Thursday, September 23, 2021

ধারাবাহিক : নুসরাত রীপা-পলাশ রাঙা দিন



পর্ব-৯
রাস্তার একধারে মোটর বাইকটা থামিয়ে উল্টোপাশের খুশবু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টটার দিকে তাকালো অয়ন। মন যেন পরিচিত কাউকে খুঁজছে! কিন্তু এদিকে কোনো আত্মীয়-বন্ধুই থাকে না!
জেবার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর আজকাল প্রায়ই ঢাকা আসা হয় । আগে খুব জরুরী দরকারও ঢাকায় না এসে সারার চেষ্টা করতো। কিন্তু আজকাল ছুটি ছাটা পেলেই বাইক নিয়ে সোজা ঢাকা। তিন-চার ঘন্টার রাস্তা। বাইকে তেমন কষ্ট হয় না। আর জেবার মতো মিষ্টি একটা মেয়ের সাথে সময় কাটালে সমস্ত ক্লান্তি, শ্রান্তি এমনিতেই দূর হয়ে যায়।
প্রথম প্রথম বার দুই জেবাদের বাসায় গিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের আগে বার বার শ্বশুরবাড়ি যাওয়াটা কেমন যেন লাগে। আজকাল তাই যায় না। পরিচিত এক বন্ধুর ভাইয়ের আবাসিক হোটেল আছে কাকরাইলে। অয়ন ঢাকা এসে প্রথমে ওখানেই ওঠে। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে টেয়ে তারপর জেবাকে ফোন দেয়- একটু বেরোবে?
জেবাদের বাসা থেকে আধঘন্টাটাক সময়ের দূরত্বে একটা শপিংমল আছে। অয়ন সেখানে অপেক্ষা করে। জেবা হয়তো অয়নের ফোনের অপেক্ষাতেই থাকে। ফোন করার কিছু সময়ের মধ্যেই পরীর মতো সুন্দর জেবা সামনে এসে দাঁড়ায়। জেবার গা থেকে সব সময় মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসে। চোখ বুঁজেও সেই সুবাসে জেবার আগমন ঠিক টের পায় অয়ন।
সারাদিন দুজনে মিলে ঘুরে বেড়ায়। খাওয়া দাওয়া করে। অয়ন জেবাকে কিছু না কিছু কিনে দেয়। সন্ধ্যের মুখে জেবাকে বাসার গেটে নামিয়ে দিয়ে অয়ন হোটেলে ফেরে। এর মাঝে জেবাকে বলা আছে বাসায় ফিরে নিজের ঘরে ঢুকেই একটা ভিডিও কল দিতে। যাতে অয়ন নিশ্চিন্ত হতে পারে জেবা নিরাপদ আছে! আজকাল নিরাপত্তাটা কমে গেছে। কী নারী, কী পুরুষ। পুলিশে চাকরি করার সুবাদে অয়ন বিষয়টা আরো ভালো জানে। যদিও তারা চেষ্টা করে সবাইকে নিরাপত্তা দিতে কিন্তু সামগ্রিক চেষ্টার বদলে মুষ্টিমেয়র চেষ্টা সফল হওয়া কঠিন।
বাসার বাইরে বেরোলেই চিন্তা ঘরে ঠিকমতো ফেরা হবে তো?
অয়নের এমন দুশ্চিন্তা দেখে জেবে হাসিতে ভেঙে পড়ে।
ইস্! আমি যেন একা চলি না!
অয়ন বলে, নিশ্চয়ই চল। কিন্তু আমার সঙ্গে বেরিয়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে আমার শ্বশুর আব্বা আমাকে ভর্তা বানাবে। এই বয়সে আমি ভর্তা হতে চাই না প্রিয়তমা!
জেবার হাসি দ্বিগুন হয়!
প্রথম দিকে জেবা অয়নকে বাসায় যেতে খুব পীড়াপীড়ি করতো। অয়ন বুঝিয়েছে রোজ রোজ হবু জামাই বাসায় এলে লোকে হাসবে। এখন তাই আর বলে না!
আজ জেবাকে একটু আগেই নামিয়ে দিতে হয়েছে। আত্মীয়ের বাসায় প্রোগ্রাম আছে। কিন্তু অয়নের তো জেবার সাথে সময় কাটানো ছাড়া ঢাকায় আর কিছু করার নেই। অনিশ্চিত বাইক চালাতেই এদিকে চলে আসা।
কিছুদিন আগে জেবাকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এখানে খেতে ঢুকে মীরার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। মীরা বিরিয়ানির অর্ডার দিয়ে চুপচাপ বসে ছিল।
মীরাকে দেখলে লতার মত মনে হয়। কোমল, সবুজ। ভারি চশমার আড়ালে চোখ দুটো কেমন উদাস! কথা বলার ভঙ্গীটি বেশ মিষ্টি!
অয়ন বাইকটা রেখে খুশবু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে। কেন যেন মনে হয় এখানে মীরার দেখা পাওয়া যাবে! অয়নকে ঢুকতে দেখে একজন ওয়েটার এগিয়ে আসে, স্যারেরা কয়জন? উপরে চলে যান। উপরে খালি আছে। অয়ন চারিদিকে দৃষ্টি বোলায়। এখন বিকেল। সাড়ে চারটার বেশি বাজে। অথচ দোকানে এখনো মানুষের ভিড়। লোকজন লাঞ্চ করছে! অয়ন একা, একজনই। কিন্তু কাউকে বলা হয় না। সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পড়ে। একটা খালি টেবিল দেখে এগিয়ে যেতে যেতে চর্তুপাশে চোখ বোলায়। একটা কমলা পোশাকের মেয়ে দেখে হঠাৎ চমকে ওঠে। মীরা! পরমুহূর্তে ভুল ভাঙে। মীরা নয়। এবং অয়ন বুঝতে পারে ওর বড্ড মীরার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

