জমিসহ ঘর উপহার পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করেন। একইসঙ্গে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন পূরণে প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো স্বপ্নযাত্রার সারথি হওয়ার দৃঢ়তা প্রকাশ করেন এবং বর্তমানের ন্যায় ভবিষ্যতে যেকোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এজন্য প্রধানমন্ত্রীও মুজিববর্ষে গৃহহীন-ভূমিহীনদের জমিসহ ঘর উপহার দেওয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত সরকারের সকল স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ঘরগুলো তৈরির কাজে জড়িতদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। সরকার মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহহীনদের জন্য ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বাড়িগুলো নির্মাণ করেছে। একইসঙ্গে ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন আশ্রয়ণ প্রকল্প মুজিববর্ষ উদযাপনকালে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪টি প্রকল্পের অধীনে ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণ করা হয়েছে।
উপকারভোগী আফরিনার অনুভূতি শোনেন প্রধানমন্ত্রী। উপকারভোগী আফরিনা শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করে বলেন, ‘আপনি কি ভালো আছেন?’ তার জবাবে প্রধানমন্ত্রীও বলেন, ‘জি, ভালো আছি।’
এরপর আফরিনা আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘মোর নাম আফরিনা। মোর আগে কিছুই আছিল না। স্বামী সন্তান নিয়া মাইনষের জমিত খুব কষ্টে আছিনু। এখন মোক শেখের বেটি শেখ হাসিনা জায়গা-জমি-ঘর-বাড়ি-কল-পায়খানা সবকিছুই উপহার দিছেন। স্বামী সন্তান নিয়া সুখে থাকিম। এখন মুই খুব খুশি। তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তোমরা আরও দীর্ঘজীবী হন। আর এই দেশের উন্নতি করেন, সুস্থ থাকো, ভাল থাকো।’
তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাগফেরাত কামনা করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হামরা তোমার জন্য একটা ভাওয়াইয়া গান বানাইছি। তোমরা যদি একটু শোনেন হামরা খুব খুশি হইমো।’
এরপর তারা ওঠেন, ‘বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যা হামার শেখ হাসিনা…. আর দুঃখী মাইনষের দেশ হামারে সোনারও ঠিকানা। দেশ-বিদেশে নাইরে তুলনা…‘গরীবেরও মা জননী হামার প্রধানমন্ত্রী, জমি দেন ঘর দেন হামরা হইলো খুশী…… ‘মা জননী হামার প্রধানমন্ত্রী’ ওরে দেশরতœ হামার প্রধানমন্ত্রী’ মা জননী হামার প্রধানমন্ত্রী, ওরে দেশরত্ম হামার প্রধানমন্ত্রী।’
প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাওয়াইয়া গান শুনে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানিয়ে হাস্যমুখে বলেন, ‘খুব ভাল লাগছে। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ। মেলা বসে গেছে নিশ্চয়ই শীতের পিঠা খাওয়া হচ্ছে। আপনারা সবাই ভালো থাকেন।’
হবিগঞ্জ চুনারুঘাট উপজেলার ইকরতলী গ্রামের উপকারভোগী নুরুল হুদা মতবিনিময় করেন। তিনি পেশায় সিএনজি চালক। তিনি বলেন, ‘আপনি মুজিব শতবর্ষে আমারে দুই শতক জায়গাসহ খুবই সুন্দর একটি ঘর উপহার দিছেন। তাতে আমি খুব খুশি। আমি এখন বউ-বাচ্চা নিয়া খুবই শান্তিতে থাকতে পারমু। আর আপনার জন্য দোয়া করমু। আল্লায় যেন আপনার হায়াত বাড়ায় দেয়। আমার মতো আরও গরীব-দুঃখীকে যেন সাহায্য করতে পারেন।’
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি খুব খুশি হলাম। আপনার এটা পেয়েছেন। ভালোভাবে থাকেন। সেটাই চাই।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ বালিয়াডাঙ্গীতে গৃহহীন ভূমিহীনদের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে গম্ভীরা গান পরিবেশন করা হয়। গম্ভীরা শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম গম্ভীরা শুনেছিলাম ১৯৭৪ সালে নাটোরে (উত্তরা গণভবন) আব্বা নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় নানা-নাতি প্রথম এসে গম্ভীরা শোনায়। তাই এখন শুনবো অবশ্যই। খুব ভালো।’ পরে তিনি গম্ভীরা শোনেন।

‘কুনুদিন স্বপ্নেও ভাবচি না এমন ঘরে থাকবাম’
