Wednesday, July 6, 2022

মানুষ কেন ধর্ষক হয়

শুধু যৌনতার আকর্ষণ পুরুষকে ধর্ষক বানায় না। নিয়ন্ত্রণহীন যৌন আকাঙ্খার পাশাপাশি পুরুষের চারিত্রিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে ঘটে ধর্ষণ। ব্যক্তির বেড়ে ওঠা, তার পরিবেশ, শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি নিয়ামক বিবেচনায় নিয়ে একজন পুরুষের ধর্ষক হয়ে ওঠার গতিপথ নির্ণয় করা যায়।
সুস্থ পরিবেশ ও সুশিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা পুরুষটি তার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আবেগের পরিণতি বাছবিচারের মাধ্যমে সঠিক আচরণ নির্ধারণ করতে পারে। তার নীতির জায়গাটি থাকে পোক্ত। আবেগ বা প্রলোভনে তার নৈতিকতায় ফাটল ধরে না। একজন ‘সুস্থ’ পুরুষ ধর্ষণের কথা ভাবতেও পারে না। জন্মের পর প্রথম পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে একটি শিশুর ব্যক্তিত্বের গঠন সম্পন্ন হয়ে যায় বলে মত দিয়েছেন বিখ্যাত মনঃসমীক্ষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। তাঁর এই মত আমলে নিয়ে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে অভিভাবকেরা মনোযোগী হলে অনেক সামাজিক ও মানসিক সমস্যার প্রতিকার সম্ভব। এ প্রসঙ্গে মেখলা সরকারের অভিমত, বিকাশকালকে গুরুত্ব না দিলে, যা ক্ষতি হওয়ার তা শৈশবেই হয়ে যায়।
আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে একধরনের দূরত্ব তৈরি করে রাখা হয়। এই দূরত্ব বিশেষ করে মেয়েদের ব্যাপারে ছেলেদের একটি অনাবশ্যক ‘কৌতূহল’ তৈরি করে। মাত্রাতিরিক্ত ‘কৌতূহল’ বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে, নেয়ও।
নারীর প্রতি পুরুষের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতাকেন্দ্রিক। এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষকে চেতনে বা অবচেতনে নারীর বিরুদ্ধে বল প্রয়োগে প্ররোচিত করে। নারীর ওপর পুরুষের যৌন সহিংসতা ব্যাখ্যায় ক্ষমতার প্রপঞ্চটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এ জন্য ছোট থেকেই পরিবারসহ সর্বত্র নারীর প্রতি পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাবলীল সম্পর্ক ও সমান অধিকারের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
অভিভাবকদের দায়িত্ব সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য তাদের বুঝিয়ে দেওয়া। ছেলেকে ‘পুরুষ’ হিসেবে গড়ে না তুলে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলা।
পুরুষকে ধর্ষক বানানোর দায় শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও বর্তায়। শিক্ষার উদ্দেশ্য সনদসর্বস্ব জনশক্তি তৈরি নয়। মানুষ গড়তে না পারলে শিক্ষা অর্থহীন। আমাদের দেশে যৌনশিক্ষা নিয়ে একটা ‘ছি ছি’ রব আছে। অথচ বিষয়টি যৌন সহিংসতার মতো অপরাধ নিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ধর্ষণ রোধে কঠোর আইন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন দরকার আছে। তবে সবার আগে ধর্ষক উৎপাদনের অনুষঙ্গ ও কারখানা সমূলে উৎপাটন করতে হবে। সেই কাজটা সমাজের, প্রশাসনের এবং সব মিলিয়ে সরকারের।
ভারতবর্ষে প্রতি ১৫৫ মিনিটে একটি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষিত হয়? প্রতি ১৩ ঘন্টায় একটি ১০ বছরের কম বয়সী শিশুকে যৌন নিগ্রহ করা হয়। প্রতি দুটি শিশুর মধ্যে একজন যৌন লালসার শিকার এবং এদের মধ্যে ৫৬% ছেলে। এই হিসেবে প্রতি সেকেন্ডে কোনো না কোনোভাবে ভারতবর্ষের কোনো না কোনো শিশু নোংরা স্পর্শ পাচ্ছে তার পরিচিত কারোর থেকে। হ্যাঁ, সবথেকে ভয়ংকর হল, শিশু নিগ্রহের ক্ষেত্রে অপরাধী ৯০% ক্ষেত্রে পরিচিত। তাই, কোনোভাবেই শিশুটি নিরাপদ নয়।
পেডোফিলিয়া। ‘উইকি’ বলে এটি একটি মানসিক রোগ, রোগের লক্ষণ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ ও যৌন পছন্দ অনুভব করা এবং প্রিপিউবারসেন্ট বা ১৩ বছরের কম বয়সীদের সাথে সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি পোষণ করা। তাই ধর্ষণের সাথে শিশু নিগ্রহকে একই সারিতে ফেলা উচিত হবে না। ধর্ষণ একটি পরিকল্পিত অপরাধ। পেডোফিলিয়া একটি মানসিক রোগ। যদিও সমস্ত আইনে পেডোফিলিয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটা নয় যে সমস্ত পেডোফিলিক মানুষ শিশু নিগ্রহ করে। কারোর ক্ষেত্রে শিশুটিকে ছোঁয়া বা কোলে নেওয়াতেই তার যৌন তৃপ্তি ঘটে। সাধারণত পেডফিলিকরা পুরুষ হয়, তবে মহিলা পেডোফিলিকও আছে। একবার নয়, পেডোফিলিকরা বারবার অপরাধ করে। পরিসংখ্যান বলে একজন পেডোফিলিক সারাজীবনে গড়ে ৪৮টি বাচ্চার সাথে জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে! এমনকি এদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষকতা বা শিশুসুরক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থাকে যাতে বেশি সংখ্যক শিশুর সংস্পর্শে থাকতে পারে। আরো বেশি চিন্তার বিষয় যে এরা খুব জনপ্রিয় হয় বাচ্চাদের কাছে। কারো ধারণাতেও আসবে না যে যেই মানুষটাকে আপনি সবথেকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন সে স্বপ্নে আপনার সন্তানটিকে কামনা করে!
