Sunday, September 19, 2021

পরীমনির বাসা যেন মদের বার, প্রতিদিনই বসে মদের আসর


বনানী ১৯/এ সড়কের ১২ নম্বর বাড়ির পাঁচতলাতে ঢুকলে যে কেউ প্রথম দফায় চমকে উঠবেন। সারি সারি বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডের মদের বোতল সাজানো দেখে মনে হবে পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো বিলাসবহুল বারে ঢুকে পড়েছেন আপনি। তবে পাঁচতলার এ ফ্ল্যাটে ঢুকে আপনি বার বা যাই মনে করেন না কেন আসলে এটাতে থাকেন দেশের আলোচিত ও বিতর্কিত চিত্রনায়িকা পরীমনি। নামিদামি মদের বোতলে ঘেরা ও বারের আদলে সাজানো এটি পরীমনিরই বাসা। এই বাসাতেই নিয়মিত মদের আসর বসান পরীমনি। রাতভর চালান পার্টি ও গান-বাজনা। পরীমনির বাসার এমনই চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
গত ১৩ জুন রাতে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন হালের জনপ্রিয় এ নায়িকা। পরীমনির নিজ বাসাতেই আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে যান বিভিন্ন গণমাধ্যমের একাধিক সাংবাদিক। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বিনোদন বিটের বাইরের লোক। এমনই কয়েকজন সংবাদিক পরীমনির বাসাতে ঢুকে শুরুতেই ধন্দ্বে পড়ে যান। পরীমনির বাসার ঠিকানা ভুল করে কি কোনো বারে ঢুকে পড়েছেন কি-না এই চিন্তা পেয়ে বসে তাদের। কারণ, ড্রইংরুমে ঢুকতেই হাতের বাম পাশে দেখা যাবে কাচঘেরা বিশাল একটি ঘর। স্বচ্ছ কাচেঘেরা এ রুমে সাজানো সারি সারি বিদেশি ব্রান্ডের মদের বোতল। সুন্দর ডেকোরেশনের নানা সাইজের র‌্যাকে সারি সারি বোতল দাঁড়িয়ে আছে।
আবার কিছু বোতল কাত করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ছোট ছোট টেবিলের ওপরও রাখা আছে বোতল। চকচকে-ঝকঝকে এসব মদের বোতল গুনে শেষ করার মতো নয়। কাচঘেরা এ বিশাল ঘরজুড়ে মদের বোতল আর মদ খাওয়ার প্রয়োজনীয় উপকরণ স্থানে স্থানে গোছানো আছে। বিভিন্ন সাইজের আর ডিজাইনের গ্লাস দেখলে যে কেউ বিমোহিত হয়ে যাবেন। তৃষ্ণা বাড়বে পানীয়প্রিয়দের। পরীমনির বাসায় গেলে যারা কখনোই মদ খাননি তারাও চাকচিক্য, আভিজাত্য আর নামিদামি ব্রান্ডে বিমোহিত হয়ে এক চুমুক খেতে চাইবেন।
এদিকে, ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমনি-কা-ের পর বেশ কিছু বিষয় খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে পুলিশ। নিয়ম ভেঙে কয়েকটি সোশাল ক্লাবে মধ্যরাতে পরীমনির যাতায়াত এবং মদ্যপানের খোঁজখবর করছে পুলিশ। এরই মধ্যে বনানী থানা পুলিশ গুলশানের একটি অভিজাত ক্লাবের বার বয়ের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করেছে।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি অভিজাত ক্লাবের কর্মকর্তারা পুলিশকে জানিয়েছেন, মধ্যরাতে নিয়ম ভেঙে পরীমনির জন্য বার খোলা রাখতে হয়। তারা পুলিশকে বলছেন, মদের আসর বসানোর গল্পও। বোট ক্লাব-কা-ের আগের রাতে গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাবে ঢোকেন পরীমনি। মধ্যরাতে সেখানে তিনি ভাঙচুরও করেন। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ৮ জুন বুধবার রাতে বোট ক্লাবে পরীমনি-কা-ের তদন্তে নেমে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হচ্ছে। তার ব্যাপারে জানাতে ঢাকার একাধিক সোশাল ক্লাবের কর্মকর্তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
তারা পুলিশ ও গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, পরীমনি তার কস্টিউম ডিজাইনার জিমিসহ কয়েকজন তরুণ-তরুণী নিয়ে প্রায় রাতেই অভিজাত ক্লাব ও তারকা হোটেলে ঘুরে বেড়াতেন। তাদের সঙ্গে নিয়ে মদ পান করতেন মধ্যরাত পর্যন্ত। এক্ষেত্রে প্রায় রাতেই তার কারণে ক্লাবের আইন ভাঙা হতো। বিশেষ করে হাফপ্যান্ট পরে তার সঙ্গী হওয়া জিমি ড্রেসকোডের তোয়াক্কা করতেন না কখনোই। এক ক্লাবে সময় কাটিয়ে তিনি যেতেন আরেক ক্লাবে। গুলশান পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত ৩ জুন রাত ১২টার পর পরীমনি তার সাবেক স্বামী তামিম হাসান ও দুটি বেসরকারি টেলিভিশনের দুজন কর্মকর্তা পরিচয়ধারীকে নিয়ে গুলশানের একটি অভিজাত ক্লাবে যান। তখন তারা মদ্যপ ছিলেন। ক্লাবে ঢুকে পরীমনি ও অন্যরা বার ব্যবহার করতে চান। বার বয় জালাল এতে অসম্মতি জানালে পরীমনি তার গালে চড় মারেন। ক্লাব কর্মকর্তারা বেসামাল আচরণের প্রতিবাদ করলে তিনি নিজেই পুলিশে কল করেন। গুলশান থানা পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান সেখানে যায়। পরে তারা বুঝিয়ে পরীমনিকে বাসায় পাঠান। এ খবর পুলিশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সীমানাঘেঁষা এলাকা হওয়ায় বনানী থানা পুলিশ ওই ক্লাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বার বয় জালালের কাছ থেকে সেই রাতের ঘটনা জানতে চায়।
এদিকে একাধিক ক্লাব কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব ক্লাবের ড্রেসকোড এবং নিয়ম রয়েছে। রাত ১১টার পর ক্লাব ও বারে সার্ভিস বন্ধ রাখার নিয়ম। পরীমনি যতবার যে ক্লাবে অতিথি হয়ে গেছেন সেখানেই এর ব্যত্যয় ঘটেছে। বনানীর একজন ব্যবসায়ী জানান, পরীমনি কথায় কথায় পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করেন। সেলিব্রেটি হওয়ায় পুলিশও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে মজা পায়। গায়ে দামি পারফিউম মেখে বিলাসবহুল গাড়িতে ঘুরে বেড়ানো পরীর মুখে মদের গন্ধ থাকলেও কেউ তাকে আটকাতে সাহস করেন না। গাড়ির বহর নিয়ে ছুটে চলা পরীমনি দলবল নিয়ে ক্লাবের বারে ঢুকে দামি ব্রান্ডের বিদেশি মদের বোতল হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ পাচ্ছে পুলিশ। তার সঙ্গের লোকজন বারের বিল পরিশোধ করেন বলে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের সব অভিজাত ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে পরীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তাদের রেফারেন্সে তিনি সেখানে যাতায়াত করেন। তারকা হোটেলের বারেও তার যাতায়াতের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