প্রায় ৩৫ বছর আগে মজলিশ খাঁ নামে এক দিনমজুরের সঙ্গে বিয়ে হয় কুলসুমার। বিয়ের পর থেকেই অভাব-অনটনে চলে তাদের সংসার। বিয়ের দুই বছর পর এক কন্যাসন্তানের মা হয় কুলসুমা। কোনোরকমে তিনজনের সংসার চলছিল তাদের। কয়েক বছর পর আরও দুইটি ছেলে সন্তানের মা হন তিনি।
কুলসুমা ও তার স্বামী দুজনই দিনমজুরের কাজ করতেন। দুজনে কাজ করে পাঁচজনের সংসার কোনো রকমে চলছিল। মেয়ে ও ছেলেদের ভর্তি করা হয় গ্রামের পাশের গাড়িগাতি নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বড় ছেলে মোফাজ্জল যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, হঠাৎ করে শুরু হয় তার দুই পায়ে ব্যথা। তখন স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধপত্র খাওয়া শুরু হয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই ছোট ছেলে মোখলেছেরও একই রকম দুই পায়ে ব্যথা শুরু হয়। তিন থেকে চার মাস পর মোফাজ্জল ও মোখলেছের পা অবশ হয়ে যায়। এদিকে বয়সের ভারে কুলসুমার স্বামী মজলিশ খাঁ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই থেকে শুরু হয় তাদের সংসারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা।
বেঁচে থাকার জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী ছোট ছেলেকে নিয়ে কুলসুমা খাতুন শুরু করেন ভিক্ষা। দিনে কখনো ২০০ কখনো ৩০০ টাকা উপার্জন হতো। এই টাকা দিয়ে কোনো রকমে চলতো তার সংসার।
পরিবারের প্রতিবন্ধী দুই ছেলেসহ তারা থাকতেন মাটির ভাঙা ঘরে। বর্ষায় ঘরের চালের ফুটো দিয়ে পড়া পানিতে ভিজতে হতো পরিবারের সদস্যদের। তবে এখন আর এই কষ্ট করতে হবে না তাদের। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের কল্যাণে টিনের ছাউনি দেওয়া পাকা ঘর পেয়েছেন তিনি।
কুলসুমা খাতুন বলেন, ১২ বছর ধইরা ভিক্ষা কইরা আমি আমার প্রতিবন্ধী দুই পোলা লইয়া খেরের ভাঙা ঘরে থাহি। সরকার আমারে বিনা টেহায় ঘর বানাইয়া দিছে। কুনুদিন স্বপ্নেও ভাবচি না এমন ঘরে থাকবাম। এই বলে ওই ভিক্ষুক নারী খুশিতে কাঁদতে শুরু করেন।

নেত্রকোনায় গৃহহীনদের ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
‘মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না’— সরকারের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নেত্রকোনায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে প্রশাসন থেকে ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও তাতে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন উপকারভোগী ও স্থানীয়রা। জেলার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দার লেংগুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে এই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।


নিবন্ধিত উপকারভোগীদের অভিযোগ, লেংগুড়া ইউনিয়নের আশ্রয়ন প্রকল্পে ১৬টি ঘর নদী তীরবর্তী। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে মেঝে নিচু হওয়ায় বন্যার সময় পানিতে এই ঘর ডুবে যাবে। এছাড়া ঘরে ইট, কাঠ ও সিমেন্ট যা ব্যবহার হয়েছে ও হচ্ছে সেসবও নিম্নমানের। অথচ সরকার মুজিববর্ষের ঘরে ভালো মানের ইট-সিমেন্ট ব্যবহার করার শর্তে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ঘরপ্রতি বরাদ্দ দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, নেত্রকোনায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে ১ হাজার ৩০ জন গৃহহীনকে ঘর বানিয়ে দেওয়ার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরমধ্যে জেলার ১০ উপজেলায় বিভিন্ন শ্রেণিতে এসব উপকারভোগীর মাঝে সরকারি ঘর হস্তান্তর করার সব প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ হয়েছে। এর মাঝে শুধুমাত্র কলমাকান্দায় ১০১টি ঘর নির্মাণ কাজ এখনও চলমান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘ঘরগুলো উঁচু না করায় উপকারভোগীরা এটার শতভাগ সুবিধা পাবেন না। এসব বাড়ি নির্মাণে দরকারের চেয়ে বেশি পরিমাণে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে, একে তো সিমেন্ট কম দেওয়া হয়েছে।’ তাছাড়া ভালো কোম্পানির সিমেন্টও ব্যবহার করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদীর তীর ঘেঁষে নিচু স্থানে মুজিববর্ষ উপলক্ষে এই বাড়িগুলো বানানো হয়েছে। ফলে পাহাড়ি ঢলে ঘরগুলো তলিয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য বৃথা যাবে। উপকারভোগী হয়ে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে ঘরের বাসিন্দাদের।
