Wednesday, August 4, 2021

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন


নুসরাত রীপা

পর্ব-১২
তুলির এনগেজমেন্টের দিন ঠিক হয়েছে। তুলি মা কে বলেছিল, মীরা কে জানাতে। এ বাড়ির সমস্ত আনন্দ-উৎসব, দুঃখ-বেদনার মীরাও তো অংশীদার। বড় চাচা চাচী বাদেও অন্যেরাও মীরাকে একদমই দূরের মানুষ ভাবে না। বরং এ বাড়ির মেয়েই ভাবে।
কিন্তু হুরই জান্নাত, মানে দাদীমনি মীরাকে এত বছরেও আপন করে নিতে পারেনই নি। পছন্দও করেন না। তার ভাষায়, এই মেয়ের বাপ-মার পরিচয় নাই। সে বৈধ না অবৈধ সন্তান সেটাও জানা নাই। ধর্ম পরিচয় নাই- এই মেয়েকে পালতে নিয়ে এসেছো ভালো কথা আমার ঘরে যেন না ঢোকে। আমার ঘর অপবিত্র হতে দিতে পারবো না।
তখনও দাদাজান ছিলেন। ছোট্ট মীরার পাকা পাকা কথা তিনি ভালো বাসতেন। বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে পাশে একটা ছোট্ট মোড়ায় মীরাকে বসিয়ে তিনি গল্প করতেন।
কিন্তু দাদীমনি এটা পছন্দ করতেন না। চিল্লাচিল্লি করে দাদাজানকে সরিয়ে নিতেন।
অবশ্য ছোট্ট মীরা এসব কিছু বুঝতো না। বাসায় তো তখনও শিশু বলতে বিজু তুলি আর মীরা!
মীরার এ বাসায় আসার একটা অদ্ভূত কাহিনী আছে।
বড় চাচীর এক আত্মীয়ার সন্তান হচ্ছিল না। বহু চিকিৎসা, তদবীর, দেশ-বিদেশ ঘোরা শেষ। অতপর উনারা স্বামী-স্ত্রীতে বাচ্চা দত্তক নেওয়া স্থির করলেন। বড় চাচী তখন ঢাকায় ভাইয়ের বাসায় বেড়াচ্ছেন। চাচীর ঐ আত্মীয়া কোথা থেকে উই উইল উইন এর খোজ নিয়ে এলেন। বড় চাচীকে বললেন, বাচ্চা দেখতে সাথে যেতে।
শ্যামলীর উই উইল উইন তখন টিন শেড বিল্ডিং। চারিপাশ তখন বিস্তর ফাঁকা। এত উঁচু উঁচু দালান আর মার্কেটে ভরে যায়নি সমস্ত এলাকা। কিছু কিছু জমিতে টিনের বেড়া দেওয়া। গায়ে জমির মালিকের নাম ঝুলছে। বিকেল বলে বাচ্চাদের খেলার মাঠে সার বেঁধে বসিয়ে একটা করে কলা আর এক পিস পাউরুটি খেতে দেওয়া হচ্ছিল।
বড় চাচী আর তার আত্মীয়া আগেই ফোনে কথা বলে নিয়েছিলেন। ওঁরা দুজন মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের দেখছিলেন। ওদের পাশে মাদার এ্যালেন ও ছিলেন। হঠাৎ বড় চাচী অনুভব করলেন একটা ছোট্ট নরম হাত তার হাত ধরে টানছে। বড় চাচী মাথা নিচু করে তাকিয়ে দেখেন একটা বছর তিনেকের মেয়ে শিশু তার হাতটি ধরে আছে। চাচী অবাক হয়ে বাচ্চাটির পাশে হাঁটু ভেঙে বসে বললেন, কী বাবু? বাচ্চাটি তার হাতের কলাটা বড় চাচীর সামনে ধরে বলল, খুলে দাও।
