Thursday, July 7, 2022

বলাৎকারের মূল্য ওষুধ-মলম!

দশ বছরের ছোট্ট এক ছেলেশিশু। তাকে রমজানের প্রথম দিন মাদ্রাসার একটি কক্ষে বলাৎকার করেছে তারই এক শিক্ষক। এরপর ঘটনা ধামাচাপা দিতে চলে নানা কূটকৌশল। ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেন-দরবার করে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সদস্য ও প্রিন্সিপাল বিষয়টি মিটমাট করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। মাদ্রাসার ভাবমূর্তি রক্ষার কথা বলে বিষয়টি যাতে পুলিশ পর্যন্ত না পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতেও চেষ্টা চালানো হয়।

ঘটনার তিন দিন পর গত শনিবার মাদ্রাসার ভেতরেই সালিশের আয়োজন করা হয়। ওষুধ-মলম ও তার সঙ্গে পাঁচ-সাত হাজার টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার ‘রায়’ দেয় সালিশ আয়োজকরা। তবে এরই মধ্যে খবরটি পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সালিশ থেকেই শনিবার অভিযুক্ত শিক্ষক নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে নরসিংদীর মাধবদী থানা পুলিশ। গতকাল রোববার শিশুটির মেডিকেল পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

শিশুটির বাবা পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। ছেলের সঙ্গে ঘটা ঘটনা নিয়ে গতকাল কথা বলার সময় তার গলা ভারি হয়ে আসছিল। তিনি জানান, দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখের সংসার তার। পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন নরসিংদীর মাধবদীতে। ১০ বছরের ছোট্ট ছেলেটি পড়াশোনা করছে স্থানীয় শিমুলেরকান্দি দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার হেফজ বিভাগে। আরেক ছেলে পড়াশোনা করছে স্থানীয় একটি স্কুলে। বেশ কিছুদিন ধরে তার ছোট্ট সন্তান জ্বরে ভুগছে। এরই মধ্যে রমজানের প্রথম দিন গত ১৪ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসার শিক্ষক নজরুল ইসলাম তার স্ত্রীর মোবাইলে ফোন করেন। ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠাতে জোরাজুরি করেন।

শিশুটির বাবা আরও জানান, ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠানোর কথা বললে তার স্ত্রী শিক্ষককে জানিয়ে দেন ছেলে অসুস্থ। এরপরও নাছোড়বান্দার মতো আচরণ করেন তিনি। ওই শিক্ষক তার মাকে বলেন, অসুস্থ হলে প্রয়োজনে ‘পানি-পড়া’ দেওয়া হবে। তাকে যেন মাদ্রাসায় পাঠানো হয়।

অসুস্থ থাকায় বড় সন্তানকে দিয়েই ছোট ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠান তার মা। এরপর ওই দিন দুপুর নাগাদ শিশুটি যেভাবে বাড়ি ফেরে, তা দেখে আঁতকে ওঠেন তারা। তার পরনের পোশাক রক্তে ভেজা। তখন শিশুটির পুরো শরীর অবশ দেখাচ্ছিল।

শিশুটির বাবা আরও বলেন, ছেলে আমার কাছে কোনোমতে মাদ্রাসায় ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিতে পেরেছিল। ভয়ার্ত ও কাতর কণ্ঠে ছেলে জানায়, বড় ভাই তাকে রেখে চলে আসার পর বন্ধ মাদ্রাসার একটি নির্জন কক্ষে শিক্ষক নজরুল ইসলাম তার সঙ্গে ‘খারাপ কাজ’ করেছে। যন্ত্রণায় কাতর হলেও মাদ্রাসা শিক্ষকের বর্বরতা থেকে তার মুক্তি মেলেনি। কিছু সময় পর দেখে তার শরীর রক্তে ভিজে গেছে। তিনি বলেন, ‘ছেলের এমন রক্ত ভেজা শরীর দেখে স্থির থাকতে পারিনি। ঘটনার পরপরই বাঁশের লাঠি নিয়ে ছেলের মা ও আমি কুলাঙ্গারটাকে শায়েস্তা করতে মাদ্রাসায় ছুটে যাই। আমাদের বাড়ি থেকে মাদ্রাসা খুব বেশি দূরে নয়। কারও কাছ থেকে খবর পেয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবদুল হান্নান ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির কয়েকজন ঘটনাস্থলে এসে হাজির হন। ঘটনাটি আমাদের কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ততক্ষণে জেনে যায়। তারাও মাদ্রাসায় এসে জড়ো হয়। এরপর একটি কক্ষে শিক্ষক নজরুলকে আটক করে রাখি। এরই মধ্যে বারবার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বলতে থাকেন, যেন বিষয়টি নিয়ে আমরা বেশি হট্টগোল না করি। তিনি মিটমাট করে দেবেন। বেশি জানাজানি হলে মাদ্রাসার ইমেজ নষ্ট হবে।’

