Thursday, July 7, 2022

মহাদুর্নীতিবাজ সোহরাওয়ার্দী এখনও বহালতবিয়তে

গণপূর্ত অধিদপ্তরে ক্ষমতার লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরে ক্ষমতার লড়াই এখনও তুঙ্গে। প্রধান প্রকোশলী পদটি ভাগিয়ে নেয়া কিংবা পছন্দসই ব্যক্তিকে পদে বসানোর লড়াই চলে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। স্বাধীনতাবিরোধী রাজকারবান্ধব সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিদায়ের পর পদটি দখলে নেবার জন্য কোটি কোটি বিনিয়োগ করেছেন সিরিয়ালে থাকা একাধিক প্রকৌশলী। নিজের পছন্দের লোককে পদটিতে বসাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ঠিকাদাররাও। কথিত আছে যে, ৩০ কোটি খরচ করে পদটিতে অস্থায়ীভাবে বসেছিলেন আশরাফুল। কিন্তু তখন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট আশরাফুলের বিরুদ্ধে বহুমুখি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমকে অবশেষে বিদায় নিতে হয়েছে। গণপূর্ত আধিদফতরের নতুন প্রধান প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্বে নিয়োগ পেয়েছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার। আগের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমকে হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে বদলি করা হয়েছে। বিদায়ী আশরাফুল চলতি দায়িত্বে নিয়োগ পেয়ে পদ স্থায়ী করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে পরামর্শক নিয়োগ করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। আশরাফুল বিদায় নিলেও অনেক শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এখনও বীরদর্পে বহাল রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন এদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও তা এখন ঝিমিয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম সোহরাওয়ার্দীর নাম। সাবেক শীর্ষ দুর্নীতিবাজ (বর্তমানে পলাতক) প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের ক্যাশিয়ার (ষ্টাফ অফিসার) হিসেবে পরিচিত এ কে এম সোহরাওয়ার্দী। রফিকুল ইসলাম নিজে সরাসরি ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করতেন না। ঘুষের টাকা গ্রহণ করতেন এ কে এম সোহরাওয়ার্দী। ঠিকাদাররা বস্তায় ও মিষ্টির প্যাকেটে ভরে সোহরাওয়ার্দীর বাসায় টাকা পৌঁছে দিত আর সোহরাওয়ার্দী রফিকুলের নিদের্শ অনুযায়ী সেই টাকা বিদেশে পাচার করতেন। রফিকুলের বিদায়ের পর সোহরাওয়ার্দী প্রধান প্রকৌশলী পদটি দখলের জন্য অনেক টেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও দমে যাননি। এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন তদবীর।
বলা বাহুল্য বছরের পর বছর গণপূর্ত অধিদপ্তরকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম ও তার সহযোগীরা। জি কে শামীমের নেতৃত্বে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা।
বহুল আলোচিত ক্যাসিনো অভিযান শুরুর পর গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয় গণপূর্ত সিন্ডিকেটের প্রধান জি কে শামীম। তিনি গ্রেপ্তারের পরই বেরিয়ে আসে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নাম। এরপর গণপূর্ত অধিদপ্তরের সেই সময়ের অতিরিক্ত প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ১৩ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।
অভিযোগ উঠেছে, জি কে শামীম বর্তমানে জেলে থাকলেও তার ঘনিষ্ট সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত প্রকৌশলীরা এখনো গণপূর্তে সক্রিয়ভাবে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্তে জি কে শামীম সিন্ডিকেটের মূল উত্থান শুরু হয় অধিদপ্তরের সাবেক দুই প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ও মো. সাহাদত হোসেনের হাত ধরে। মো. রফিকুল ইসলাম অবিভক্ত ঢাকা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার হাত ধরে জি কে শামীম সিন্ডিকেট ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের সকল কাজ নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। রফিকুল ইসলাম গণপূর্তের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে যোগদানের সাথে সাথে তার স্টাফ অফিসার (নিবার্হী প্রকৌশলী) হিসাবে নিয়ে আসেন একেএম সোহরাওয়ার্দীকে। এরপর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদটি পেয়ে যান রফিকুল ইসলাম। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর টেন্ডার নিয়ন্ত্রনের মহোৎসব শুরু করেন রফিকুল ইসলাম। নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার, সরবরাহ, পদোন্নতি সব কিছুই এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে একেএম সোহরাওয়ার্দী জি কে শামীম সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় পদোন্নতি নিয়ে গণপূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম চাকরি থেকে অবসরে গেলে জি কে শামীম সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় মো. সাহাদত হোসেন প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসেন। তার সহযোগিতায় একেএম সোহরাওয়ার্দী ঢাকার গণপূর্তের বিভিন্ন ডিভিশনে তার অনুগত নিবার্হী প্রকৌশলীদের পদায়ন, সিন্ডিকেটের টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের যে কয়জন প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল দুদক, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন একেএম সোহরাওয়ার্দী।
২০১৯ সালে ৩১ ডিসেম্বর একেএম সোহরাওয়ার্দীকে তলবি নোটিশ পাঠায় দুদক। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত সেই নোটিশে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়।
উল্লেখ্য আশরাফুল আলম বিসিএস ১৫তম ব্যাচের প্রকৌশলী। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়। অধিদফতরের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৯ সালে রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে ছিলেন তিনি। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রধান পকৌশলী পদে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি পান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ দিয়ে পদোন্নতি পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ঘুষ নিয়ে এবং ‘ঘনিষ্ঠ’ ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করার অভিযোগ রয়েছে তার নামে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এমন নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আশরাফুল আলমের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদাররা কেবল অধিদফতরেই নয়, এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়েও অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু এ কে এম সোহরাওয়ার্দীর মত শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এখনও বহাল থাকায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...