Thursday, September 23, 2021

ভাসানচরে খুশি রোহিঙ্গারা

কক্সবাজার থেকে নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর নিয়ে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা কিছু বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। অনেক অনিশ্চয়তা ও চেষ্টার পর অবশেষে এক হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে গতকাল শুক্রবার দুপুরে ভাসানচরে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ভাসানচরে স্থানান্তরের দুই দিন আগে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বিবৃতি দিয়ে এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের অবস্থান স্বচ্ছ করার আহ্বান জানান। সরকারের পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের ওপর চাপ না বাড়িয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্বসম্প্রদায় যখন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, তখন বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের ওপর পরিবেশগত চাপ ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় নিজস্ব অর্থায়নে ভাসানচরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। এ সত্ত্বেও নানা অজুহাতে এর বিরোধিতা করেছে বিদেশি এনজিওগুলো। সরকার দৃঢ়ভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সফলভাবে প্রথম দলটির স্থানান্তর সম্পন্ন করেছে।

গতকাল ছয়টি জাহাজে করে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেওয়া হয়েছে। আগের দিন বৃহস্পিতবার রাতে কক্সবাজার থেকে বাসে করে তাদের চট্টগ্রামে আনা হয়। রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, সুযোগ-সুবিধার কথা জেনে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের আশায় তারা ভাসানচরে স্বেচ্ছায় এসেছে। তাদের চোখে-মুখে ছিল আনন্দ, ছিল না দুশ্চিন্তার ছাপ। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম বোট ক্লাব এলাকার জেটিতে তিনটি জাহাজে এক এক করে ওঠে রোহিঙ্গারা। বেশির ভাগকেই দেখাচ্ছিল প্রাণবন্ত। পরিবার নিয়ে জাহাজে ওঠার পর নির্ধারিত আসনে বসার পর দেওয়া হয় লাইফ জ্যাকেট। জীবনে প্রথমবারের মতো লাইফ জ্যাকেট পরা ওই রোহিঙ্গাদের অনেককে এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে দেখা যায়। লাইফ জ্যাকেটে থাকা বাঁশি বাজাতে শুরু করে রোহিঙ্গা শিশুরা। তখন জাহাজে অন্য রকম এক পরিবেশ। নেই কোনো উৎকণ্ঠা। বরং সবার চোখে-মুখে আশার ছাপ।

জাহাজে মোহাম্মদ ইসমাইল নামে এক রোহিঙ্গা কালের কণ্ঠকে বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে মিয়ানমারে জেনোসাইড থেকে প্রাণে বাঁচতে সপরিবারে কক্সবাজারে পালিয়ে এসেছিলেন। ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় এখনো মিয়ানমারে ফিরতে পারছেন না। এদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এ কারণে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কক্সবাজার ছেড়ে ভাসানচরে যাওয়ার।

মো. ইউনুস নামে এক রোহিঙ্গা মাঝি জানান, ভাসানচরে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের আশায় তাঁরা সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের বলা হয়েছে, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বা তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন।

রোহিঙ্গাদের জাহাজে তোলার আগেই তাদের দেওয়া হয়েছিল সকালের নাশতা। সকাল ১১টার দিকে জাহাজে নাশতা হিসেবে স্যান্ডউইচ ও আপেল, দুপুরে বিরিয়ানি খেতে দেওয়া হয়।

ভাসানচরে উৎসুক চোখ
দুপুর দেড়টার দিকে ভাসানচরের কাছাকাছি পৌঁছার পর পর রোহিঙ্গারা উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকে তাদের সবুজ ঠিকানা। এ সময় জাহাজের প্রায় সব রোহিঙ্গাকে নিজ নিজ আসনের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের নতুন আবাসস্থলের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতে ও কথাবার্তা বলতে দেখা গেছে।

মোহাম্মদ ইয়াসিন নামের এক রোহিঙ্গা তাঁর আট বছর বয়সী মেয়েকে ভাসানচর দেখিয়ে বলছিলেন, ভাসানচরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের মতো কষ্টের জীবন হবে না। কালের কণ্ঠকে বলেন, পরিবার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সুযোগ পাবেন—এটাই তাঁর আশা।

ভাসানচরে পৌঁছার পর রোহিঙ্গাদের হাত নেড়ে স্বাগত জানান সেখানে কর্মরত ২২টি এনজিওর প্রতিনিধিরা। জাহাজগুলো এক এক করে ভেড়ার পর রোহিঙ্গাদের সারিবদ্ধভাবে নামিয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এরপর তাদের পাঠানো হয় ওয়্যার হাউসে। সেখানে সবাই সমবেত হওয়ার পর এক রোহিঙ্গা ইমাম দোয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। দোয়ায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও ভাসানচরে আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের মঙ্গল কামনা করা হয়।

ভাসানচরে আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প পরিচালক কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আসা শুরু হলো। এতে তিনি আনন্দিত। তিনি আশা করেন, রোহিঙ্গারা ভাসানচরে কক্সবাজারের চেয়ে ভালো পরিবেশ পাবে। তিনি জানান, আগামী পাঁচ থেকে সাত দিন রোহিঙ্গাদের রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হবে। আজ শনিবার থেকে তাদের ১৯টি সহায়তা সামগ্রী বিতরণ শুরু হবে। এরপর তারা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের মতো নিজেদের খাবার নিজেরাই রান্না করে খাবে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসান বিষয়ক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, ২২টি এনজিও কাজ করছে। তারাই আগামী দিনে রোহিঙ্গাদের খাবারসহ অন্যান্য চাহিদা মেটাতে কাজ করবে।

বেসরকারি সংস্থা স্কাসের চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা কালের কণ্ঠকে বলেন, স্কাসসহ ২২টি এনজিও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

সবাই পেলেন ঘর
ওয়্যার হাউসে দোয়া অনুষ্ঠানের পর রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে নির্ধারিত নিজ নিজ ঘরে যায় রোহিঙ্গারা। এ সময় দেখা যায় উৎসবের আবহ। রোহিঙ্গাদের হাঁকডাক ও সারি বেঁধে ঘরে যাওয়ার সময় মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। পাকা দালানে ঘর, বিছানা পেয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের আনন্দ করতে দেখা যায়। ঘরগুলোতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে, যা ছিল না কক্সবাজারে।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...