Wednesday, December 8, 2021

ভেজাল ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ

ইউনানী আয়ূর্বেদিক হারবাল প্রতারণা

ইউনানী, আয়ূর্বেদিক ও হারবাল ঔসধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানসমূহের ভেজাল ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে ইউনানী, আয়ূর্বেদিক ও হারবাল প্রতারকদের ভেজাল ও মানহীন যৌনশক্তি বর্ধক, মোটাতাজাকরন, ভিটামিন, মিনারেল, ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণ ও শক্তি বর্ধক ঔষধের কুপ্রভাবে দেশের লাখ লাখ মানুষ হার্টের রোগ, পেটের পীড়া, লিভারের সমস্যা, গলব্লাডারে পাথর, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বিকলসহ ক্যান্সারের মত জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কেবল লাইসেন্স দিয়েই খালাস। কোন তদারকি নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা/কর্মচারী কেবল মাসোহারা আদায়েই ব্যস্ত থাকেন। এই সুযোগে প্রতারকরা অনুমোদনহীন ঔষধও বাজারে বিক্রি করছে।

বিশেষ প্রতিবেদক :

আগে হাস্যরস করে বলা হতো, ইউনানি-আয়ুর্বেদ মেডিসিন মানে রঙ, পানি, স্যাকারিন। বর্তমানে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে সিলডেনাফিল সাইট্রেড, ডেক্সামেথাসনের মতো ক্ষতিকর ও সস্তা কেমিক্যাল। অতি মুনাফার লোভে ভেষজ বাদ দিয়ে কেমিক্যাল ব্যবহার হচ্ছে দেদারসে। ফর্মুলারি অনুযায়ী নির্ধারিত ভেষজ উপকরণের পরিবর্তে নানা ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহৃত হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী কিছু কোম্পানি ফর্মুলারি অনুযায়ী ওষুধ তৈরি করলেও বেশিরভাগ কোম্পানিই ফর্মুলারির বাইরে গিয়ে অতি মুনাফার লোভে নানা ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। পেশাদার ডিগ্রিধারী হাকিম কবিরাজদের স্থান দখল করেছে কেমিস্টরা। নামধারী কয়েকজন কেমিস্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা হার্বসের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কেমিক্যাল ব্যবহারের নিয়ম বাতলিয়ে থাকে। তবে এখন অনেক হাকিম কবিরাজও কেমিক্যাল বিদ্যা রপ্ত করে অসৎ কাজে লিপ্ত হয়েছে। স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যবসায়ী ও হাতুড়ে বৈদ্যের অনুপ্রবেশের ফলে এই শিল্পে এত জাল জালিয়াতি। এই ওষুধশিল্প ভ্যাটমুক্ত হওয়ায় এবং স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা করা যায় বলে অসৎ ব্যবসায়ী, ফুটপাতের হকার, হাতুড়ে বৈদ্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এক ব্যক্তি একাধিক কোম্পানির মালিক। চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে আটক হওয়া কলিকাতা হারবালের মালিকও এখন লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানির মালিক! হকার মিজানও এখন আয়ুর্বেদ শিল্প সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। শহরের শিক্ষিত সমাজে তাদের ওষুধ বিক্রি হয় না। তাদের টার্গেট গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ ও ফুটপাত, বস্তির অসচেতন মানুষ। ওষুধ আইনে এমএলএম ও হকারি করে ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও কিছু ইউনানি-আয়ুর্বেদ কোম্পানি এমএলএম সিস্টেমে ও হকারি করে ফুটপাতে ওষুধ বিক্রি করে। এমনকি ফুটপাতে ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রেতার কাছেও ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ বিশেষ করে যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। হকারি করে ওষুধ বিক্রয়ের শীর্ষে রয়েছে গ্রিন লাইফ ন্যাচারাল হেলথ কেয়ার ও হাইম্যাক্স ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালস। আরগন ফার্মাসিটিক্যালস, জিকে ফার্মা ও গ্রামীন ল্যাবরেটরিজসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এমএলএম সিস্টেমে ওষুধ বিক্রয়ের শীর্ষে রয়েছে মডার্ন হারবাল। অন্যদিকে ইউনানি-আয়ুর্বেদ কোম্পানির নাম ও ওষুধের ট্রেড নামেও মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এসব কোম্পানি নামের সাথে ফার্মাসিউটিক্যালস যোগ করায় সাধারণ মানুষ অ্যালোপ্যাথিক কোম্পানি মনে করে ভুল করে। চতুর কোম্পানিগুলো ওষুধের মোড়কে খুব ছোট করে ইউনানি আয়ুর্বেদ লিখে রাখে। সম্প্রতি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এসব কোম্পানির নামের সাথে ফার্মাসিউটিক্যালস শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানি এই আদেশ পালন করছে না। গ্রামীন ল্যাবরেটরিজ নামে লাইসেন্স নিয়ে গ্রামীন ফার্মাসিউটিক্যালস শব্দ ব্যবহার ওষুধ বাজারচাত করছে। রয়েছে ট্রেড নামের সমস্যা। এ ধরনের কিছু কোম্পানি রীতি অনুযায়ী চন্দনাসব, অর্জুনারিস্ট, তিলাযাদিদ, হাব্বে নিশাত এরকম ট্রেড নাম ব্যবহার না করে হরমো প্লাস, ভায়াজিন, হরমোজিনের মতো ইংরেজি ট্রেড নাম ব্যবহার করায় জনসাধারণ এটাকে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ মনে করে বিভ্রান্ত হয়। ট্রেড নামের ক্ষেত্রে ইউনানি আয়ুর্বেদ ঐতিহ্য অনুসরণ করা উচিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।


ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অরাজকতা বিরাজ করে এখানে। ভেজাল ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের সস্তায় তৈরি ওষুধ বিক্রেতাদের ৫০ থেকে ৮০ ভাগ কমিশন দিয়ে বিক্রি করে! বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বা ৮০ ভাগ কমিশনে বিক্রয় করা ওষুধে হার্বস ব্যবহার সম্ভব নয়। রঙ, পানি, স্যাকারিন ও কেমিক্যাল যোগে তৈরি হলেই এটা সম্ভব। তারা মনে করেন, ইউনানি-আয়ুর্বেদ কোম্পানির বিক্রয় কমিশন অ্যালোপ্যাথিক কোম্পানির সমান হওয়া উচিত। বর্তমানে ইউনানি আয়ুর্বেদ ওষুধশিল্পে বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে সিলডেনাফিল সাইট্রেড ও ডেক্সামেথাসন সালফেট। বর্তমান যুগে অবশ্য যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধের ব্যবসা তুঙ্গে। ইউনানি আয়ুর্বেদের যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ দীর্ঘ মেয়াদে খুবই কার্যকর, যার কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু অসচেতন মানুষ দীর্ঘ মেয়াদের সমাধানের পরিবর্তে ত্বরিত সমাধানের দিকে ঝুঁকছে। আর সমাধানের নাম সিলডেনাফিল সাইট্রেডের মতো কেমিক্যাল। এই কেমিক্যাল যোগে তৈরি ওষুধ যৌন সমতায় ত্বরিত কাজ করলেও দীর্ঘ মেয়াদে মানবদেহের অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের নানা ক্ষতি করে। এক পর্যায়ে যৌনক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমনকি হতে পারে অকালমৃত্যু। তারপরও যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধের ব্যবসা এখন রমরমা।
অন্যদিকে মোটা হওয়ার ওষুধে ব্যবহার হচ্ছে ডেক্সামেথাসন সালফেট। ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ শাস্ত্রের ইমেজ ও মানবস্বাস্থ্যের হিতাহিত চিন্তা না করে কতিপয় ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ কোম্পানির কিছু মালিক এই রমরমা ব্যবসায় গা ভাসিয়ে দিয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কেমিক্যাল ব্যবহারকারী কোম্পানির ব্যবসা এখন বেশ রমরমা। অনেক হকার ও হাতুড়ে বৈদ্য কোম্পানির মালিক হয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে হয়েছে টাকার কুমির।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ তৈরির জন্য সরকার স্বীকৃত ইউনানি-আয়ুর্বেদ ফর্মুলায় একাধিক রেসিপি রয়েছে। আয়ুর্বেদ ফর্মুলারিতে অন্যতম রেসিপি হচ্ছে যৌবন শতদল (বাজী করনাধিকার)। যৌবন শতদল রেসিপির ১৫টি উপকরণ হচ্ছে রস সিন্দুর, স্বর্ণ, মুক্তা, বঙ্গ, অশ্বগন্ধা, আলকুশি, আকর করভ, জাফরান, যায়ত্রী, লবঙ্গ, শুঠ, পিপুল, রক্ত চন্দন, অহিফেন। অন্যান্য রেসিপির উপকরণও প্রায় কাছাকাছি। অন্যদিকে ইউনানি ফর্মুলারির একাধিক রেসিপির মধ্যে হাব্বে-নিশাত অন্যতম। হাব্বে-নিশাত রেসিপির ৯টি উপকরণ হচ্ছে বিসবাহা, রেগমাহী, সমুন্দর সুখ, জৌযবুওয়া, কুশত নুকরা, জাফরান, যহর মোহরা, জুন্দবেদস্তর ও আবে বর্গে তাম্বুল। অন্যান্য ইউনানি রেসিপির উপাদান প্রায় অভিন্ন। কিন্তু মুনাফাখোর বিপথগামী ব্যবসায়ীরা উপরোক্ত উপকরণের পরিবর্তে ব্যবহার করে সিলডেনাফিল সাইট্রেড কেমিক্যাল ও ভায়াগ্রা ট্যাবলেট। যদিও ওষুধের লেবেল কার্টুনে ইউনানি-আয়ুর্বেদ রেসিপির উপকরণ লেখা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, জাল জালিয়াতি বা অন্য কোনো উপায়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে এরা অনুমোদন নিয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, যৌন শক্তিবর্ধক ওষুধ যদি ইউনানি আয়ুর্বেদ ফর্মুলায় তৈরি হয় তাহলে কার্যকারিতা পাওয়া যাবে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর, যা টেকসই। আর যদি ওষুধের কার্যকারিতা এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে হয় তাহলে বুঝতে হবে এটা ইউনানি আয়ুর্বেদ ওষুধ নয়। আর বাকিটা নিশ্চিত হওয়া যাবে ল্যাবরেটরিতে পরিক্ষার পর। ভেজাল ওষুধ ব্যবসায়ী আর প্রশাসনের মধ্যে প্রায়ই চোর-পুলিশ খেলা হয়। লেনদেনে কোনো সমস্যা হলে ল্যাবরেটরিতে ওষুধ পরীক্ষার করে কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। জালিয়াত কোম্পানিগুলো শঠতার আশ্রয় নেয়। বলে, এই ওষুধ আমাদের উৎপাদিত নয়; কোনো জালিয়াত চক্র আমাদের নামে ওষুধ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। মডার্ন হারবালের যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ ‘কস্তুুরি সুপার’ ঔষধ প্রশাসন পরীক্ষাগারে ভেজাল প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানটি ‘ওষুধটি আমাদের উৎপাদিত নয়, আমাদের নামে অন্য কেউ হয়ত বাজারজাত করছে!’ দাবি করে থানায় জিডি দায়ের করে। আরো কয়েকটি কোম্পানি এ ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।
আরগন ফার্মাসিউটিক্যালসের নাইটেক্স (ট্রেড নামের অনুমোদন নেই), অনির্বান ফার্মাসিউটিক্যালসের সিলগোল্ড, মডার্ন হারবালের কস্তুরি সুপার, ম্যানসন্স ফার্মাসিউটিক্যালস’র সাসটিনা, ম্যানভিক্যাপ। নেপচুন ল্যাবরেটরীজ’র নিশাত সিলভার। ছাদেক ফার্মাসিউটিক্যালস’র লিজাডেক। রাসনা ফার্মাসিউটিক্যালস’র রাসকিং। লিড ফার্মাসিউটিক্যালস’র লিডোগোল্ড। ডীপলেইড ফার্মাকো’র লিবোনেক্স, ভিমেক্স প্লাস। এসবি ল্যাবরেটরীজ’র পাওয়ার ৩০। পপি ফার্মাসিউটিক্যালস্’র পি জিনসেং । গ্রিন লাইফ নেচারাল হেলথ কেয়ারের ফুর্তি ম্যাক্স। হাইম্যাক্স ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালসের নাইট পিল (ট্রেড নামের অনুমোদন নেই) নোবেল ইউনানি ল্যাবরেটরিজ’র গামা-এক্স, দিদার আয়ুর্বেদিক ফার্মাসিউটিক্যালসের যৌবন শতদল, রতি বিলাসসহ অনেক কোম্পানির যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধের ব্যবহারিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় এগুলো ইউনানি-আয়ুর্বেদ ফর্মুলায় তৈরি নয়। কেননা উক্ত ওষুধসমূহের কার্যকারিতা শুরু হয় এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে, যা ভেষজ ওষুধের বৈশিষ্ট্য নয়। কিছু কোম্পানির ওষুধ নির্দেশিকায় লেখা রয়েছে প্রয়োজনের এক ঘণ্টা পূর্বে সেবন করতে হবে। উল্লেখিত ওষুধগুলোর বিক্রেতাদের (ফুটপাত ও ওষুধের দোকান) সাথে কথা বললে তারা সেবনের ১ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকারিতার নিশ্চয়তা দেন। অন্যদিকে একাধিক ব্যবহারকারী ১ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকারিতার কথা স্বীকার করেছেন। তবে উক্ত ওষুধ দীর্ঘ দিন ব্যবহারের ফলে শরীরে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাবের কথাও বলেছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তাদের নিজস্ব উদ্যোগে ল্যাবরেটরিতে ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধের কিছু নমুনা ইতিঃপূর্বে পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফর্মুলারি বহির্ভূত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক উৎপাদন ও বাজারজাতের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও ড্রাগ প্রশাসন সঠিক ব্যবস্থা নিতে অনেকটাই ব্যর্থ। ড্রাগ প্রশাসনের একটি সিন্ডিকেটের সহযোগীতায় অভিযুক্ত ইউনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলো এখনো বাজারজাত করছে ক্ষতিকারক যৌনশক্তি বর্ধক, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও রুচিবর্ধক ওষুধ। মহাপরিচালক অঞ্চল ভিত্তিক ড্রাগ সুপারকে অভিযুক্ত কোম্পানীর ভেজাল ঔষধ জব্দ করে ড্রাগ টেষ্টিং ল্যাবরেটরীতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু ড্রাগ সুপারদের অনেকেই সেই নির্দেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অভিযুক্ত কোম্পানীর পক্ষে থাকায় অদ্যবদি কোনো ঔষধই ড্রাগ টেষ্টিং ল্যাবরেটরীতে পৌছেনি। বরং অভিযুক্ত কোম্পানীর অনেকেই প্রোডক্ট অনুমোদনের অ্যানেক্সার জমা দিয়েই ট্রেড নামে বাজারজত করছেন পুদিনা, পুদিনা-প্লাস, আমলকি-আমলকি প্লাস, রুচিতা, রুচিতা-প্লাস, প্রোটিন-প্লাস, কিউভিট-প্লাস, ত্রিফলা-প্লাস, অ্যামিনা-প্লাস এবং কালোজাম, আপেল, আঙ্গুর, কমলা, অরেঞ্জী ও ব্যানানা নামের অবাস্তব ঔষধসহ যৌনশক্তি বর্ধক নানা প্রকার বিষাক্ত ঔষধ।