পেডোফিলিয়া কেন হয় সে নিয়ে অনেক ‘স্টাডি’ আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেডোফিলিক মানুষ ছোটোবেলায় যৌন নিগ্রহের শিকার বা খুব নোংরা যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। বুঝতে পারছেন অবস্থাটা? একজন পেডোফিলিক মানুষ যদি ৪০টি শিশুকে নিগ্রহ করে এবং তার মধ্যে ১০% বা ৪ জন যদি পেডোফিলিক হয়ে যায় তবে তাদের মাধ্যমে তিরিশ বছরের ব্যবধানে ১৬ জন পেডোফিলিক তৈরি হতে পারে। হ্যাঁ, সংখ্যাটা গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়ছে।
সমস্ত রোগের মত পেডোফিলিয়ারও চিকিৎসা রয়েছে। যদিও খুব কম পেডোফিলিক নিজে কাউন্সেলিং করাতে যান। গবেষণায় দেখা গেছে রাগ, ‘রিজেকশন’, ভয় এগুলো পেডোফিলিয়া কমাতে তো পারেই না, বরং যৌন নিগ্রহ পরোক্ষভাবে বাড়ায়। মানসিক চাপ ও অস্থিরতায় পেডোফিলিক আরো অপরাধ করে ফেলে। এরা আমার আপনার সাথেই মিশে আছে। বিবাহিত, বাড়িতে সন্তান আছে অনেকেরই। আমার এই লেখাটা যারা পড়ছেন, তারা যদি কেউ এই রোগের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান। ওষুধ ও ‘বিহেভিয়ারাল থেরাপি’র মাধ্যমে পেডোফিলিয়া সেরে যায়। দরকার সমাজ থেকে এই ব্যাধি নির্মুল করার। আপনি না এগোলে হবে না। একটা ঘটনায় প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ বা মোমবাতি মিছিল বা মুন্ড বা লিঙ্গচ্ছেদ করে সমস্যা মিটবে না যদি না রোগ সারানো যায়। সর্বস্তরে একটা সচেতনতা দরকার।
১. আইনটাও একটু পরিবর্তন করা দরকার যদি এই অবস্থা থেকে সমাজকে বের করতে হয়। একজন বাচ্চা তার সাথে করা নিগ্রহের প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ তাকে আমরা শেখাই বড়দের মান্য করতে হবে। এছাড়া ভয়, লজ্জা এবং বাবা-মায়ের উদাসীনতা তাকে আরো একলা, বন্ধুহীন করে দেয়। যদি ছোটবেলায় করা অন্যায়ের অভিযোগ সে বড় বয়সে করতে পারে, সেটা অনেক অপরাধ কমিয়ে দেবে।
২. শাস্তি আরো কড়া হওয়ার পাশাপাশি পেডোফিলিয়া নিয়ে সামাজিক প্রচার দরকার। সুনীল রাস্তোগী নামের একজন পেডোফিলিক ৫৪টি যৌন নিগ্রহের ঘটনা ঘটিয়েও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুবার জেল খেটেছে শুধু। কারণ ঘটনাগুলোর অনেক গুলোই রেজিস্টার্ড হয়নি সময়ে।
৩. দরকার সঠিক যৌনশিক্ষা। বাচ্চাদের নিজেদের যৌনাঙ্গ চেনানোর পাশাপাশি নোংরা স্পর্শ ও যৌনতা নিয়ে যদি বাড়িতে আলোচনা হয় তবে বাচ্চাটি অন্তত নিজের কথাটা বলতে পারবে। এটা দেখা গেছে বাচ্চার মুখে একবার – আমি কিন্তু মাকে বলে দেবো, এই কথাটা শুনে প্রচুর পেডোফিলিক পিছিয়ে গেছে।
ঔ শিশু-কল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলো একবার পুলিশ ভেরিফিকেশন করিয়ে নিক। পেডোফিলিক অপরাধীদের আপডেটেড লিস্ট সরকার থেকে প্রতি মাসে প্রকাশ করা হোক।
আপনার শিশুটি খুব দামী। ওর শৈশবে দাগ লাগতে দেবেন না। পরিচিত, অপরিচিত, ডাক্তার, পুরোহিত কারোর সাথে একলা ছাড়বেন না। ওর কথা শুনুন। ওকে উড়তে দিন আকাশে। একটা বাচ্চার গায়েও আঁচড় ফেলা যাবে না।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...