Saturday, January 22, 2022

পটুয়াখালীতে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সাত্তারের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

  • টাকা না দিলে ফাইল ছুড়ে মারেন ঠিকাদারের গায়ে।
  • প্রকল্পে কৃত্রিম জটিলতা দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়।
  • করোনা দুর্যোগের সময় ফান্ড নেই বলে ১০ পার্সেন্ট হাারে কমিশন নিয়েছেন।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি : পৌর এলাকা উন্নয়নের নামে ৬০ কোটি টাকার টেন্ডার দুর্নীতিতে সমালোচিত এলজিইডির পটুয়াখালী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল সাত্তারের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ওই টেন্ডার দুর্নীতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রকল্প বন্ধ করে দিলেও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং উচ্চ দপ্তরকে ম্যানেজ করতে তার ঘুষ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষ বাহিনীর হাতে ঠিকাদারকেও লাঞ্ছিত হতে হয়। এছাড়া বিলের চেক আটকে ঘুষ আদায় করা, প্রাপ্ত কাজের অনুকূলে অনাপত্তিপত্র প্রদানে ঘুষ নেওয়া, চুক্তিপত্র ও বিলের ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের ঘটনায় এবং জামানতের চেক প্রদানে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় অতিষ্ঠ একাধিক ঠিকাদার ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রকৌশলীর এই ঘুষ-দুর্নীতির ঘটনা পটুয়াখালীতে ওপেন সিক্রেট হলেও প্রকল্প জটিলতার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না কোনো মহল। চলতি মাসে নানা অনিয়মের অভিযোগে পটুয়াখালী এলজিইডির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড উপ-সহকারী কামাল হোসেনকে অন্যত্র বদলি করা হলেও প্রকৌশলী আব্দুল সাত্তার রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ-গত জুন ফাইনালে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ পরিশোধের জন্য এলজিইডি কর্তৃক বিল প্রস্তুত করে জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো হয়। নিয়মানুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে চেক গ্রহণ করবে। অথচ নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল সাত্তার নিজেই অর্ধশত চেক কবজায় নিয়ে ঠিকাদারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। যে ঠিকাদার তাকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে সক্ষম হয়েছে তাকে চাহিদামতো বিল পরিশোধ করেছেন তিনি। এছাড়াও বিল পরিশোধের সময় বিশেষ জামানতের অজুহাত দিয়ে প্রায় অর্ধশত ঠিকাদারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন তিনি। এ ঘটনায় পটুয়াখালী পল্লি স্টোরের ঠিকাদার গোলাম ছরোয়ার বাদল প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ-নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল সাত্তার ৫-৭ পারসেন্ট অর্থের বিনিময়ে দরপত্রের গোপন রেট ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ বাগিয়ে নিতে সহায়তা করেন। এছাড়া টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর প্রাপ্ত ঠিকাদারকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (ঘড়ধ) দিতে এক থেকে দেড় পারসেন্ট নেন তিনি। কোনো ঠিকাদার অতিরিক্ত টাকা দিতে আপত্তি জানালে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম, সাগর মৃধা, আলম মোল্লার অভিযোগ, তিনি জুন ফাইনালে কাজের অনুকূলে ঠিকাদারের চেক জিম্মি করে তিন পারসেন্ট কমিশন হাতিয়ে নেন। আব্দুল সাত্তারের এই ঘুষ বাণিজ্যে একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে বাকবিত-ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এছাড়াও লটারিতে অংশ নিয়ে কাজ পাওয়ার পর নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (ঘড়ধ) দিতে এক পারসেন্ট, চুক্তিপত্রে এক পারসেন্ট হাতিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া বিলের ক্ষেত্রে তিন পারসেন্ট দিতে হবে বলে অলিখিত একটি আদেশ জারি করেন তিনি। ফাইলের সঙ্গে টাকা না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখেন। তার কাজে সহায়তা করেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন ও কথিত ভাতিজা মাজাহার। এনামুল হক নামে এক ঠিকাদার বলেন- জামানতের চেক প্রদান বাবদ দেড় পারসেন্ট অর্থ দাবি করেন তিনি। আপত্তি জানালে ফাইল নিয়ে তার রুমে কেন ঢুকেছেন বলে পিয়নকে গালাগালি করেন। প্রতিনিয়িত আনসার বাহিনীর প্রটোকল নিয়ে চলাফেরা করেন। প্রকৌশলীর সরকারি গাড়ি চালাচ্ছে সুমন নামে এক বহিরাগত। প্রকৌশলীর অফিস কক্ষের পাশে কম্পিউটার রুম পরিচালনাসহ কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করেন তার স্নেহধন্য মামুন নামে আর এক বহিরাগত। অর্ধশত ঠিকাদারের অভিযোগ, এলজিইডি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এরকম প্রকৌশলী পটুয়াখালীতে আসেনি! পটুয়াখালী সদর রোড এলাকার এক ঠিকাদার ইব্রাহীম ক্ষোভে বলেন, ৬০ লাখ টাকা বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে তার কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে বসেন। তিনি অতিরিক্ত টাকা দিতে আপত্তি জানালে ফাইল ছুড়ে মারেন নির্বাহী প্রকৌশলী। নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল সাত্তারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে এসব অভিযোগ অবহিত করা হলে তিনি অভিযোগগুলো শুনে বলেন আমি এখন ব্যস্তা আছি, পরে কথা বলব। এদিকে তার সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পর একাধিক মহল থেকে সংবাদ না করতে অনুরোধ করা হয় প্রতিনিধিকে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে আব্দুল সাত্তার দক্ষিণাঞ্চলীয় লোহার সেতু পুনঃর্নিমাণ/পুনর্বাসন প্রকল্পের ১২টি গার্ডার ব্রিজ ও চারটি লোহার সেতুর দরপত্র আহ্বান করেন। ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই প্রকল্পের দরপত্রে ব্যবহার করা হয় ভৌতিক টেন্ডার আইডি। এছাড়াও টেন্ডার কমিটি, টেন্ডার যাচাই-বাছাইসহ দরপত্র প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির আশ্রয় নেন তিনি।