পরীমনিসূত্রে সাবেক এমপি পাপুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অমি
মধ্যরাতে বোট ক্লাবে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টায় সহযোগিতাকারী আলোচিত তুহিন সিদ্দিকী অমিকে নিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সঙ্গে অমির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
অমির আশকোনায় সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নারী পাচার করেই প্রচুর অর্থ কামিয়েছেন। শত শত কর্মী বিদেশে পাঠিয়ে ও প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হন অমি। বিদেশে কর্মী পাঠানোর সূত্র ধরে সাবেক এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সঙ্গে অমির পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পরীমনির মাধ্যমেই অমির সাথে পাপুলের পরিচয় হয়। পরীমনির করা মামলায় দুই নম্বর আসামি অমি ক্লাবপাড়ায় অমিও একজন পরিচিত মুখ। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন এক সময় বিদেশে ছোটখাটো চাকরি করতেন। এরপর দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করেন।
ঢাকার উত্তরা ও আশকোনায় তাদের একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে। ওই এলাকায় এক নামে তাকে সবাই চেনেন।
অমিদের একাধিক আলিশান বাড়িতে রয়েছে সুইমিংপুলও। তাদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। সেখানে অনেক সম্পদ গড়েছেন। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমও গড়েছেন অমি। দক্ষিণখানে একটি রিসোর্টের আড়ালে প্রায় প্রতিদিন মদ-জুয়ার ও নারীর আসর বসাতেন তিনি। ওই রিসোর্ট তার ‘রঙশালা’ নামে পরিচিত।
সূত্রে আরও জানা গেছে, নাসির ও অমির সিন্ডিকেট আগেও অনেক নারীর ওপর একই ধরনের নিপীড়ন চালিয়েছে। তবে নানা ভয়-ভীতি ও প্রলোভন দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ রাখা হয়। এবারও তাদের বিশ্বাস ছিল, পরীমনির ঘটনা তারা ধামাচাপা দিতে পারবেন। অবশেষে পরীমনিকা-ে তাদের দীর্ঘদিনের কুকর্ম সামনে এলো।
পরীমনির সাভার থানায় করা মামলায় নাসির উদ্দিন ও অমিসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ ছাড়া উত্তরার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাদের গ্রেফতারের সময় মাদক উদ্ধার করা হয়। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অমি ও নাসিরকে মঙ্গলবার ৭ দিনের রিমান্ডে পায় পুলিশ। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে থাকা তিন নারীকে তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

যুবদল থেকে ভোল পাল্টে শাসক দলে ভেড়েন সেই অমি
ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমনি কা-ে আলোচনায় আসেন তুহিন সিদ্দিকী অমি। পরীমনির দায়ের করা মামলায় দুই নম্বর আসামি তিনি। এ ছাড়া এই নায়িকাকে ফাদেঁ ফেলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্য একাধিক সূত্র জানায়, ক্লাব পাড়ায় অমিও একজন পরিচিত মুখ। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন একজন নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন। অনেক বছর ধরে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে তিনি কাজ করে ঢাকার আশে পাশে জমি ক্রয় করেন। বর্তমানে তার অঢেল সম্পদ রয়েছে।
একমাত্র সন্তান হওয়ায় এর উত্তরাধিকারী অমি। অমি ৭/৮ বছর আগে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক হন। এরপর দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি করেন। এ সুযোগে আদম পাচার করে প্রচুর অর্থ আয় করেন। এই অর্থের দাপটে অমি নানা অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার উত্তরা ও আশকোনায় তাদের একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে। দক্ষিণখানে রয়েছে তার বালাখানা। এলাকায় এক নামে তাকে সবাই চেনে।
এক সময় অমি ঢাকা মহানগর যুবদল উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার বাবাও বিএনপির রাজনীতি করতেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারা ভোল পাল্টে ফেলেন। অভিযোগ আছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শাসক দলের নেতাদের ম্যানেজ করতেন তারা।
জানা গেছে, দক্ষিণখানের আশকোনা ও টাঙ্গাইলের কটিয়ায় বিশাল অর্থের মালিক তারা। আশকোনায় দেড় বিঘা জমির ওপর সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাছাড়া আশকোনা হুদা মসজিদ রোডে ৫ কাঠার ওপর ৬ষ্ঠ তলার আলিশান বাড়ি, এ বাড়ির সংলগ্ন ৫ কাঠা জমি, দক্ষিণখানের দৌবাইদ এলাকায় দেড় বিঘার ওপর সিঙ্গাপুর নামে আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার, উত্তরখানের হেলান মার্কেট সংলগ্ন বিশাল গেস্ট হাউজ, টাঙ্গাইলের কটিয়ার বাইপাশে বিশাল অট্টালিকা, রেস্টুরেন্ট, মসজিদ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল এবং ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে দুটি আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে।
অমি বেশিরভাগ সময় সিঙ্গাপুর, দুবাই ও লন্ডনে আসা-যাওয়া করতেন। এমনকি লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতেন বলে এলাকায় প্রচার আছে। অমি এসএসসির গ-িও পেরোতে পারেননি। এক সময় আদম তোফাজ্জলের কিছুই ছিল না। স্থানীয়রা বলছেন, সিঙ্গাপুরে ৭ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। অথচ তিনি এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক।

জেরার মুখে পরী ছিলেন ধীরস্থির