ঘরপ্রাপ্তির তালিকায় নাম থাকা এক নারী নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, “ঘরের মেঝে নিচু হয়েছে, এখানে পানি এলে ঘরে থাকা যাবে না এটা আমি টিএনও (ইউএনও) স্যারকে জানালে তিনি বলছেন, ‘পানি এলে রাস্তায় থাকবা, পরে সরকার আবার তোমাদের ত্রাণ দেবে।’ আমরা গরিব মানুষ কী আর বলবো। বেশি বললে যদি ঘর না পাই, তাই আর কিছু বলিনি।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘কাউকেই রাস্তায় থাকার কথা বলা হয়নি। পাহাড়ি ঢল এলে উপজেলা সদরও পানিতে তলিয়ে যায়। আর ঘর নির্মাণের বাজেট মেঝে উঁচু করার আলাদা বরাদ্দ নেই। তাই মেঝে উঁচু করা হয়নি।’
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক কাজী মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘প্রথমদিকে ঘরে নিম্নমানের কাজের খবর পেয়েছিলাম। এরপর শুরুতেই ইটও পরিবর্তন করা হয়েছে।’ এরপর কোনও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

মুজিববর্ষে ঘর পাচ্ছে ৯ লাখ পরিবার
প্রধানমন্ত্রী শনিবার প্রথম ধাপে ৬৯ হাজার ৯০৪ জনের কাছে বাড়ি হস্তান্তর করবেন
সারা দেশে ভূমি ও গৃহহীন ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২ পরিবারকে বাড়ি নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষে’ এটিই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপহার।
২০২০ সালের ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে দেশের একটি মানুষও গৃহহীন বা ভূমিহীন থাকবে না। তার এই মহান ব্রতকে সামনে রেখেই মুজিববর্ষে প্রতিটি গৃহহীন-ভূমিহীন পরিবারই পাচ্ছে দুর্যোগ সহনীয় সেমিপাকা ঘর, আর দুই শতাংশ জমির মালিকানা। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমির মালিকানাসহ সুদৃশ্য রঙিন টিনশেডের সেমিপাকা বাড়ি পাবেন গৃহহীন ও ভূমিহীনরা। সারা দেশে গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণের এই মহাযজ্ঞ প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রথম ধাপে ৬৯ হাজার ৯০৪ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার বঙ্গবন্ধু কন্যার উপহারের ঘর পেয়েছেন। এরমধ্যে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে দুই শতাংশ খাস জমির মালিকানা দিয়ে বিনা পয়সায় দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রদান করেছেন। এছাড়া ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪টি গ্রামে ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণের মাধ্যমে ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে সেসব ঘর সুবিধাভোগীদের কাছে হস্তান্তর করেন। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই আরো ১ লাখ পরিবারকে গৃহ বরাদ্দ করা হবে। আর চলতি বছর অর্থাৎ মুজিববর্ষেই আরো ৭ লাখ ১৫ হাজার ৭১৮ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে স্বপ্নের নীড়সহ দুই শতক জমির মালিকানা দিয়ে স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দেওয়া হবে সরকারিভাবে।
দেশের বিপুলসংখ্যক ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে নিজস্ব ঠিকানা অর্থাৎ জমির মালিকানাসহ সরকারি খরচে নির্মিত বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সামনে আরেকটি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছেন, যা নজিরবিহীন। প্রায় ৫০০ বর্গফুটের প্রতিটি বাড়িতে থাকবে দুটি বেড রুম, একটা কিচেন রুম, একটা ইউটিলিটি রুম, একটা টয়লেট ও একটা বারান্দা। দুর্যোগ সহনীয় এসব ঘর হবে টেকসই এবং প্রতিটি ঘরেই থাকবে সোলার সিস্টেম আর বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা। প্রতিটি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং রঙিন টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি সবগুলো বাড়ি সরকার নির্ধারিত একই নকশায় হচ্ছে।
মুজিববর্ষের সময়কাল ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই এসব ঘর নির্মাণকাজ শেষ করতে চায় সরকার। ইতিমধ্যে সব ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। ‘আশ্রয়নের অধিকার শেখ হাসিনার উপহার’এই শ্লোগানকে সামনে রেখে মুজিব শতবর্ষে দেশেই নির্মিত হচ্ছে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য এই ‘স্বপ্নের নীড়’।