অটোরিকশাচালক আরও বলেন, কুলাঙ্গারের বিচার দাবিতে যখন মাদ্রাসায় এমন হট্টগোল চলছিল এরই মধ্যে জোহরের নামাজের সময় হয়ে যায়। ওই শিক্ষককে কক্ষে আটকে সবাই মসজিদে নামাজ পড়তে চলে যাই। নামাজ শেষে কক্ষের সামনে এসে দেখি, ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক ভেতরে নেই। অধ্যক্ষের কাছে নজরুলের সন্ধান চাইলে তিনি আমাদের মাথা গরম না করার পরামর্শ দেন। পরে জানতে পারি, কক্ষের সামনে তালা দেওয়ার পর পেছনের জানালা দিয়ে নজরুলকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন অধ্যক্ষ নিজেই। এরপর সেই অধ্যক্ষ ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা বলেন, পরদিন বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হবে। সেখানে আমাদের ডাকা হবে।

শিশুটির বাবা আরও বলেন, অনেক চাপ ও মিথ্যা প্রবোধ দেওয়ার পর শনিবার মাদ্রাসায় সালিশ বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত শিক্ষকসহ আরও অনেকে উপস্থিত হন। তারা ছেলের চিকিৎসার জন্য ওষুধ ও মলম কিনে দেওয়া এবং সঙ্গে খুব সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বিষয়টি চেপে যেতে বলেন। সালিশের নামে যখন এটাকে নিয়ে চরম প্রহসন করার আয়োজন চলছিল, তখনই হঠাৎ পুলিশ এসে হাজির হয়। বৈঠকের মাঝ থেকেই নজরুলকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তারা। এতে পণ্ড হয় সালিশ।

শিশুটির বাবা আরও বলেন, শুরু থেকে ধর্ষণের এই ঘটনা যারা ধামাচাপা দিতে দেনদরবার করছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় মিজান চৌধুরী, মহসিন শিকদার, রেনু মুন্সী, সিরাজ প্রধান, লিল মিয়া, বাবুলসহ কয়েকজন।

নজরুলকে আসামি করে থানায় মামলা করা হয়েছে জানিয়ে শিশুটির বাবা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছে। এখন তার দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই। তিন-চার দিন হাসপাতালে রাখার পরও ছেলে সুস্থ হয়নি। অপরিচিত কাউকে দেখলে আঁতকে উঠছে। ছেলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, তা রোববার পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। এতে ভেস্তে যায় ওষুধ-মলমের মূল্যে ধর্ষণের ঘটনা চাপা দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

শিমুলেরকান্দি দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল বলেন, ‘আমরা বলেছি একটি দুর্ঘটনা হয়ে গেছে, এটা সত্য। এটি সামাজিকভাবে মিটমাট করে দেওয়ার চিন্তা করেছিলাম। চিকিৎসার খরচ লাগলে সেটা দেওয়ার কথাও বলেছি।’

নরসিংদীর পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, শিশুটির সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। ওই শিক্ষক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

মাধবদী থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান বলেন, পুলিশ যথাসময়ে ঘটনাস্থলে না গেলে এমন জঘন্য ঘটনা আড়ালেই থাকত। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের এই মামলার তদন্তও দ্রুত শেষ করা হবে।

এ ব্যাপারে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও করে তাকে পাওয়া যায়নি।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...