পর্ব-১০

তুলির বিয়ের প্রপোজাল এসেছে। ছেলে বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ারিং পাশ করে স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে যাচ্ছে। ছেলের বাবা সেজো চাচার বন্ধু। তুলিকে তাদের খুব পছন্দ। ছেলেকে একবারে বিয়ে দিয়ে বাইরে পাঠাতে চান।
ছোট চাচা পড়াশুনা কমপ্লিট না করিয়ে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি নন। কিন্তু ছেলেপক্ষ বলছে, বিয়ের পর তুলির পড়া বন্ধ হবে না। এই যুগে মাস্টার্স পাশ ছাড়া কেউ আছে না কী! তাছাড়া তুলির রেজাল্ট ভালো। দেশের বাইরে পড়ার সুযোগ পেলে ও ভালো করবে।
সুরেশ্বরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম চার ভাই, দুই বোন। মেজো জন ডাক্তার। এলাকাতেই ডাক্তারি করেন। সেজো জনের পেশা ওকালতি। কুমিল্লা সদরে ওনার চেম্বার আর ছোট জন এলাকায় দাদার দেওয়া কলেজের অধ্যক্ষ।
বংশ পরম্পরায়য় পাওয়া সম্পদ ও সুনামে এলাকায় তারা পরিচিত। বড়দাদা মিয়া আব্দুল করিম ও সুশিক্ষিত ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসাও বনেদী বংশের। একপুত্র জন্মদিয়ে মেহেরুন্নেসার মৃত্যু হলে মিয়া আব্দুল করিম নিজ হাতে মা বাবা উভয়ের স্নেহ মমতা দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলেন। মিয়া মোহাম্মদ আজাদ সুলতান একমাত্র সন্তান বলে তাকে কোনদিন কাছ ছাড়া করেন নি মিয়া আব্দুল করিম। ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য এলাকায় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন বাবার নামে। সেই কলেজ এখনো এলাকায় শিক্ষা বিতরণ করে যাচ্ছে। এখানেই পড়াশোনা করেছেন সুলতান। একারণে তিনি উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়তে পারেন নি। যদিও সেই কলেজে এখন অনার্স এবং মাস্টার্সও পড়ানো হয়।
মিয়া মোহাম্মদ আজাদ সুলতান এলাকায় সুলতান মিয়া নামে পরিচিত। বর্তমান প্রজন্ম তারই সন্তান। তিনি গত হয়েছেন কিন্তু তার স্ত্রী হুরই জান্নাত জীবিত আছেন।
নাতনীর বিয়ের প্রপোজাল আসায় তিনি খুবই উৎফুল্ল।
গত কয়দিন ধরে তুলির বিয়ে নিয়েই বাসায় আলোচনা চলছে। রাজু বিজুর ভার্সিটি খোলা। ওরা এখানে নেই। তুলির ছোট নিটোলেরও ক্যাডেট কলেজ খোলা।
বাড়িতে এ মুহূর্তে কেবল ছোট চাচার স্কুলে পড়ুয়া ছেলে মিতুল আর মেয়ে মাথিন!
