Monday, September 20, 2021

পদ্মা সেতু: হাসিনা যুগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
আমরা একটি আলো-অন্ধকারের যুগ অতিক্রম করছি। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বমানবতার যে ভয়াবহ মৃত্যু উপত্যকা এখন পার হচ্ছে তার কোনো নজির অতীতের ইতিহাসে নেই। তবু প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানবতা আবারও জয়ী হতে চলেছে। কভিড-১৯ প্রতিরোধ করার জন্য ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ব্রিটেনে প্রথম দেওয়া শুরু হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ভালোভাবে প্রমাণিত হলে মানবতা আবার এক আলো ও আশ্বাসের যুগের দ্বারপ্রান্তে পা রাখবে। এ কথা বাংলাদেশের জন্য সত্য- হাসিনা সরকার কভিড ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তা আনার চেষ্টা করছে। এ জন্য বিশ্ব সংস্থার কাছে আর্থিক সাহায্যেরও আবেদন জানিয়েছেন। এখন এই ভ্যাকসিন আনা এবং তা কোটি কোটি মানুষের দেহে প্রয়োগের ব্যাপারে কোনো দুর্নীতি না হলে আশা করা যায়, বাংলাদেশও আগামী বছরের মধ্যভাগের মধ্যে করোনামুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে।
জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর বছরের শেষ মাসে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়া বাংলাদেশের জন্য এক দুর্লভ ও ঐতিহাসিক ঘটনা। করোনার যে ভয়াল গ্রাসের অন্ধকারে আমরা কাজ করছি, সেই তিমির রাত্রির শেষে আমরা এই ঘটনায় এক উদয় উষার সুসংবাদ শুনতে পেলাম মনে হয়। এই সেতু শুধু উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের সঙ্গেই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটাবে না, দেশে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও প্রসার বাড়াবে অভাবনীয়ভাবে। কয়েকশ ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, আর্কিটেক ও ওয়ার্কারের পাঁচ বছরব্যাপী অবিরাম শ্রমের ফল এই সেতু। এ জন্য তাদের কাছেও জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে।
শেখ হাসিনা তার তিন মেয়াদের শাসনকালে একটি ইতিহাস তৈরি করে গেলেন। একটি ‘এরা’ বা যুগ সৃষ্টি করে গেলেন, তাকে ভবিষ্যতের ইতিহাস নাম দেবে ‘হাসিনা এরা’ বা হাসিনা যুগ। তার সরকারের যত ভুলভ্রান্তি থাকুক, দুটি কারণে ইতিহাসে চিরকালের জন্য হাসিনা বেঁচে থাকবেন এবং মানুষ তাকে স্মরণ করবেন। অতীতের মোগল যুগের শাসক শায়েস্তা খানের মতো তিনি হবেন ইতিহাসের কিংবদন্তি। এই দুটি কারণের একটি হলো, ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ-দান এবং অন্যটি হলো, উত্তাল পদ্মা নদীর বুকে সেতু নির্মাণ। এই দু’কাজেই শেখ হাসিনাকে দেশে এবং দেশের বাইরে যে চ্যলেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, অনেকেই ভাবতেন তিনি তা পারবেন না।

‘৭১-এর ঘাতক দালাল এবং গণহত্যার সহযোগীরা যেভাবে ৪০ বছর বিচার ও দ- এড়িয়ে চলেছে এবং বিএনপির সহযোগিতায় ক্ষমতাতেও গিয়ে বসেছিল, তাতে কেউ মনে করেননি, তাদের বিচার ও দ- হওয়া সম্ভব। শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশের সব বিরোধিতা অতিক্রম করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ‘৭১-এর ঘাতক, বঙ্গবন্ধুর ঘাতক এরা সবাই তাদের অপরাধ ও জাতিদ্রোহিতার শাস্তি পেয়েছে।
পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণ ছিল শেখ হাসিনার জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এই সেতু নির্মাণ ছিল বাংলার মানুষের প্রায় শতাব্দীকালের স্বপ্ন। কিন্তু তার জন্য দরকার ছিল বিশাল অর্থ, কারিগর ও প্রযুক্তিজ্ঞান। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপ্রার্থী হয়। বিশ্বব্যাংকও আর্থিক, কারিগরি সাহায্য দিতে রাজি হয়।
পদ্মা সেতু নির্মিত হবে এই আশায় পদ্মার এপারের-ওপারের মানুষ যখন আনন্দে উদ্বেল, সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক চক্রান্তে তাদের আশার মূলে কুঠারাঘাত হানা হলো। বিশ্বব্যাংক হঠাৎ অভিযোগ তুলল, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রজেক্টে দুর্নীতি হচ্ছে। এই ব্যাপারে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীকেও জড়ানো হলো। বিস্ময়ের কথা, তখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কোনো অর্থ বাংলাদেশের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের হাতে এসে পৌঁছেনি। তার আগেই বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ।
এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এই অভিযোগ তোলার পেছনে রাজনৈতিক চাপ ছিল। শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে এই চাপ মানতে অস্বীকার করেন এবং ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ তার নিজস্ব সম্পদের দ্বারা পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা সত্ত্বেও অনেকের মনে সন্দেহ ছিল। বাংলাদেশের পক্ষে নিজস্ব সম্পদ দ্বারা এই সেতু নির্মাণ অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের কাছে নতজানু হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি তা অগ্রাহ্য করেন এবং নিজস্ব সম্পদে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য পাঁচ বছর আগে কাজ শুরু করেন। তারপর অবশ্য চীন, ভারতসহ আরও কিছু বিদেশি সাহায্য এসেছে। কারিগরি সাহায্যও এসেছে। গত বৃহস্পতিবার (১০ ডিসেম্বর) সর্বশেষ অর্থাৎ ৪১তম স্প্যান বসিয়ে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা হয়েছে। শিগগিরই সেতুটির উদ্বোধন হবে এবং তা সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে আরেকটি বিরাট মাইলফলক। এই প্রথম বিশ্বব্যাংকের ঔদ্ধত্য ও সাহায্য অগ্রাহ্য করে একটি ছোট উন্নয়নশীল দেশ এত বিশাল প্রজেক্টের কাজ শেষ করল। এই সেতু বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটাবে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিচ্ছিন্নতার দরুন ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব ব্যাপারে উত্তরবঙ্গ পিছিয়ে ছিল। মঙ্গা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অসচ্ছলতা লেগেই ছিল। হাসিনা সরকার অবশ্য কৃষি উৎপাদন সাফল্যজনকভাবে বাড়িয়ে মঙ্গা থেকে উত্তরবঙ্গকে অনেক আগেই মুক্ত করেছে। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উন্নতি ঘটবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ উন্নত হবে।
মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসের যেমন নীল নদের ওপর আসোয়ান বাঁধ নির্মাণ নিয়ে রাজনৈতিক চক্রান্তের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তেমনই চক্রান্তের মুখে পড়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মিসরের নাসেরকে চাপ দেওয়া হয়েছিল- তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অধিক সম্পর্ক রক্ষার নীতি থেকে সরে না এলে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাবেন না। নাসের তা পাননি। তখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এগিয়ে এসে আসোয়ান বাঁধ নির্মাণের যাবতীয় ব্যয় বহন করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পদ্মা সেতুতে প্রতিশ্রুত সাহায্যদানে বিশ্বব্যাংক যখন অস্বীকৃতি জানায়, তখন ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল না। নিজস্ব সম্পদের ওপর প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে সেতু নির্মাণে হাত দেওয়া এবং পাঁচ বছরে তাতে সফল হওয়া অবশ্যই বাংলাদেশে হাসিনা যুগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
শেখ হাসিনা শুধু বিশ্বব্যাংকের চাপ নয়, আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের টেলিফোনে দেওয়া প্রচ্ছন্ন হুমকিও অগ্রাহ্য করার সাহস দেখিয়েছেন এবং দেশের সম্মান রেখেছেন। নোবেলজয়ী ড. ইউনূস ক্লিনটন পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাকে নানা অভিযোগের দরুন গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকে সরানো হলে ক্লিনটন দম্পতি অখুশি হন এবং ড. ইউনূসের পক্ষ নিয়ে হাসিনা সরকারকে বিব্রত করেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থসাহায্য বন্ধ হওয়ার পেছনে হিলারি ক্লিনটনের প্রভাব অনেকটা কাজ করেছে বলে অনেকেই মনে করেন।
মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসেরের মতো সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে শেখ হাসিনা সব চাপের মুখে নতজানু না হওয়ার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশকে দুর্ভিক্ষমুক্ত করা, গরিবি মুক্ত করা, সন্ত্রাস দমন, অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি কারণে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও এক দিন ইতিহাসে স্বীকৃতি পেতে পারেন। করোনার মতো বিশ্বত্রাস ভাইরাসের হামলার সময়েও তিনি সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে চলেছেন এবং এই দুর্যোগের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ স্থগিত রাখেননি।