ডিবি কার্যালয়ে জেরার মুখোমুখি হয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। এ সময় তিনি ছিলেন ধীরস্থির। তিনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে দুই ঘণ্টা অবস্থান করে তার দেয়া অভিযোগের বিষয়ে গোয়েন্দাদের বিভিন্ন তথ্য দেন। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তারা পরীমনির করা অভিযোগ ও মামলার বিভিন্ন বিষয় জানতে চান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এমনকি দ্রুত কাজে ফেরা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার বিষয়েও তারা পরামর্শ দেন। পরীমনি পুলিশ কর্মকর্তাদের জানান, অমি তাকে অনেকটা ফুসলিয়ে বোট ক্লাবে নিয়ে যান। তিনি ভেতরে ঢুকতে চাননি।
তাকে জোর করে অমি ভেতরে নিয়ে গেছেন। এরপর সেখানে তিনি মারধর, লাঞ্ছিত ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। প্রথমে তিনি পুলিশের সহযোগিতা পাননি বলে সোস্যাল মিডিয়ায় কেন স্ট্যাটাস দিয়েছেন পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনি বিষয়টি অনেকজনকে জানিয়েছেন। কিন্তু কেউ তার কথা পাত্তা দেয়নি।
সবাই তাকে বিষয়টি চেপে যেতে বলেছেন। পুলিশে আছেন এমন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তারাও তার কোনো কথায় কর্ণপাত করেনি। এজন্য তিনি মনের ক্ষোভে থানায় কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। তার সংগঠন শিল্পী সমিতি কেন তার এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়ায়নি অন্য প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন যে, শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানের সঙ্গে গত ১ বছর ধরে মনোমালিন্য ছিল। এ কারণে তিনি তার সংগঠন থেকে কোনো সমর্থন পাননি। বোট ক্লাবে তিনি মাতাল অবস্থায় গিয়েছিলেন কি-না পুলিশ কর্মকর্তাদের এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি। পরীমনি ও পুলিশের বৈঠকে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তবে ডিবি কার্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে দেখা করতে এসে পরীমনি সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন।
বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে পরীমনি একটি সাদা প্রাইভেট গাড়িতে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন চিত্র পরিচালক চয়নিকা চৌধুরীসহ তার কয়েকজন বন্ধু। এছাড়াও তার সঙ্গে একাধিক চিত্র পরিচালককে দেখা গেছে। তিনি ডিবি কার্যালয়ে ঢুকে সরাসরি চলে যান ঢাকা মহানগর উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. হারুনূর রশীদের কক্ষে। ওই কক্ষে ছিলেন ডিবি ডিসি (গুলশান) মো. মশিউর রহমান, জোনের এসি মো. খলিলুর রহমানসহ একাধিক র্ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। দীর্ঘ ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পরীমনি পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি দুপুরের খাবারও খান।
ডিবি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে পরীমনি জানান, ‘আমার সঙ্গে যা হয়েছে, আমি আশাবাদী, আমি এর ন্যায়বিচার পাবো। পুলিশ ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে। আমি সেদিন বলেছিলাম যে, আমাকে একটু আইজিপি মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিন। উনি আমার কথা শুনলে নিশ্চয়ই আমি ন্যায়বিচার পাবো। এজন্য আমি শিল্পী সমিতি, পরিচালক-প্রযোজক সমিতির নেতাদের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তারা আমাকে সহযোগিতা করেননি। কিন্তু, আইজিপি বিষয়টি জানতে পেরে ব্যবস্থা নিয়েছেন। আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আমি ডিবিতে নিজেই এসেছি। আমাকে তারা সাহস জুগিয়েছেন। আমি আবারও কাজে ফিরবো। পুলিশের কাছে এসে আমি আশ্বস্ত হয়েছি। মামলার প্রধান আসামি নাসির উদ্দিন মাহমুদ গ্রেপ্তারের আগে বলেছিলেন যে, পরীমনি মাতাল অবস্থায় ক্লাবে এসেছিলেন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। সোস্যাল মিডিয়ায় দেয়া বক্তব্য এবং এখনকার বক্তব্য দুইরকম কেন এমন এক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান পরীমনি।
এ সময় ঢাকা মহানগর উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. হারুনূর রশীদ জানান, আমরা পরীমনির কাছে ঘটনা নিয়ে কথা বলেছি। আমরা তাকে আশ্বস্ত করেছি, তার যে অভিযোগ, তা যথাযথভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো। তাকে নির্ভয় দিয়েছি। ঢাকা বোট ক্লাবে ঘটনার পর পরীমনি পুলিশ ও আইজিপি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন ঠিকই কিন্তু, প্রযোজক সমিতি ও শিল্পী সমিতি সেই সুযোগটা করে দেয়নি। এটিই পরীমনির অভিযোগ ছিল।
তিনি বলেন, পরীমনি পুলিশকে ধন্যবাদ দিতে ডিবি কার্যালয়ে এসেছিলেন। তিনি আরও জানান, মামলা রেকর্ড হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পরীমনি বলেছেন, পুলিশ ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে এবং এটাও বলেছেন যেন, তিনি (পরীমনি) আইজিপি’র কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং চলচ্চিত্র শিল্পীদের কাছে আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু, তার (আইজিপি) কাছে যেতে পারিনি। এরপরও আইজিপি স্যার ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানিয়েছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে আসামিদের গ্রেপ্তার করি।
বনানী থানায় পরীমনির অভিযোগের বিষয়ে ডিবি’র এ যুগ্ম-কমিশনার বলেন, ঘটনার রাতে ৪টায় বনানী থানায় পরীমনি গিয়েছিলেন। কিন্তু, ওই সময় ওসি সাহেব থানায় ছিলেন না। থানায় অসুস্থতাবোধের কারণ হলো- সাময়িকভাবে পরীমনি বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। ওই সময় পরীমনি দ্রুত থানা পুলিশের সহায়তায় হাসপাতালে চলে যান। উনি (পরীমনি) ডিবি কার্যালয়ে এসে পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং মামলার যাবতীয় বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। পরীমনি পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছেন, মামলাটি যেন সুষ্ঠুভাবে তদন্ত হয়। আমরা তাকে বলেছি যে, অপরাধ করলে কেউ ছাড় পাবে না।