বড় চাচীর এমনিতেই মায়া বেশি। বাচ্চাটির প্রতি তার টান পড়ে গেল। আহা! কার সন্তান! এই বয়সে বাবা মা হারিয়ে একা একা পথ চলছে! বড় চাচীর চোখে পানি চলে এল। তিনি কলা ছিলে রুটি ছোট ছোট টুকরো করে বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিতে লাগলেন।
মাদার এ্যালেন বললেন, মেরিটা বড্ড স্নেহের কাঙাল। এখানে আরো বাচ্চা আছে। অনেকে তো স্পর্শ করতে ও দেয় না। কিন্তু মেরি আলাদা। ও ভালোবাসা খোঁজে।( মীরার নাম অ্যাসাইলামে মেরি ছিল। বড় চাচী মীরা করে নিয়েছেন)।
বড় চাচী তার আত্মীয়াকে বললেন, মেরিকে দত্তক নিতে। কিন্তু আত্মীয়াটি ছেলে বাচ্চা খুঁজছিলেন।
চলে আসার সময় মেরি বড় চাচীর হাত ধরে বলল, কাল আসবে তুমি? আমাকে খাইয়ে দেবে?
আমি এলে তুমি খুশি হবে?
হু।
কেন খুশি হবে?
আমার নিজের হাতে খেতে ভালো লাগে না।
মেরির কথা শুনে সবাই হেসে ফেলে।
সেদিন বাসায় ফেরার পর বড় চাচীর মুখ থেকে মেরির কথা সরেই না। ঐতো মোটে আধঘন্টাটাক পাশাপাশি ছিল কিন্তু বড় চাচী তাকে ভুলতেই পারেন না। মেরির কথা তার খুব মনে পড়ছিল। সুযোগ পেলেই ঘুরে ঘুরে অনাথাশ্রমের ছোট্ট মেয়েটার গল্প করছিলেন।
কিন্তু ঢাকা ছেড়ে আসবার দিন হঠাৎ দুপুরে একটু আসছি বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন বড় চাচী। ফিরলেন বিকেলে। সাথে মেরি!
সবাই অনেক মানা করেছে। কিন্তু বড় চাচী বাপের বাড়ি থেকে প্রচুর সম্পত্তি পেয়েছেন। ফলে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, মেরীর জন্য তোমাদের কারো পয়সা খরচ হবে না। আমার টাকা দিয়ে আমি ওকে বড় করবো।
বড় চাচা ভালো মানুষ। তিনি চাচীকে ভালোবাসেন। চাচীর মতামত, ইচ্চা-অনিচ্ছার মূল্য দেন। কাজেই মেরি মীরা হয়ে মিয়া বাড়িতে রয়ে গেল।
যদিও দাদীমনি মীরাকে মেনে নেন নি। পছন্দও করেন না।
তুলির এনগেজমেন্টের কথা মীরাকে যাতে জানানো না হয় এটা দাদীমনি কড়া করে বলে দিয়েছেন। বাসার সবাই দাদীকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে যে,না জানালে খারাপ দেখা যাবে। মীরা কষ্ট পাবে। কিন্তু দাদীমনি তার সিদ্ধান্তে অটল। বলে দিয়েছেন, মীরা এলে তিনি অনুষ্ঠানে থাকবেন না। চট্টগ্রামে ভাইয়ের বাড়ি চলে যাবেন