ভেজালের শীর্ষে যারা
লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইউনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বাদে সবাই ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করছে দেদারছে। এদের প্রধান ব্যবসা হচ্ছে যৌনশক্তি বর্ধক অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি করা। এদের ২য় বিক্রির তালিকায় রয়েছে রুচি বর্ধক ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ। অনুসন্ধানে দেখা দেখা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ধারাবাহিকভাবে সেগুলো তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে রাজপথ বিচিত্রা। এরা ওয়েবসাইটে বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে ফেইসবুকে পেইজ খোলে তার মাধ্যমে ভেজাল ওষুধের প্রচারণা চালায়।

ভেজালের শীর্ষে আরগন (ঊজএঙঘ) ফার্মাসিউটিক্যালস
আরগন (ঊজএঙঘ) ফার্মাসিউটিক্যালস লাইসেন্স নিয়েছে ময়মনসিংহের ঠিকানায় কিন্তু ব্যবসা করছে ঢাকায় বসে। ঢাকার ঠিকানা ১১ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী, ঢাকা। লাইসেন্স নিয়েছে ‘আরগন ল্যাবরেটরী’ নামে কিন্তু ওষুধ বাজারজাত করছে আরগন (ঊজএঙঘ) ফার্মাসিউটিক্যালস নামে। ইউনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলোর ফার্মাসিউটিক্যালস শব্দটি ব্যবহার করার অনুমতি নেই। আইন অনুযায়ী ফার্মাসিউটিক্যালস শব্দটি কেবলমাত্র এলোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার করতে পারে। কিন্তুই উনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলো ক্রেতাদেরকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ফার্মাসিউটিক্যালস শব্দটি ওষুধের লেবেলে ও কার্টুনের গায়ে দিব্যি ব্যবহার করছে বেআইনীভাবে। ড্রাগ প্রশাসনের কর্তারা এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন রহস্যজনক কারণে।
‘আরগন ল্যাবরেটরীর প্রধান ব্যবসা যৌনশক্তি বর্ধক অনমোদনহীন ‘নাইটেক্স ও রিষ্টোর’ নামক ঔষধ বিক্রি করা। এছাড়াও তাদের আছে রুচিবর্ধক, ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রক ডাইকেয়ার (উওঈঅজঊ), ভিটামিন ও মিনারেল (ঊজঙ-খওঘঅ, স্পিরোলিনা) ৩০ টি ক্যাপসুলের মূল্য ৫৫০ টাকা। ড্রাগ প্রশাসনের ওয়েবসাইটে অনমোদিত ওষুধের তারিকায় এই ওষুধগুলো পাওয়া যায়নি।