১৯ ব্রিজের ১৭টিই নির্মাণ প্রকল্প পরিচালকের নিজ গ্রামে!
দেশের দক্ষিণ জনপদের সড়ক ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ‘দক্ষিণাঞ্চলের লোহার সেতু পূনঃনির্মাণ/পূনর্বাসন’ নামে প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। অভিযোগ আছে, এই প্রকল্পের আওতায় পটুয়াখালীর নিজ গ্রামে অপ্রয়োজনে সতেরটি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করছেন প্রকল্প পরিচালক। অথচ ব্রিজের অভাবে দক্ষিণাঞ্চলের বহু গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। প্রকল্প পরিচালকের এমন সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার অপব্যবহার বলছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় মোট ২৩৯টি লোহারসহ অন্যান্য সেতু রয়েছে। যার অধিকাংশই ঝুকিপূর্ণ। এসব ঝুকিপূর্ণ সেতু ব্যবহার করে আসছে গত কয়েক বছর ধরে এ এলাকার সাধারণ জনগন। জনদুর্ভোগের শিকার এসব এলাকার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ‘দক্ষিণাঞ্চলের লোহার সেতু পূনঃনির্মাণ/ পূনর্বাসন’ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে এলজিইডি বিভাগ। ‘আইবিআরপি’ নামের এ প্রকল্পের অর্থায়নে ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের ২৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত ৪২ ও ৪৩ নং নোটিশে ১৯টি গার্ডার ব্রিজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশ পেয়ে কাজ শুরু করেন।
কিন্তু ওই ১৯টি ব্রিজের সতেরটিই নির্মিত হচ্ছে প্রকল্প পরিচালক আবদুল হাই মিয়ার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের বাজিতা গ্রামে। ওই গ্রামেই ‘ইঞ্জিনিয়ার কটেজ’ নামে তার বাড়ির আধা কিলোমিটারের মধ্যেই নির্মিত হচ্ছে অন্তত সাতটি ব্রিজ। যার মধ্যে তিনটি ব্রিজের দূরত্ব মাত্র তিনশ মিটার। অথচ এ উপজেলায় ২৩৯টি সেতুর মধ্যে অধিকাংশ ঝুকিপূর্ণ থাকলেও সেই ব্রিজ নির্মাণ না করায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে উপজেলাবাসী।
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা জানান, ‘আমিও আমার এলাকার জন্য এরকম ব্রিজের চাহিদা পাঠিয়েছি সেক্ষেত্রে আমার এখানেও যদি ওরকম ব্রিজ হয় তবে আমিতো মনে করবো এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আর যদি আমার এখানে ওরকম ব্রিজ না হয় তাহলে আমি মনে করবো এটি একটি অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কাজ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ওই বিভাগের ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ আছে তারাই ভাল বলতে পারবে যে, এখানে অনিয়ম হয়েছে কিনা।’ এদিকে সতেরটি ব্রিজের কাজ চলার কথা স্বীকার করে মরা খালের উপর ব্রিজ নির্মাণের ব্যাপারে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার শেখ আজিম উর রশীদ জানান, ভবিষ্যতে হয়তো ওই খাল নদীতে পরিনত হবে সেই আশায় ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে পটুয়াখালীর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে গোটা জেলায় আরও ব্রিজ নির্মিত হবে। আর ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই এ কাজ বাগিয়েছেন যা বৈষম্য বলে স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক মোঃ আবদুর হাই।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...