মিসরে আসোয়ান বাঁধ নির্মাণ শেষে বাঁধটির উদ্বোধনকালে প্রেসিডেন্ট নাসের বলেছিলেন, ‘আর কোনো কারণে না হোক, এই বাঁধ নির্মাণ করে মিসরবাসীর দুঃখ নীল নদের বন্যার অভিশাপ স্থায়ীভাবে দূর করার জন্য আমার নাম ইতিহাসে থাকবে।’ এই একই কথা বলতে পারেন পদ্মা সেতু উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর কোনো কারণে না হোক, যেসব কারণে তিনি ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন, তার একটি হলো পদ্মা সেতু।

এটিই দেশের ‘শেষ’ বড় সেতু
হতে পারে পদ্মা সেতুই দেশের প্রথম সবচেয়ে বড় এবং শেষ বড় অবকাঠামোর সেতু। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় নদীর ওপর বড় ধরনের সেতু অবকাঠামো করতে চায় না সরকার। নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে নদীর ওপর দিয়ে সেতুর বদলে পানির নিচ দিয়ে টানেল করাই এখন লক্ষ্য। এতে নদীর পরিবেশ-প্রতিবেশ বেশি করে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সেতু নির্মিত হলে পলি পড়ে নদীর বড় ধরনের ক্ষতি হয়। তাই পরবর্তী সময়ে পদ্মা ও যমুনার মতো বড় নদী পারাপারে সেতুর বদলে টানেলের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে সরকার। জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকারও রয়েছে।
এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব বেলায়েত হোসেন বৃহস্পতিবার বলেন, ‘নদীর ওপর সেতু হলে কিছু তো প্রভাব পড়েই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তাই আমাদের পরিকল্পনায় আছে সেতুর বিকল্প হিসেবে টানেল করার।’
বেলায়েত হোসেন আরো বলেন, ‘সেতুর চেয়ে টানেলে খরচ অনেক বেশি। সবদিক চিন্তা করেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটা বাস্তবসম্মত হবে তা এখনই বলা কঠিন, তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে।’
পদ্মা ও যমুনায় আর কোনো সেতু বানানোর পরিকল্পনা নেই বলে এর আগে জানিয়েছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। গত বছর সুনামগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছিলেন, পরিবেশ রক্ষায় বড় নদীতে সেতুর বদলে মাটির নিচ দিয়ে টানেল বানানো হবে। তাঁর কথা অনুযায়ী, পদ্মা-যমুনায় বা বড় নদীতে সরকার আর সেতু নির্মাণ করতে চায় না। সেতু নির্মিত হলে পলি পড়ে, নদী ভরাট হয়, এভাবে পরিবেশের ক্ষতি হয়।
ওই সময় পরিকল্পনামন্ত্রী দেশের প্রথম টানেল চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণের উদ্যোগও ওই চিন্তা থেকেই করা বলে জানান। প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম ওই টানেল সেতু করছে সরকার। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৩.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেলের খননকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের প্রথম এই টানেল সেতুটি হচ্ছে চার লেনের। ২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ টানেলের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যমুনা নদীতে আরেকটি টানেল পথ করার পরিকল্পনা আছে সরকারের। যেটি জামালপুর ও কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিবেশ তথা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকারের এমন চিন্তা ভালো ইঙ্গিত বহন করে। পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার বিষয়ে বর্তমান সরকার গুরুত্ব দেয়। ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে পৃথক একটি অনুচ্ছেদ যোগ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী দলিল সংবিধানে জীববৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সংবিধানের ১৮-ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’