সরকারের হিসাব মতে, সারা দেশে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৯৭, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৬ হাজার ৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৯৭, রংপুর বিভাগে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৩৪, রাজশাহী বিভাগে ৯৬ হাজার ৫০৪, খুলনা বিভাগে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪১১, বরিশাল বিভাগে ৮০ হাজার ৫৮৪ এবং সিলেট বিভাগে ৫৫ হাজার ৬২২টি গৃহহীন পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে জমি ও ঘর নেই এমন পরিবারের পাশাপাশি ১০ শতাংশ জমি আছে কিন্তু জরাজীর্ণ বাড়ি এমনও পরিবার রয়েছে।

সাবেক এমপি জজ মিয়াও পেলেন ঘর
শনিবার ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে জমি ও বাড়ির দলিল হাতে সাবেক এমপি এনামুল হক জজ- সমকাল
শনিবার ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে জমি ও বাড়ির দলিল হাতে সাবেক এমপি এনামুল হক জজ- সমকাল
সারাদেশের প্রায় ৭০ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে গতকাল জমি ও ঘর দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের এক সাবেক এমপিও ঘর পেয়েছেন। এক সময়ের প্রভাবশালী ওই এমপির ঘর নেওয়ার খবরে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।
জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এনামুল হক জজ মিয়া দীর্ঘদিন গফরগাঁওয়ের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে এক রুমের এক বাসায় ভাড়ায় থাকতেন। গতকাল ঘর পেয়ে তিনি বলেন, ‘এক সময় আমার সবই ছিল। বর্তমানে আমি নিঃস্ব। আমার এই অসহায় অবস্থায় আমাকে একটি ঘর প্রদান করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ফাহ্মী গোলন্দাজ বাবেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
পরে তিনি বলেন, ‘আমি ক্যাডেট হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে অধ্যয়নরত অবস্থায় পরিচয় হয়েছিল এইচএম এরশাদ (সাবেক রাষ্ট্রপতি) সাহেবের সঙ্গে। সেই পরিচয়ের সুবাদেই এরশাদের পালিত কন্যা নাজমা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় পার্টি থেকে নমিনেশন পেয়ে গফরগাঁও থেকে এমপি নির্বাচিত হই। আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।’
তবে এক সময় এমপি হলেও পরে তার জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে শুরু করে। এক পর্যায়ে নাজমা তাকে ডিভোর্স দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি জমান। পরে রাজধানীর মিরপুরে এক শিক্ষিকাকে বিয়ে করেন তিনি। সেখানে তার দুই মেয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, পিতার সব সম্পত্তি বিক্রি করে রাজধানী ঢাকায় জমি কিনে বাড়ি করেন। এটা তার দ্বিতীয় স্ত্রী-সন্তানের নামে ছিল। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তিনি গফরগাঁওয়ে গিয়ে বাস করতে শুরু করেন। সেখানে তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। তাদের একটি মেয়ে আছে।
এনামুল হক বলেন, ‘এখন আমি নিঃস্ব। সহায়-সম্পত্তি কিছুই নেই আমার। রিকশা ভাড়া জোগার করতে না পারায় হেঁটে চলতে হয়।’ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, প্রথম স্ত্রী ছেড়ে যাওয়ার পর এলোমেলো জীবনযাপন শুরু করেন এনামুল হক জজ মিয়া।
গতকাল শনিবার সকালে গফরগাঁও উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এনামুল হকসহ ২০০ পরিবারের মধ্যে জমি ও ঘর প্রদান করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফাহ্মী গোলন্দাজ বাবেল, উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন বাদল, পৌর মেয়র এসএম ইকবাল হোসেন সুমন, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আতাউর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাবেরী রায়, গফরগাঁও প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবদুল্লাহ্ আল-আমিন (বিপ্লব), ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল মনি, রোকছানা বেগম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...