জিকে (এক চযধৎসধ) ফার্মা (ইউনানী)
জিকে (এক চযধৎসধ) ফার্মা (ইউনানী)-এর লাইসেন্সের ঠিকানা ষ্টেশন রোড, টঙ্গী, গাজীপুর কিন্তু ওষুধের লেবেলের গায়ে লেখা আছে ঢাকা বাংলাদেশ। ফেইসবুকে পেইজ-এ ঠিকানা দেয়া আছে বনানী ঢাকা। এ কোম্পানীর মালিক শাহীন এক সময় ফুটপাথের হকার ছিল। ফুটপাথে ক্যানভাস করে যৌন শক্তি বর্ধক হালুয়া বিক্রি করতো। এখন কোম্পানীর মালিক। তিনি ৫০ টি ওষুধ প্রস্তুতের লাইসেন্স নিলেও মাত্র কয়েকটি যৌনশক্তি বর্ধক, রুচি বর্ধক ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রক ওষুধ ছাড়া আর কিছুই নেই তার ওয়েবসাইটে। তার উৎপাদিত ওষুধগুলো ফুটপাত ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায়না। তার প্রধান ব্যবসা যৌনশক্তি বর্ধক অনমোদনহীন ‘কমান্ড (ঈড়সসধহফ) ও গোল্ডেন লাইফ (এড়ষফবহ খরভব)’ নামক ঔষধ বিক্রি করা। কমান্ডের দাম ৩ হাজার টাকা, আর গোল্ডেন লাইফসহ পূর্ণ প্যাকেজের মূল্য ৪২০০ টাকা। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রক ওষুধ ডায়কেয়ার সেবনকারীদেও সাথে আলাপ করে জানা গেছে এটা সেবন করলে ২/৩ দিনের মধ্যেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু এক সপ্তাহ পরে ডায়াবেটিস এমন মাত্রায় বেড়ে যায় যে, ইনসুলিনেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয় না। ডায়কেয়ারের গোমর ফাঁস হয়ে যাবার পর নতুন ‘হলি ডাইকিউর (ঐঙখণ উওঈটজঊ) নামে একই ওষুধ ফুটপাতে ছেড়েছে।

গ্রামীন (্এৎধসববহ) ফার্মাসিউটিক্যালস
গ্রামীন (্এৎধসববহ) ফার্মাসিউটিক্যালস নামে কোন ঔষধ প্রস্তুততারক প্রতিষ্ঠানের অস্থিত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তালিকায় নেই। ‘গ্রামীন (্এৎধসববহ) ল্যাবরেটরী’ নামে লাইসেন্স নিয়ে গ্রামীন (্এৎধসববহ) ফার্মাসিউটিক্যালস-এর ব্যানারে ব্যবসা করছে। গ্রামীন (্এৎধসববহ) ফার্মাসিউটিক্যালস-এর ঠিকানা ২৪৯সি দক্ষিণ যাত্রাবাড়ি (৩য় তলা), ঢাকা। এদের প্রধান ব্যবসা হচ্ছে যৌনশক্তি বর্ধক অনমোদনহীন পাউডার, হালুয়া, ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, সিরাপ ও তৈল বিক্রি করা। এদের প্রধান ক্রেতা হচ্ছে নি¤œ আয়ের মানুষ। দেশের বিভিন্ন এলাকার হাতুড়ে কবিরাজ ও ফুটপাতের হকারের মাধ্যমেই এরা এসব ভেজাল ওষুধ বিক্রি করে। এদের উৎপাদিত ভেজাল ওষুধের মধ্যে বুলটেক্স. গ্লোবান জিনসেং পাউডার ও হালুয়া অন্যতম। পাউডার ও হালুয়া ফুটপাতে প্রতি চামচ ২০ টাকা করে বিক্রি করে ফুটপাতের হকাররা। নি¤œ আয়ের মানুষেরা বাসায় যাবার পূর্বে ১/২ চামচ পাউডার খেয়ে প্রিয়জনের সাথে মিলিত হয়। পাউডার/হালুয়া খাওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে শরীর উত্তেজিত হয় বলে জানিয়েছেন পাউডার/হালুয়াসেবীরা। ভেজাল কর্মকা-ের অপরাধে গ্রামীন (্এৎধসববহ) ফার্মাসিউটিক্যালসকে কয়েকবার জরিমানা করা হলেও থেমে নেই তাদের ভেজাল কর্মকা-।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021