জানতে চাইলে সেতু বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অনেক পরিকল্পনা আছে। এর মধ্যে বড় নদীতে সেতুর বদলে টানেলের বিষয়টিও আছে। তিনি আরো বলেন, ‘একটি পরিকল্পনা অনেক ধাপ পার হওয়ার পর চূড়ান্ত হয়। এ বিষয়ে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা কতটুকু বাস্তবসম্মত তা বুঝতে আরো সময় লাগবে। এ বিষয়ে আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতির ওপর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নির্ভর করে।’

পদ্মা সেতু সম্পূর্ণ নিজের টাকায়
স্বপ্নের পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যানটি বসানোর পর এই সেতু নির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ নিজের সামর্থ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে বাংলাদেশ। এই সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যে যোগাযোগ সৃষ্টি হবে, সেটি আমাদের সরাসরি জিডিপিতে অবদান রাখবে।’
বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ডের নতুন রাষ্ট্রদূত নাথালি শিউআখ বৃহস্পতিবার সকালে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন।
এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর প্রভাব দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামগুলোতে পড়া শুরু করেছে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্রামে এর প্রভাব পড়া শুরু করেছে; যেমন—সোলার প্যানেল বসানো, অবকাঠামোসহ গ্রামে উন্নয়ন শুরু হয়েছে।’ এদিকে ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রত্যাশা করেন। আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেসসচিব হাসান জাহিদ তুষার সাংবাদিকদের এ বিষয়ে অবহিত করেন।

১৪ দেশের মেধায় যে সেতু
বিশ্বের অন্যতম খরগ্রোতা ও জটিল প্রকৃতির নদী পদ্মা। এর বুকে সেতু নির্মাণও তাই জটিল কাজ। এ জন্য পদ্মা সেতুর তদারক থেকে শুরু করে নির্মাণপ্রক্রিয়ায় দেশের এবং বিশ্বের সেরা মেধাগুলোকেই যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বড় অবকাঠামো নির্মাণে অভিজ্ঞ বহু দেশের নাগরিকেরাই এ প্রকল্পে কাজ করেছেন, করছেন। ভারী যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে নেই। তাই সবগুলোই এসেছে বিদেশ থেকে। তবে রড, সিমেন্টসহ অনেক মালামাল দেশের তৈরি।
সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমানে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদীশাসন ও মূল সেতুর কাজে চার হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। এর বেশির ভাগই বাংলাদেশি। এর বাইরে চীনের কর্মী আছেন এক হাজারের মতো। এ ছাড়া জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রের লোকজনও কাজ করছেন।
পরামর্শক দলে কাজ করছেন কমবেশি ১৪টি দেশের প্রকৌশলীরা। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস। ঠিকাদারের প্রতিটি কাজের মান যাচাই করেন পরামর্শকেরা। তাঁদের সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো কাজেরই সনদ মিলবে না, ঠিকাদার বিল পাবে না।
ঠিকাদার, পরামর্শক ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের বাইরে ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। কয়েক মাস পরপর বৈঠক করে কমিটি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয়ে পরামর্শ দেয়। প্রয়োজন হলে কাজের মূল্যায়ন করে। শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কমিটির প্রধান ছিলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর পর এ কমিটির প্রধান হয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক এম শামীম জে বসুনিয়া। এ কমিটিতে বাংলাদেশের ছয়জন এবং বিদেশের পাঁচজন বিশেষজ্ঞ আছেন। বিদেশিদের মধ্যে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও ইতালির সদস্য আছেন।

মালামাল ও যন্ত্রপাতি
প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত স্টিলের সব কাঠামো চীন থেকে এসেছে। রেলের গার্ডার (স্ট্রিনজার) এসেছে লুক্সেমবার্গ থেকে। প্রকল্পে যত রড ব্যবহৃত হয়েছে, এর সবই বাংলাদেশি। এ ছাড়া সিমেন্টও সব বাংলাদেশ থেকেই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়া থেকে কিছু অতি মিহি সিমেন্টও ব্যবহৃত হয়েছে। সংযোগ সড়কসহ কিছু স্থাপনা নির্মাণে মধ্যপাড়া কঠিন শিলাখনি থেকে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এর বাইরে বেশির ভাগ পাথর ব্যবহৃত হয়েছে ভারত, দুবাই, ওমান ও ভিয়েতনামের।