তুলি নিজের ঘর থেকে আধা আধা সব শুনছে। কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও পারছে না। নিজের বিয়ের কথা কীভাবে জিজ্ঞেস করবে! মিতুল আর মাথিনকে ডেকে যে কিছু জানতে চাইবে সেটাও সম্ভব নয়। ওরা দুজন হা করে সবার সব কথা শুনছে ঠিকই কিন্তু তুলি যদি এখন কিছু জানতে চায় তাহলে বলবে, দাঁড়াও আব্বুর কাছ থেকে শুনে আসি!
বিদেশ যাওয়ার ভীষণ সখ তুলির! কিন্তু এখন বিয়ে করে বিদেশ যাওয়াটা ঠিক হবে কীনা বুঝতে পারছে না। রিসার্চ করার ইচ্ছে ওর। যদি বিয়ের পর বেবি এসে যায়! যদি পড়াটাই আর না হয় তাহলে তো স্বপ্ন পূরণ হবে না!— ইস কারো সাথে বিষয়টা শেয়ার করা গেলে ভালো হতো।
মীরার কথা মনে পড়ে তুলির। ও ঠিক করে ছাদে উঠে নিরিবিলিতে ফোন করে বিষয়টা জানাবে মীরাকে। এ বাড়িতে ছাদ ছাড়া নিরিবিলিতে কথা বলার কোনও উপায় নেই!
ফোনটা নিয়ে ছাদে উঠতে থাকে তুলি। দুপুরের রোদ সিঁড়ির ওপর ঝা ঝা করছে।
বিস্তীর্ণ খোলা ছাদে লোহার দোলনার এক মাথায় একটা কাক হা করে বসে আছে। ছাাদে পা দিতে যাবে ঠিক তখুনি বড় চাচীর কণ্ঠ শুনে থেমে যায় তুলি।
মীরা এ বাড়ির বড় মেয়ে। ওর আগে তুলির বিয়ে হলে ব্যাপারটা কেমন দেখায়?
আহা শারমীন! বোঝনা কেন। মীরা তো এ বংশের কেউ না। তুমি ওকে যেভাবে দেখ সবাই তো সেভাবে দেখবে না। এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে মা। গত উনিশ বছরেও তিনি মীরাকে ভালোবাসতে তো পারেনই নি। নিজের ঘরে পর্যন্ত ঢুকতে দেন না। এখন তুলির জন্য আসা সম্মন্ধ কি মীরার জন্য ভাঙতে দেবেন?
আরে না না না! তুলির সম্মন্ধ ভাঙবে কেন? একটু অপেক্ষা করে, মীরাকে বিয়ে দিয়ে তারপর তুলিকে—-
বোকার মত কথা বলোনা শারমীন, মীরার বিয়ে দেওয়াটা অত সহজ হবে কি? ভেবে দেখ। আর তুলির বিয়েটা হয়ে যাক। তুমি কিছু বলতে যেও না।
আহা তুলি তো আমাদেরই মেয়ে। ওর বিয়ে তো আমাদেরই আনন্দ — কিন্ত মীরাটা বড্ড কষ্ট পাবে—-
বড় চাচীর ধরা গলা থেমে যায়।
তুলি আর দাঁড়ায় না। প্রায় নিশব্দে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিজের ঘরে এসে বিছানায় বসে পড়ে। হৃৎপিন্ডটা জোরে জোরে লাফাচ্ছে। যেন এখুনি বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে!

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...