এদিকে কাজে কি সহসাই ফেরা হবে কিনা জানতে চাইলে পরীমনি বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে তাতে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। একটু সময় নিতে চাই। কাজের জন্য মানসিক প্রশান্তি দরকার। যতদিন সেটা আসছে না অপেক্ষা করতে চাই। অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়েছে। বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন। কিন্তু আপনার অভিযোগ প্রমাণ হবে বলে মনে করেন কি? এ নায়িকা বলেন, আমার কাছে প্রমাণ যা ছিল সেগুলো দেয়া হয়েছে। সেদিনের সিসিটিভির ফুটেজ দেখলেও অনেক কিছু পরিষ্কার হবে। এগুলো দ্রুত সংগ্রহ করতে হবে।

আগের রাতে গুলশানের ক্লাবে ‘যা যা করেছেন’ পরীমনি
ঢাকাই চলচ্চিত্রের সমাালোচিত অভিনেত্রী পরীমনির বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাবে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। ৭ জুন গভীর রাতে অভিনেত্রী পরীমনি যে ওই ক্লাবে গিয়েছিলেন, তার একটি সিসিটিভির ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পরীমনির সঙ্গে আসা ব্যক্তিটি হাফপ্যান্ট ও স্যান্ডেল পরে ক্লাবে এসেছেন। এতে বাধা দেওয়ায় উত্তেজিত হয়ে ভাংচুর করেছেন পরীমনি ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন। বুধবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট কে এম আলমগীর ইকবাল। তিনি বলেন, পরীমনি সেই রাতে ১৫টি গ্লাস, নয়টি স্ট্রে এবং অনেকগুলো হাফপ্লেট ছুড়ে মেরে ভেঙেছেন। ঘটনার দিন পরীমনির সঙ্গে এক ভদ্রলোক ছিল হাফপ্যান্ট পরা, আরেকজন নারীও ছিল। এটা রাত প্রায় সোয়া ১টা বা দেড়টার ঘটনা।
এ বিষয়ে পুলিশের গুলশান বিভাগে উপকমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ৭ জুন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে ফোন পেয়ে পুলিশ অল কমিউিনিটি ক্লাবে গিয়েছিল। পুলিশ সেখানে যাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। পরে পুলিশ থানায় এসে নিয়ম অনুযায়ী ঘটনার বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। আলমগীর ইকবাল বলেন, ক্লাবের কিছু নিয়ম-কানুন আছে। কোনো মেইল যদি ক্লাবে আসে তাকে কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। কিন্তু পরীমনির সঙ্গে আসা ভদ্রলোক হাফপ্যান্ট ও স্যান্ডেল পরে এসেছেন। তখন ক্লাব থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন আমাদের ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ডিরেক্টর ও ক্লাবের এক ম্যানেজার। ওনারা সেটা দেখে বলেছেন, আপনিতো ক্লাব রুলস ভায়োলেট করেছেন। আপনিতো হাফপ্যান্ট পরে এখানে আসতে পারেন না। তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তাদের আচার-আচরণ গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় ওনারা (ডিরেক্টর ও ম্যানেজার) বলেছেন, রাত অনেক হয়ে গেছে আপনারা চলে যান। কিন্তু তারা চলে যাচ্ছিল না বিধায় আমাদের দুই পরিচালকই ক্লাব থেকে চলে যান।
পরবর্তীতে ঘটনার বর্ণনায় ক্লাব প্রেসিডেন্ট বলেন, তারপর যেই সদস্যের মাধ্যমে ওনারা এসেছিলেন উনিও তাদেরকে চলে যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেন। কিন্তু ওনারা যাচ্ছিলেন না বিধায় ওই সদস্যও চলে যান। এরপর ওনারা (পরীমনি ও সঙ্গীরা) হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে চেচামেচি শুরু করেন এবং গ্লাস ও স্ট্রে ছুড়ে মারতে থাকেন। তখন আর কেউ ছিল না ক্লাবে। দু’জন ওয়েটার আর এই তিন চারজন মানুষ ছিল। একপর্যায়ে তারা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ কল করেন। পুলিশ আসার পর তারা দেখতে পান, এগুলো উনি ছুড়ে মারছেন। তখন পুলিশ তাদেরকে জিজ্ঞেস করে আপনারা কেন এসেছেন, কেন আমাদের কল করেছেন? তখন তারা বলেন, আমাদের হেনস্থা করা হয়েছে। তখন পুলিশ ভাইয়েরা বলেন, কিছুতো দেখছি না। তারপর পুলিশ ওয়াকিটকির মাধ্যমে ওপরে (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) জানতে চায় আমরা কি করব। তখন ওপর থেকে নির্দেশ আসে ওনারা এমন করলে তাদের বের করে দিয়ে আপনারা চলে যান। ওয়াকিটকির সেই আওয়াজ সবাই শুনতে পাচ্ছিলেন। এরপর তারা কিছুটা ঠা-া হন ও পুলিশের উপস্থিতিতে ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। এরপর আর কিছু ঘটেনি। তিনি বলেন, আমরা ওনাদের কাউকে চিনতামও না জানতামও না। পরে আমরা শুনেছি ওনাদেরর একজনের নাম পরীমনি।
ক্লাব প্রেসিডেন্ট কে এম আলমগীর ইকবাল বলেন, ক্লাব কর্তৃপক্ষ যেই সদস্যের মাধ্যমে এসেছিল তাকে শোকজ করেছে। তার বিরুদ্ধে ক্লাবের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটা চলমান অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, যে সদস্য ক্লাবের নিয়মের ব্যত্যয় করে তাকে আমাদের নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করি। তাকে শোকজ, শোকজ গৃহীত না হলে তিন মাস, ছয় মাস এমনকি সদস্যপদ স্থগিতও করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে পরীমনিকে কল করা হলে তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে গণমাধ্যমে তিনি এটিকে ‘ফালতু অভিযোগ’ বলে অভিহিত করেছেন।

পরীমনির বন্ধু অমির ২ রিক্রুটিং এজেন্সিতে অভিযান
ঢাকাই সিনেমার নায়িকা পরীমনিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় গ্রেফতার তার বন্ধু তুহিন সিদ্দিকী অমির দুটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। অভিযানের সময় অমির একটি এজেন্সি থেকে ১০২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সেখান থেকে দুজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
সাভার ও দক্ষিণখান থানা-পুলিশ যৌথভাবে এই অভিযান চালায় বলে বুধবার পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়।
পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, রাজধানীর দক্ষিণখানের সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামের অমির একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে অভিযান চালানো হয়। এ ছাড়া উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় আরেকটি ট্রাভেল এজেন্সিতে পুলিশ অভিযান চালায়। সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ১০২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। সেখান থেকেই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার ট্রাভেল এজেন্সিতে অভিযান চালিয়ে কিছু পাওয়া যায়নি। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন বাছির ও মশিউর।
এই ঘটনায় সাভার থানা-পুলিশ বাদী হয়ে অমি, বাছির, মশিউরসহ পাঁচজনকে আসামি করে পাসপোর্ট আইনে মামলা করেছে। সাইদুল ইসলাম আরও জানান, জব্দ করা পাসপোর্টগুলো বিভিন্ন নারী-পুরুষের। তারা কারা, তাদের পাসপোর্ট রিক্রুটিং এজেন্সিতে বৈধ নাকি অবৈধভাবে রাখা হয়েছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ট্রাভেল এজেন্সির বৈধ লাইসেন্স আছে কি না, তাও দেখা হচ্ছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের ১০ দিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ৯ জুন মধ্যরাতে সাভারে অবস্থিত ঢাকা বোট ক্লাবে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টা করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঘটনার চার দিন পর রোববার রাত ৮টার দিকে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে এবং রাত ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনা প্রকাশ করেন নায়িকা পরীমনি।

বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎ, গায়ে হাত তোলা হয় পরীমনির
হঠাৎ বিদ্যুৎ বন্ধ। ঢাকা বোট ক্লাবের বারজুড়ে অন্ধকার। অশোভনীয় গালিগালাজ। পুরুষ ও নারী কণ্ঠ। এরমধ্যেই ঠাসঠাস শব্দ। যেনো কেউ কারও গায়ে হাত তুলছে। ব্যথা পেয়ে শব্দ করছে কেউ। বেশ কয়েক মিনিট এভাবেই মারধরের ঘটনা ঘটে। যখন বিদ্যুৎ আসে তখন প্রায় অচেতন চিত্রনায়িকা পরীমনি। এক পর্যায়ে কস্টিউম ডিজাইনার জিমি ও ক্লাবের নিরাপত্তাকর্মীর সহযোগিতায় বের করা হয় পরীমনিকে।
এভাবেই ৯ই জুন রাতে সাভারের বিরুলিয়ার ঢাকা বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য জানান, রাত ১২টার দিকে তিনি দেখেছেন ক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য (বর্তমানে বহিষ্কৃত) নাসির উদ্দিন মাহমুদ, পরীমনি ও তাদের সঙ্গীরা বসে আছেন। তার প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার শেষে পরীমনিকে বেশ অসুস্থ দেখা যাচ্ছিলো। তার গাল দুটি লাল হয়ে ছিল। এক পর্যায়ে ক্লাব থেকে বের হন নাসির উদ্দিন মাহমুদ।
ওই রাতে বাইরে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রমতে, পরীমনি যখন ক্লাবে যান তখন নাসির উদ্দিন মাহমুদকে কল দেন পরীমনির সঙ্গে থাকা অমি। কিছুক্ষণের মধ্যে নাসির উদ্দিন মাহমুদ এসে তাদের নিচতলার রেস্টুরেন্ট হয়ে দ্বিতীয় তলায় বারে নিয়ে যান।
সে রাতে ঘটনার পাঁচদিন পর নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও অমিকে আসামি করে ধর্ষণচেষ্টা ও মারধরের অভিযোগে সাভার থানায় মামলা করেন পরীমনি। তার আগে ফেসবুকে এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার করা হয় নাসির উদ্দিন মাহমুদ, অমিসহ পাঁচ জনকে। বর্তমানে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে যা দেখা গেল: ঘটনা তদন্তে এরইমধ্যে গোয়েন্দারা বোট ক্লাব ও বনানী থানা থেকে কিছু সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। এসব ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বোট ক্লাবের রিসিপশন দিয়ে ক্লাবের বারে প্রবেশ করে অচেতন অবস্থায় বের হওয়া পর্যন্ত মোট ৯৬ মিনিট পরীমনি ও তার সঙ্গীরা ক্লাবের ভেতরে অবস্থান করেছেন। ১২টা ২৩ মিনিটে স্বাভাবিকভাবেই পরীমনি ও তার সঙ্গীরা বারে প্রবেশ করেন। কিন্তু ১টা ৫৯ মিনিটে পরীমনিকে কোলে করে বের করা হয়। দীর্ঘ এই সময় সেখানে কি হয়েছিল সেটি নিয়েই প্রশ্ন সর্বত্র। মিডিয়ার কাছে আসা ফুটেজে দেখা যায় ৯ই জুন বুধবার রাত ১২টা ২২ মিনিট। বোট ক্লাব ভবনের চেকপোস্টে এসে থামে একটি কালো রঙের গাড়ি। নিরাপত্তাকর্মীরা গাড়িটিকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিয়ে সামনে এগিয়ে আসেন। তখন কালো গাড়ির পেছনে সাদা রঙের আরেকটি গাড়ি এসে থামে। কালো গাড়ির সামনের বাম পাশের দরজা খুলে বের হয়ে আসেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। তার মুখে ছিল সাদা মাস্ক। পরনে কালো টপস ও নীল জিন্স প্যান্ট। পেছনের ডান পাশের দরজা খুলে বের হন তুহিন সিদ্দিকী অমি ও পরীমনির কস্টিউম ডিজাইনার জিমি। জিমির পরনে ছিল কালো হাতাকাটা গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট। অমির পরনে ছিল সাদা গেঞ্জি ও প্যান্ট। পরীমনি নিজে পেছনের দরজা খুলে বের করে নিয়ে আসেন তার ছোট বোন বনিকে। তার পরনে ছিল লাল টপস ও জিন্স প্যান্ট। সাদা গাড়ি থেকে বের হন মাস্ক পরা আরও দুজন। তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে ১২টা ২৩ মিনিটে দুটি গাড়ি ক্লাব ভবনের সামনে থেকে বেরিয়ে যায়। পরে অমি মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে একজন নিরাপত্তাকর্মীর কথা বলিয়ে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।
১২টা ২৩ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে পরীমনি, তার বোন বনি, অমি ও জিমি রিসিপশন দিয়ে বারে প্রবেশ করেন। এ সময় রিসিপশনের ডেস্কে দুজন ও সামনে আরেকজন উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ৯৬ মিনিট পর রাত ১টা ৫৯ মিনিটে জিমি ও ক্লাবের একজন নিরাপত্তাকর্মী পরীমনিকে অচেতন অবস্থায় কোলে নিয়ে রিসিপশন দিয়ে বাইরে বের হয়ে যান। তাদের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছিলেন পরীমনির বোন বনি। তার কয়েক সেকেন্ড পরে স্বাভাবিকভাবেই বার থেকে বের হয়ে যান অমি। সেখানে আগে থেকেই সাদা রঙের একটি গাড়ি দাঁড়ানো ছিল। পরীমনিকে কোলে নিয়ে বের হওয়া দেখে নিরাপত্তাকর্মীরা দৌড়ে গিয়ে গাড়ির সামনের ও পেছনের দরজা খুলে দেন। জিমি ও ওই নিরাপত্তাকর্মী পরীমনিকে সাদা গাড়ির সামনের সিটে নিয়ে বসান। পরে গাড়ির পেছনের সিটে জিমি ও বনি ওঠার পরপরই গাড়িটি ক্লাব থেকে বের হয়ে যায়। রাত ২টার দিকে গাড়িটি ক্লাব থেকে বের হওয়ার সময় অমিকে গাড়ির কাছে এসে কিছু বলতে দেখা গেছে।