পৃথিবীতে যত বড় ড্রেজার ব্যবহৃত হচ্ছে, এর অন্তত তিনটি পদ্মা সেতুর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো নেদারল্যান্ডস থেকে আনা হয়। পাইল বসানোর জন্য হাইড্রোলিক হাতুড়ি (হ্যামার) এসেছে জার্মানি থেকে। সবচেয়ে বড় হ্যামারটির ক্ষমতা তিন হাজার কিলোজুল। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে আনা যন্ত্রপাতিও ব্যবহৃত হয়েছে। আর বাকি সব যন্ত্রপাতি চীনের। বিভিন্ন সময় ১৭টি বড় বড় ক্রেন ও ভারী যন্ত্রপাতি একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাসমান ক্রেনটি প্রায় চার হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি দিয়েই ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের ইস্পাতের স্প্যান বসানো হয়েছে।

বিশ্বের গভীরতম পাইলের সেতু
পদ্মা সেতুর পাইল বা মাটির গভীরে বসানো ভিত্তি এখন পর্যন্ত বিশ্বে গভীরতম। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর পর্যন্ত গেছে এই সেতুর অবকাঠামো। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশ্বে এটি এক অনন্য সংযোজন। এ রকম আরও বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে এই সেতু বিশ্বজুড়ে প্রকৌশলবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে ঠাঁই করে নেবে বলে মনে করছেন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা।
প্রকৌশলীরা বলছেন, বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যে কারণে পানির গভীরে শক্ত মাটি পাওয়া যায় না। এর ফলে পাইল গভীর করতে হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক খান মাহমুদ আমানত প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা সেতুর মতো সেতু দুনিয়ার কোথাও নেই বলা যায়। কারণ, এর কারিগরি চ্যালেঞ্জগুলো অন্য কোনো সেতুতে ছিল না। পদ্মা সেতুর পাইল বিশ্বে গভীরতম। এই কাজ ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু যখন হয়, তখন সেটির পাইলও ছিল বিশ্বে গভীরতম। এখন পদ্মা সেতু বিশ্বে গভীরতম ভিত্তির সেতু বলা যেতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে পদ্মা সেতু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকৌশলবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বর্তমানে এক্সপ্রেসওয়েকেও সেতু হিসেবে গণ্য করা হয়। সে কারণেই বিশ্বের দীর্ঘতম সেতুর তালিকা করা এখন অনেকটা কঠিন। তবে এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়, ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে নির্মিত দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু হতে চলেছে পদ্মা সেতু। ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল, বাংলাদেশ ও নেপালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে দীর্ঘতম সেতুটি হলো ভারতের আসামের ভূপেন হাজারিকা সেতু। ব্রহ্মপুত্রের শাখা লোহিত নদীর ওপর নির্মিত ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের সঙ্গে অরুণাচলকে যুক্ত করেছে।
ভারতে গঙ্গা নামে পরিচিত আর বাংলাদেশে পদ্মা নাম ধারণ করা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। এত দিন পদ্মা-গঙ্গার ওপর নির্মিত দীর্ঘতম সেতু ছিল ভারতের বিহারের মহাত্মা গান্ধী সেতু। ৫ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কসেতুটি বিহারের পাটনার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় হাজিপুরকে যুক্ত করেছে। তবে পদ্মা সেতু গঙ্গা-পদ্মার ওপর দীর্ঘতম সেতুর তকমা খুব বেশি দিন ধরে রাখতে পারবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, বিহারেই গঙ্গার ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ৯ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কাচ্চি দরগা-বিদুপুর সেতু। ২০২১ সালের নভেম্বরে ছয় লেনের সড়কসেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পদ্মা সেতুর বিশেষত্ব হলো, এটি দ্বিতল। নিচের অংশে ছুটবে ট্রেন, ওপর দিয়ে চলবে গাড়ি। বঙ্গবন্ধু সেতুও সড়ক ও রেলসেতু। তবে এই সেতুতে সড়কপথের পাশ দিয়েই চলে গেছে রেললাইন। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতু ১৯৯৮ সালের জুনে উদ্বোধন করা হয়।
বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু হলো চীনের ‘দানিয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ’। বিবিসি, সিএনএন ও চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্যানুসারে, ১৬৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রেলসেতু চীনের সাংহাইয়ের সঙ্গে জিয়াংশু প্রদেশের নানজিং এলাকাকে যুক্ত করেছে। এর কিছু অংশ গেছে পানির ওপর দিয়ে, বাকিটা স্থলভাগের ওপর। ১০ হাজার কর্মীর নিরলস প্রচেষ্টায় মাত্র চার বছরে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ২০১০ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ২০১১ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ এই সেতুকে যেকোনো ক্যাটাগরিতে (শ্রেণিতে) বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীনের উচ্চগতির ট্রেন চলাচল করে দানিয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজের ওপর দিয়ে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, এক্সপ্রেসওয়ে আর সেতু—একই জিনিস, তা স্থলভাগের ওপর দিয়েই যাক কিংবা জলভাগের ওপর দিয়ে। সে হিসেবে চীনের দানিয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু। তবে সড়ক ও রেল দুটো একসঙ্গে চিন্তা করলে পদ্মা সেতু দৈর্ঘ্যের দিক থেকে বিশ্বের সেতুগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকবে। তবে প্রথম ১০টির মধ্যে থাকবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সিএনএনের তথ্যমতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতুটিও রেলসেতু। ১৫৭ কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের এই সেতু তাইওয়ানে। এর ওপর দিয়েও উচ্চগতির ট্রেন ছুটে চলে।
আর সড়কপথে বিশ্বের দীর্ঘতম সেতুর মুকুট থাইল্যান্ডের বাঙনা এক্সপ্রেসওয়ের। নামেই বোঝা যায়, এটি ঠিক সেতু নয়। মহাসড়কের ওপর আরেক মহাসড়ক। ছয় লেনের ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০০০ সালে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু ছিল। বর্তমানে এটি যেকোনো ক্যাটাগরিতে বিশ্বের সপ্তম দীর্ঘতম সেতু।
সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইটস টাইমস এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পানির ওপর নির্মিত বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু হলো হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাউ সেতু। ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু উদ্বোধন করা হয় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তবে সেতুটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। সাগরতলে টানেলও রয়েছে এর অংশ হিসেবে। তাই এ সেতুর নামের পাশে ‘সামষ্টিক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাউ সেতুর আগে পানির ওপর বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু ছিল যুক্তরাষ্ট্রের লুজিয়ানার লেক পঞ্চারট্রেইন কজওয়ে। দুটি পাশাপাশি সেতুর সমন্বয়ে গঠিত এই সেতুর দৈর্ঘ্য ৩৮ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার। তবে হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাউ সেতু এবং লেক পঞ্চারট্রেইন কজওয়ে—দুটি সেতুই সড়কসেতু।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সড়ক ও রেল যোগাযোগ’ উভয় মিলে বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু হলো চীনের উহু ইয়াংশি রিভার ব্রিজ। সাড়ে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু ইয়াংশি নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০০ সালে। গিনেস বুকেও বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক ও রেলপথ সেতু হিসেবে এই সেতুর নাম রয়েছে। অন্যান্য ক্যাটাগরির সেতুর তুলনায় বিশ্বে এই ধরনের সেতুর সংখ্যা কম। সেদিক থেকে পদ্মা সেতু এই ক্যাটাগরিতে সামনের সারিতেই থাকবে। বুয়েটের অধ্যাপক খান মাহমুদ আমানত প্রথম আলোকে বলেন, যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু যখন তৈরি হয়, তখন বিশ্বে বিশাল সব সেতু তৈরির হিড়িক পড়েনি। গত ১০ বছরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উন্নয়নকাজ হয়েছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশে বড় বড় অনেক সেতু হয়েছে। চীন সমুদ্রের ওপর এত বড় বড় সেতু তৈরি করেছে যে এখন পাঁচ, ছয় কিংবা সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতু অনেকটা সাধারণ হয়ে গেছে।

দেড় বছরের মধ্যে পদ্মা সেতু চালু করা সম্ভব হবে