পর্ব-১১
দীপক স্যারের রুমের দরজায় তালা। সাদা কাগজে হাতে লেখা একটা নোটিশ সাঁটা – বিশেষ কারণে আজ ক্লাশ নিতে পারছি না। এসাইনমেন্টগুলো দরজার নিচ দিয়ে ভেতরে রেখে যাও।
মীরার মনটাই খারাপ হয়ে যায়। দীপক স্যারের ক্লাস বা টিউটোরিয়াল কিছুই মিস করে না ও। স্যার ভার্সিটিতে জয়েন করেছেন বছর দুয়েক হলো। খুব ফ্রেন্ডলি
সব ছাত্র-ছাত্রীদের সাথেই আন্তরিক। মীরা মাঝে মধ্যেই ক্লাসের পর বসে থাকে। স্যারের সাথে পড়াশোনার বিষয়ে কথা বলে। নিজের পেপারস ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ের বইপত্রের কথা বলেন তিনি।এছাড়াও অন্যান্য বিষয় নিয়েও টুকটাক কথা হয়। মীরা পড়াশোনার ব্যাপারে দীপক স্যারের কাছ থেকে সাজেশন নেয়।
মীরার হাতে আজ কোনো কাজ ছিল না। ভেবেছিল ক্লাস শেষে স্যারের সাথে মিশেল ফুঁকো নিয়ে একটু কথা বলবে।
দরজার নিচ দিয়ে এসাইনমেন্টটা রেখে দিয়ে ফিরতেই রুবা, নীপা, ওয়াহিদকে দেখা গেল। ওরাও পেপারস জমা দিতে এসেছে।
কী খবর মীরা? আজকাল তোর পাত্তাই নেই যে– ওয়াহিদ এগিয়ে আসে।
একটু ব্যস্ত থাকি। তোরা কেমন আছিস?
চল, চটপটি খেতে খেতে কথা বলি- নীপা ওদের ডাক দেয়। মীরা তুই তো ক্লাস শেষ করেই পালাস! ঘটনা কী রে! প্রেম করিস না কী!!! -নীপার কণ্ঠে কৌতূহল।
মীরা হেসে বলে, আরে ধূর! কী যে বলিস না!
মামা তিনটা চটপটি। একদম বোম্বাই মরিচের ঝাল দিবা- ওয়াহিদ অর্ডার করে।
ওরা তিনজন মাঠের ওপর কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে পড়ে।
সকাল সাড়ে এগারোটার ক্যাম্পাস ছাত্রছাত্রীর কোলাহলে মূখর। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে। গল্প করছে। মাঠে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
শেষ বসন্তের মন উদাস করা বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার হলুদ পাতা ঝিরঝির করে ঝরে পড়ছে । টুংটাং ঘন্টি বাজিয়ে আইসক্রিম ওয়ালা চলে গেল পাশ দিয়ে।
এরইমধ্যে আরো কিছু ছেলে মেয়ে ওদের পাশে এসে বসেছে।
রুবা হঠাৎ বলল, এই চলনা কাল আমরা শাড়ি পরি।
ওয়াও। দারুণ হবে। নীপা লাফিয়ে ওঠে।
তুই,আমি, মীরা, শোভা আর সাইদা—ঠিক আছে?
শোভা একটু আগেই পাশে এসে বসেছে। মাত্র কয়দিন আগে ওর বিয়ে হয়েছে। নতুন বউ। শাড়ির একটা মস্তো স্টক আছে এখন। কিন্তু পরার সুযোগ হয় না। স্বামী ডাক্তার। হসপিটাল-রুগী নিয়ে ব্যস্ত। শাড়ি পরার কথায় সে খুবই উৎফুল্ল হলো।
আমি এখুনি সাইদাকে ফোন দিয়ে দিচ্ছি।
আচ্ছা আমরা কী শাড়ি পরবো?
এটা, ওটা বলার পর শেষ পর্যন্ত জামদানী পরার সিদ্ধান্ত হলো। জাম কালারের জামদানী।
মীরা মনে মনে প্রমাদগুনলো। ওর জামকালারের জামদানী নেই। কিন্তু বান্ধবীদের কাছে নেই বলতে ইচ্ছে করছে না। ও বলল, জামদানী পরতে আমার ভালো লাগে না। কেমন পাতলা। আমি সিল্ক পরি?
ইস্। কী আমার সন্ন্যাসিনী! আমরা বুঝি পরবো না? শরীর দেখা গেলে আমরাও সিলেক্ট করতাম না। জামদানী ই পরতে হবে।
আরো একটু গল্পটল্পর পর মীরা উঠে পড়ে। ছাত্রের বাসায় যেতে হবে। শাড়ি কিনতে হবে। একটু বাজারও করা প্রয়োজন। ঘরে চাল নেই। ডালের কৌটো ও খালি।
আমি এখন যাই রে। কাল ক্লাসে দেখা হবে।
ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে নেয় মীরা।
এখন বেলা দেড়টা।
সাড়ে তিনটায় ছাত্রের বাসায় যেতে হবে।
তার আগে শাড়ি কিনতে হবে।
খুব ক্ষিদেও পেয়েছে। চটপটিতে এত বেশি ঝাল ছিল মীরা দুতিন চামচের বেশি খেতে পারেনি। ওয়াহিদ ওর প্লেটের বাকিটুকু খেয়ে নিতে নিতে বলছিল, আমি মনে হয় তোদের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি! ইউটিউব থেকে প্রপোজ করার কিছু ভিডিও দেখতে হবে। আমি তো হীরা পান্না দিতে পারবো না, এই রুবা ফুল দিয়ে আংটি বানানো যায় রে? সবার প্রেমে পড়ে যাওয়া তুই কি সবাইকেই প্রপোজ করবি নাকী? প্রশ্ন করে মীরা।
ওয়াহিদ বলে, আরে গাধী টার্গেট ছুঁড়তেই থাকবো। কোথাও তো লাগবে!
সবাই হেসে ওঠে।
এসব নিয়েও আজ বড্ড হাসাহাসি হলো। ওয়াহিদ ভীষণ বড় হৃদয়ের ছেলে। বন্ধু হিসাবেও দারুণ। ওর ওপর রাগ করা যায় না।
মার্কেটে নেমে একটা পরিচিত শাড়ির দোকানে ঢোকে মীরা।