এদিকে বনানী থানার বাইরের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৩টা ৫২ মিনিটে বনানী থানায় প্রবেশ করেন পরীমনি। প্রথমে তারা ডিউটি অফিসারের রুম হয়ে থানার ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে একজন অফিসার তাদের ডিউটি অফিসারের কাছে যেতে বলেন। পরীমনি ডিউটি অফিসারের রুমে গিয়ে তার বরাবর চেয়ারে বসেন এবং ঘটনার বর্ণনা দেন। তবে ডিউটি অফিসার তার কথা বুঝতে পারছিলেন না। পরে তাকে পুলিশের একটি গাড়িতে এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়।

বাসা ভাড়া করে নাসির-অমির অনাচার
রাজধানীর উত্তরার পৃথক পৃথক স্থানে বাসা ভাড়া করে রক্ষিতা রাখতেন নাসির এবং অমি। নির্দিষ্ট সময় অন্তর বদল হতো তাদের রক্ষিতা। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হাতে আটক হওয়া প্রধান অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন এবং অমির কাছ থেকে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবাসন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বর্তমান রক্ষিতা হচ্ছে নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। উত্তরার একটি নামকরা স্কুলে আবাসন ব্যবসায়ী নাসির তাকে ভর্তি করে দেন। উচ্চতায় কম হওয়াতে তাকে দেখতে বয়সে আরও ছোট মনে হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই কিশোরী জানিয়েছেন তার বয়স ১৮ বছর। গত ৯ মাস ধরে নাসির তাকে উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় রক্ষিতা হিসেবে রেখেছেন।
সেখানকার বাসা ভাড়া প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা। পুরো বাসায় অত্যাধুনিক সব আসবাবপত্র। আভিজাত্যের যেন ত্রুটি নেই। পরিচয় সূত্রে ওই তরুণীকে ফুসলিয়ে রাজধানীতে নিয়ে আসেন নাসির। কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা পুরো বিষয়টি জানলেও পারিবারিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। ফলে কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই নাসির দীর্ঘদিন ধরে ওই যুবতীর সঙ্গ নিচ্ছেন।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের মনোরঞ্জন করতে নারীসঙ্গী সরবরাহকারী তুহিন সিদ্দিকী অমির উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরের যে বাসায় গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়েছে সেখানেই থাকতেন অমির রক্ষিতা বান্ধবী। অমির নারী রক্ষিতার সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ ছিল নাসির এবং অমির আরেক বন্ধু বাছিরের। উত্তরার ওই বাসায় দীর্ঘ সময় ধরে থাকছেন অমির বান্ধবী পরিচয় দানকারী এক নারী। নাসিরসহ অমির অন্য অতিথিদের রক্ষিতাদের ভালোমন্দ দেখভাল করতেন ওই নারী। যে বাসায় প্রায় রাতেই বসতো নাসির, অমি, বাছির এবং তাদের আরও ঘনিষ্ঠজনদের মদের আড্ডা। আসরে মাদকের পাশাপাশি অমি তার ব্যবসায়ী বন্ধুদের ওই বাসাতেই নারীদের নিয়ে ফুর্তির ব্যবস্থা করতেন। কখনো কখনো অমির বান্ধবীও ব্যবসায়ীদের মনোরঞ্জন করতেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উত্তরায় অমির ওই বাসা ভাড়া ৫০ হাজার টাকা। বাসাটিকে যে কারোর কাছে ফ্যামিলি বাসা মনে হবে। অমির ওই বান্ধবী রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলেও পড়ালেখায় এখন তিনি নিয়মিত নন।
অমির উত্তরার একটি অফিসে অভিযান চালিয়ে শতাধিক পাসপোর্ট এবং নগদ টাকা সহ অমির দুই অফিস সহায়ক বাছির এবং মশিউর নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত বাছির অমির অফিসের সহায়ক হলেও তিনিই মূলত অমির যাবতীয় কুকর্মের সাক্ষী। নাসির এবং অমির সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া তিন নারীর মধ্যে বাছিরের নারী রক্ষিতাও রয়েছে। বাছির ওই নারীকে সকলের কাছে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে থাকেন। ব্যক্তিগত জীবনে বাছির বিবাহিত এবং সন্তানের জনক। অমির সহায়তায় বাছির উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় রাখতেন তার ওই কথিত স্ত্রীকে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরীমনির সঙ্গে ওই ঘটনার পর নাসির এবং অমি উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরের ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে চলে যান।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, প্রধান অভিযুক্ত নাসির এবং অমির আরও কোনো নারী বান্ধবী (রক্ষিতা) রয়েছে কিনা সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

আড়ালেই থেকে যায় ক্লাবপাড়ার অঘটন
দেশে ক্লাবপাড়ায় ছোট-বড় অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে কালেভদ্রে দু-একটি ছাড়া ক্লাবের ভেতরে ঘটা সব অপ্রীতিকর ঘটনা পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। আইনের ভাষায় আমলযোগ্য অপরাধ হলেও প্রথমে তা ক্লাব কর্তৃপক্ষ চেপে রাখার চেষ্টা করে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বেশ কিছু কারণে বড় বড় ক্লাব ঘিরে বাড়তি নজর রাখে না। কারণ এসব ক্লাবের সদস্যরা সমাজের সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী শ্রেণির। আগ বাড়িয়ে ক্লাবে বাড়তি নজর না রাখার নীতি নিয়ে চলছে প্রশাসন। ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এমন একাধিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঢাকা বোট ক্লাবে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টার বিষয়টি ঘটনার চার দিন পর সামনে আসে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পরই তা জানাজানি হয়। পরীমণি নিজ থেকে তা প্রকাশ্যে না আনলে এ ঘটনাও হয়তো আড়ালেই থেকে যেত। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার সামনে এসেছে পরীমণিকে ঘিরে আরেকটি নতুন কাহিনী। ৮ জুন বোট ক্লাবের ঘটনার আগের দিন মধ্যরাতে রাজধানীর গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাবে তিনি ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ মিলেছে। ৯৯৯-এর ফোন পেয়ে পুলিশ ওই রাতে ঘটনাস্থলে গেলেও তা বের হল ৯ দিন পর। ক্লাবপাড়ার এমন অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। যদিও পরীমণি এটাকে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন।