শামীম বাসুনিয়া: পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে একসময় অনেক জল ঘোলা হয়েছিল। দুর্নীতি নিয়ে অহেতুক মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেতুটা হবে কি না, তা নিয়ে একসময় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকারপ্রধানের একক সাহসী সিদ্ধান্তে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু এখন রূপান্তরের দিকে যাচ্ছে। আশা করছি, দেড় বছরের মধ্যে পদ্মা সেতু চালু করা সম্ভব হবে। আমাদের নিজের টাকায় পদ্মা সেতু হচ্ছে, এটা জাতির জন্য বিরাট গৌরবের, আত্মমর্যাদার। সম্মানেরও বটে। আরেকটা কথা না বললেই নয়, পদ্মা সেতুর বদান্যতায় একসঙ্গে রেলসেতুটাও হয়ে যাচ্ছে। এটা অবশ্যই বড় পাওয়া। দক্ষিণাঞ্চলে রেললাইন নেই। পদ্মা সেতুর কারণে একসঙ্গে যশোর পর্যন্ত রেললাইনও হয়ে যাওয়া বিশাল অর্জন। আমাদের মনে রাখতে হবে, সেতুটি এমন এক নদীর ওপর হচ্ছে, যেটি পৃথিবীর অন্যতম খরস্রোতা নদী। এখানে পলি এত বেশি যে ১ বছরে ১০ মিটার পলি জমে গেছে। পলি জমাতে পানি যেতে পারত না। ফলে এখানে নদীশাসন খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়। পদ্মা এমন এক নদী, যেটি একেক সময় একেক রূপ ধারণ করছে। ফলে নদীশাসন করতে গিয়ে আমাদের সময় আরও বেশি লাগবে। সম্প্রতি একটা অঘটন ঘটেছে। পবিত্র কোরবানির ঈদের আগের রাতে পদ্মা নদীর একটি অংশে ভাঙন শুরু হয়। নদীর যেখানে ভাঙন শুরু হয়, সেখানে (স্ট্রাইক ইয়ার্ড) পদ্মা সেতু তৈরির অনেক উপকরণ রাখা ছিল। সেতু তৈরির অনেক উপকরণ নদীগর্ভে চলে গেছে। যদিও আমরা খুব কম সময়ে সেই ভাঙন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি। পদ্মা সেতু করতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল পিয়ারের নিচে পাইল বসাতে গিয়ে। পানির নিচে কোথাও ১১৪ মিটার, কোথাও ১১৬ মিটার কোথাও ১১৮ মিটার পর্যন্ত যেতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পানির গভীরতা ছিল মাওয়া অংশে। তাই সেখানে পিয়ারের নিচে পাইল বসাতে সমস্যা হয়েছে। দুনিয়াতে এত গভীরে পিয়ারের নিচে পাইল বসানোর ঘটনা ছিল না। এটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ছিল।
পদ্মা সেতু করতে গিয়ে মানের বেলায় কোনো ধরনের আপস করা হয়নি। সবকিছুই ছিল স্বচ্ছ। মোট প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে শুধু সোয়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু বানাতে খরচ হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। নদীশাসনে যাচ্ছে আট হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা খরচ হয়েছে মাওয়া অংশে অ্যাপ্রোচ সড়ক, জাজিরা অংশে অ্যাপ্রোচ সড়ক এবং বিভিন্ন পরিষেবা নির্মাণে। সব হিসাব স্বচ্ছ। তাই এককথায় বলা যায়, পদ্মা সেতুতে কোনো বিচ্যুতি হয়নি। এই যে ঢাকা শহরে এত পরিবর্তন হচ্ছে, ৩৯ তলা, ৪০ তলা ভবন হচ্ছে, এসব পরিবর্তন হচ্ছে দেশের প্রকৌশলীদের হাত ধরেই। পদ্মা সেতুতে যেসব ভারী যন্ত্রপাতি চীন, সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে, সেগুলো তত্ত্বাবধান করেছেন আমাদের প্রকৌশলীরাই। অন্তত ৫০ জন প্রকৌশলী যন্ত্রপাতির মান নিশ্চিত করার কাজ করেছেন। এ ছাড়া সরাসরি পদ্মা সেতুতে কাজ করেছেন আরও ২০ প্রকৌশলী। সব মিলিয়ে ৭০ জন দেশীয় প্রকৌশলী পদ্মা সেতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছেন প্রকৌশলীরা। তবে মূল বিষয় হলো আমাদের নীতিনির্ধারকেরা প্রকৌশলীদের বিশ্বাস করেন? তাঁরা প্রকৌশলীদের দিয়ে বড় বড় কাজ করতে দেবেন? দেবেন না। আমাদের প্রকৌশলীরা বিদেশের মাটিতেও বড় বড় অনেক কাজ করছেন। সেই সক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
পদ্মা সেতু তৈরি হয়েছে মূলত দেশীয় উপকরণ দিয়ে। সেতু তৈরিতে সবচেয়ে বেশি লাগে দুটি উপকরণ। একটি হলো স্টিল, অন্যটি সিমেন্ট। আমি বলব, আমাদের দেশে যথেষ্ট ভালো মানের সিমেন্ট ও স্টিল তৈরি হয়। শুধু স্টিল আর সিমেন্টই নয়, রড, বালু, পাথরসহ অন্য যেসব উপকরণ পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত হয়েছে, সব উপকরণই ছিল সর্বোচ্চ মানের। যারা এসব উপকরণ সরবরাহ করেছে, তারা সবাই ছিল সতর্ক। তাই পদ্মা সেতুতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কোনো সুযোগই ছিল না।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...