Related Articles

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে: সৈয়দ টিটু

আনিসুজ্জামান খোকন :নিজস্ব প্রতিবেদক: কিশোরগঞ্জে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,...

দীপিকার পায়জামা খুলে যাওয়ার রহস্য ফাঁস

কয়েক মাস বিরতির পর আবারও নেটমাধ্যমে ফিরেছেন বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোন। ফিরেই ইনস্টাগ্রামে নতুন একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভৌতিক কায়দায় সেই ভিডিওতে মুগ্ধ নেটাগরিকরা।...

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে জয়যাত্রা টিভি

আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও এফবিসিআই-এর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপি টিভির অফিসে অভিযানে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র‍্যাব। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই)...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে: সৈয়দ টিটু

আনিসুজ্জামান খোকন :নিজস্ব প্রতিবেদক: কিশোরগঞ্জে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,...

দীপিকার পায়জামা খুলে যাওয়ার রহস্য ফাঁস

কয়েক মাস বিরতির পর আবারও নেটমাধ্যমে ফিরেছেন বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোন। ফিরেই ইনস্টাগ্রামে নতুন একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভৌতিক কায়দায় সেই ভিডিওতে মুগ্ধ নেটাগরিকরা।...

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে জয়যাত্রা টিভি

আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও এফবিসিআই-এর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপি টিভির অফিসে অভিযানে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র‍্যাব। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই)...

হেলেনা আক্তার থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীর

বিভিন্ন সময় নানা ভাবে আলোচনা-সমালোচনায় আসা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) দিবাগত রাতে গুলশানের নিজ বাসা থেকে আটক করে র‌্যাব। কখনও ব্যবসায়িক আবার কখনও...

আটকের পর রহস্যজনক হাসি হেলেনার

আওয়ামী লীগের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামসর্বস্ব সংগঠন ‘চাকরিজীবী লীগ’ নিয়ে আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও এফবিসিআই’র পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গুলশানের বাসায় থেকে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে।...