এ বিষয়ে অল কমিউনিটি ক্লাবের সভাপতি কে এম আলমগীর ইকবাল বলেন, নিজস্ব নিয়ম-নীতিতে ক্লাব পরিচালিত হয়। এখানে স্পষ্ট বলা আছে, ক্লাবের ভেতরের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। কেউ অঘটন ঘটালে ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজ করে। বড় ধরনের ঘটনায় জড়ালে স্থায়ী বহিষ্কারও করা হয়। তবে থানা-পুলিশ পর্যন্ত এসব গড়ায় না। কারণ ক্লাব সদস্যদের সামাজিক মর্যাদা এর সঙ্গে জড়িত।
এ পর্যন্ত কতজনকে ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দু’জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। কয়েকজনকে তিন মাসের জন্য ক্লাব ব্যবহার করতে না দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কোনো সদস্যের অতিথি হিসেবে কেউ ক্লাবে এসে অঘটন করলে তার দায়-দায়িত্ব ওই সদস্যকে নিতে হয়।
জানা যায়, ঢাকার অভিজাত ক্লাবে এখন নতুন সদস্যপদ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কোনো ক্লাবে দু-একটি পদ খালি হলেও একেকটির জন্য ৭০ লাখ থেকে কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক বেশ কিছু ক্লাব রয়েছে। অনেক ক্লাবে প্রায়ই জুয়ার আসরও বসে বলে অভিযোগ আছে। ক্যাসিনোকা-ের পর নিয়মিত জুয়ার আসর বসত- এমন বেশ কিছু ক্লাব বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার ছোট-মাঝারি মানের কিছু ক্লাব স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলে। ঢাকা ও আশপাশের এমন বেশ কিছু ক্লাবে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়।
এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, গুরুতর অভিযোগ না পেলে সাধারণত পুলিশ ক্লাবে অভিযান চালায় না। কেউ যদি ছোটখাটো ঘটনায় অভিযোগ করে, আমরা তাদের নিজেদের মধ্যে মিটমাট করার জন্য পরামর্শ দেই। ক্লাব মানুষের সুস্থ বিনোদনের জায়গা। সেখানে সবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। ছোটখাটো ঘটনায় ক্লাবে পুলিশের যাওয়া সমীচীন নয়।
এছাড়া ওই বারে পরীমণির সঙ্গে থাকা তার কস্টিউম ডিজাইনার জিমি মোবাইল ফোনে ১৫ সেকেন্ডের ধস্তাধস্তির একটি ভিডিও করেছিলেন। এতে ভরাট পুরুষ কণ্ঠে গালমন্দ ও চিৎকার করতে শোনা যায়। বোট ক্লাবের ভেতরে ওই রাতে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল হক বলেন, বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছে পুলিশ। ভেতরের বারে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। তাই ভেতরের চিত্র পাওয়া যায়নি।

মানবপাচারে সিন্ডিকেটে অমি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অমি নারী-শিশু পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা। রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা এলাকার সিরাজ মিয়া রোডে রয়েছে তার বিশাল ট্রেনিং সেন্টার। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নারী-শিশুদের এনে সেখানে জড়ো করতেন অমি ও তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন। এভাবে মানবপাচারের মাধ্যমে কামিয়েছেন হাজার কোটি টাকা। বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ি ছাড়াও উত্তরখানে রয়েছে অমির আলিশান রিসোর্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তার উত্তরখানের রিসোর্টে যেতেন। দক্ষিণখানে দোবাইদায় রয়েছে দুটি ট্রেনিং সেন্টার ও রিসোর্ট। সেই রিসোর্টে তার বিদেশি সিন্ডিকেটের সদস্যদের মনোরঞ্জন করতেন। এছাড়া দুবাইয়ে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল রিসোর্ট। এলাকাবাসী অনেক অপকর্মের বিষয়ে জানলেও প্রতিবাদের সাহস পেতেন না। দুয়েকজন এগিয়ে এলে সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে হয়রানি করতেন অমি। তার হাত থেকে রেহাই পাননি বাসার গৃহকর্মীও। এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় অমির। সবকিছু আড়াল করতে অমি ও তার বাবা তাদের সম্পদের একটি বড় অংশ টাঙ্গাইলে স্থানান্তর করেছেন, বলছেন স্থানীয়রা।

নেপথ্যে আরও অনেকে, দু’জনের বিরুদ্ধে তদন্ত
বাংলাদেশি এক তরুণীকে ভারতে নিয়ে নির্যাতনের ভয়াবহ ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হওয়ার সূত্র ধরে হৃদয় বাবুসহ নারী পাচারকারী আন্তর্জাতিক চক্রের চমকপ্রদ সব তথ্য সামনে আসে। একইভাবে অভিনেত্রী পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ক্লাবপাড়ায় মদ-জুয়া ও সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে নানা কারবার এবং দেশে-বিদেশে তরুণী পাচার করে টাকা আয়ের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ আছে, দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রুপের অন্যতম হোতা হিসেবে নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী নাজিম সরকার ও তুহিন কাজী। অভিজাত এলাকা উত্তরা, বনানী, বারিধারা, গুলশান ও গাজীপুরে রিসোর্ট, ক্লাবকেন্দ্রিক তাদের গোপন সিন্ডিকেট। পরীমণির মামলায় ব্যবসায়ী ও জাতীয় পার্টির নেতা নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমি গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসছে নেপথ্যের অনেক তথ্য।
এরই মধ্যে নাজিম ও তুহিনের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। যে কোনো সময় তারা আইনের আওতায় আসতে পারেন- এমন আভাসও মিলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুই কর্মকর্তা ও ক্লাবপাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় ক্লাবপাড়ায় নাজিম ও তুহিনকে সবাই চেনেন। তাদের মাধ্যমে রঙিন জগতের ‘অনেক কিছু’ হাতবদল হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টার্গেট করে তরুণীদের এই সিন্ডিকেটে আনতে তাদের বিশ্বস্ত এজেন্ট রয়েছে। মোবাইল ফোনে যখন তারা কথা বলেন, তখন তরুণীদের ‘প্রোডাক্ট’ নামে সম্বোধন করেন।
এ ব্যাপারে ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, নাজিম ও তুহিনের কর্মকা নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। এই জগতে তাদের বিচরণ অনেক দিনের। অমির সঙ্গে তুহিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার তথ্যও আমরা পেয়েছি। অমি ও নাজিমের বিদেশে সেকেন্ড হোম রয়েছে বলে জানা গেছে। একাধিক সূত্র জানায়, দক্ষিণখানে হলি ডে প্ল্যানার নামে একটি রিসোর্ট রয়েছে। সেখানে প্রায় নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন হয়। এতে মূল ভূমিকা রাখেন তুহিন কাজী ও অমি। আশকোনায় সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামে প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। অভিযোগ আছে, দীর্ঘদিন ধরে এই সেন্টারের আড়ালে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও ইউরোপে মানব পাচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অমি। দুবাইয়ে রয়েছে তার নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ঢাকা ও টাঙ্গাইলে একাধিক বহুতল বাড়ি, মার্কেট, প্লট, ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে বিপুল বিত্তের মালিক অমি। এ ছাড়া ঢাকার একটি ধনাঢ্য শ্রেণির কাছে অমির পরিচয় ‘প্রোডাক্ট’ সরবরাহকারী হিসেবে। আর অমির কাছে নানা ‘প্রোডাক্ট’ নিয়ে আসেন তুহিন কাজী। পরে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা ওই জগতে বিচরণ করেন তাদের কাছে প্রোডাক্ট নিয়ে হাজির হন অমি। তুহিন-অমির চক্রে শতাধিক সুন্দরী নারী রয়েছেন।
একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, গুলশানেও এই চক্রের একাধিক রঙমহল আছে। সেখানে এক অবাঙালি ব্যক্তিও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, অমি গ্রেপ্তারের দু’দিন আগেও গুলশানে তাদের একটি জলসা বসে। সেখানে অমি, তুহিন কাজী ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক ব্যক্তিও ছিলেন। তুহিন একাধিক বিয়ে করেছেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। এ ছাড়া ঢাকাই সিনেমার আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রীকে ‘চাচাতো বোন’ হিসেবে তিনি পরিচয় দেন। এই সিন্ডিকেটে তরুণীদের পাঠিয়ে যারা সহায়তা করে আসছেন, তাদের মধ্যে সিলেট ও বরিশালের দুই রাজনীতিবিদও আছেন। বরিশালের ওই রাজনীতিবিদ নারী। এ ছাড়া মতিন ও আকবর নামে দু’জনের নাম পাওয়া গেছে, যারা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে মেয়ে টার্গেট করে নানা প্রলোভন ও ফাঁদ পেতে এই সিন্ডিকেটে যুক্ত করে।
সমাজের এই শ্রেণির ব্যাপারে তথ্য রাখেন এমন এক কর্মকর্তার ভাষ্য- ব্যাংকের বড় ঋণ পাস করানো, বড় ঠিকাদারি কাজ বাগানোসহ অনেক কাজ হাতিয়ে নিতে তারা সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে।
নাজিম সরকার গাজীপুরের বিএনপি নেতা হাসান উদ্দিন সরকারের চাচাতো ভাই। গাজীপুরের কালীগঞ্জে তার রিসোর্ট ও হাউস বিল্ডিংয়ে রেস্টুরেন্ট রয়েছে। উত্তরার রয়েল ক্লাবেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি।
অভিযোগের ব্যাপারে নাজিম সরকার ও তুহিন কাজীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ৮ জুন ঢাকা বোট ক্লাবের ঘটনার আগেও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও ব্যবসায়ী নাসিরের সঙ্গে কথা বলেছেন অমি। মূলত পরীমণিকে ফাঁসিয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পুলিশকে এও বলেছেন, ঘটনার রাতে বোট ক্লাবে ওয়েটারদের কারণে বড় ধরনের নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পান তিনি। কারণ বারবার নাসির উত্তেজিত হয়ে ওয়েটারদের বলছিলেন, এখনই লাইট বন্ধ কর। পরীমণির কস্টিউম ডিজাইনার জেমিকে মারধর করেন নাসির। তদন্তে উঠে এসেছে, ক্লাবপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরেই মদের কারবারের বড় নিয়ন্ত্রক তিনি।

তরুণীদের প্রলুব্ধ করে ক্লাবে পাঠানোই ছিল নাসিরের কাজ: ডিবি
পরীমনিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলায় প্রধান আসামি নাসির ইউ মাহমুদ তথা নাসির উদ্দিন মাহমুদকে গ্রেফতারের পর তার সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আবাসন ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত হলেও বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজে নাসিরের যোগসূত্র পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তারা বলছেন, বিশেষ করে তরুণীদের প্রলুব্ধ করে বিভিন্ন ক্লাবে পাঠানো এবং সেখানে তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার কাজটি নাসির দীর্ঘ দিন ধরে করে আসছেন। ১৪ জুন দুপুরে উত্তরায় নাসিরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। ডিবির যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) হারুন অর রশীদ বলেন, নাসিরের সম্পর্কে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের কাজ চলছে। সোমবার উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কের ওই বাসা থেকে নাসির ছাড়াও গ্রেফতার করা হয় তুহিন সিদ্দিকী অমিকে। এই অমির বিরুদ্ধেই পরীমনিকে কৌশলে বোট ক্লাবে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ওই বাসা থেকে আরও গ্রেফতার করা হয় লিপি আক্তার (১৮), সুমি আক্তার (১৯) ও নাজমা আমিন স্নিগ্ধা (২৪) নামে তিন তরণীকে। অভিযানে বিপুল পরিমাণে ইয়াবা ও দেশি-বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...