Sunday, September 19, 2021

দারিদ্র্য বিমোচনের নামে কৃষিবিদ আমিনুলের লুটপাট

নতুন প্রযুক্তিতে মাছ চাষ ও পাট পঁচানো প্রকল্প
‘হাজামজা বা পতিত পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পাট পচানো পরবর্তী মাছ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন’ প্রকল্পে লুটপাট

  • মূল কাজ পুকুর পুনঃখননের খবর নেই, কেনা হয়েছে ২৯টি গাড়ি ও মোটরসাইকেল
  • অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে ৩৬ শতাংশ

দুর্নীতির কারণে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) করা হয়েছিল কৃষিবিদ আমিনুল ইসলামকে কিন্তু তিনি লাভজনক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদটিও নিজের দখলে রেখে লুটপাট চালিয়ে যাবার পাশাপাশি ব্যবসাও করেছেন ইচ্ছেমত, তছরুপ করেছেন কোটি কোটি টাকা। পরে তাকে সরিয়ে দিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করলেও আমিনুলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

পুকুর খনন করে নতুন প্রযুক্তিতে পাট পচানো ও মাছ চাষ করার জন্য ঋণ নেওয়ার ৪ বছরও কোনো কাজই হয়নি। পুকুর না থাকার ফলে সংশ্লিষ্ট শ্যালো মেশিনসহ প্রকল্পের অন্য পণ্যও ব্যবহার করা হচ্ছে না। ‘হাজামাজা/পতিত পুকুর পুনর্খননের মাধ্যমে সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পাট পচানোর পরবর্তী মাছ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন’ প্রকল্পে এ ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। উপকারভোগীরা ঋণ গ্রহণ করে জমি ক্রয়, রিকশা, ভ্যান, দোকান ক্রয়সহ নানা ধরনের ব্যবসার কাজে ব্যবহার করছে বলে জানায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) বিভাগ।
২০১৬ সালের জুলাই মাসে অনুমোদিত ‘হাজামাজা/পতিত পুকুর পুনর্খননের মাধ্যমে সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পাট পচানোর পরবর্তী মাছ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন’ প্রকল্পটি জুন ২০২১ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কিন্তু এই ৪ বছরে কোনো অগ্রগতি নেই। পাটের আঁশ ও পানির গুণগত মান ঠিক রাখার লক্ষ্যে শ্রম ও ব্যয়সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও পাট পচানোর পরবর্তী জলাশয়/পুকুরে মাছ চাষের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উদ্যোগে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) মোট ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের ডিপিপিতে প্রতিটি পুকুরকেন্দ্রিক সমিতি গঠন করার কথা। কিন্তু প্রকল্পের নির্দেশনা অনুসারে ২৮টি উপজেলায় ২৮০টি পুকুরকেন্দ্রিক সমিতি করার কথা থাকলেও কোনো কমিটি হয়নি। এদিকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৪টি প্যাকেজের মাধ্যমে ৭৩টি পুকুর পুনর্খননের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোনো পুকুর খনন করা হয়নি। পুনর্খনন ব্যতীত নতুন করে পুকুর খনন করার কথা রয়েছে। ৯৮টি পতিত পুকুর খনন বাবদ প্রকল্প থেকে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হলেও এ পর্যন্ত ঋণগ্রহীতারা পুকুর খনন করেনি। এ ছাড়া পুকুর পানি সরবরাহের জন্য শ্যালো মেশিন স্থাপন করার কথা হলেও তা স্থাপিত হয়নি। যেহেতু কোনো ধরনের পুকুর নেই বিধায় এমন শ্যালো মেশিনের প্রয়োজনই নেই।
পল্লী ও সমবায় বিভাগের সচিব মো. রেজাউল আহসান বলেন, প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি ৫০ ভাগ হয়ে গিয়েছে। করোনাকালীন অন্য প্রকল্পের মতোই এটিতেই ধীরগতি হয়েছে। তবে আশা করি, নির্দিষ্ট সময়েই সফলভাবেই প্রকল্পটি শেষ হবে।


পাট পচানোর জন্য রিবন রেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়। কিন্তু রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে অধিক খরচ ও শ্রমিকনির্ভর বিধায় চাষিদের মধ্যে এটা জনপ্রিয় হয়নি। প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও উপকারভোগী পাটচাষিরা এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই কাজ করছেন।
প্রকল্পের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো, পতিত পুকুর পুনর্খনন করে পাট পচানো পরে মাছ চাষ করা। কিন্তু কোনো পুকুরেই পাট পচানো ও মাছ চাষের কর্মকা-ই চলছে না। এর মধ্যে বেশিরভাগ ঋণগ্রহীতা জমি ক্রয়, রিকশা, ভ্যান, দোকান ক্রয়সহ নানা ধরনের ব্যবসার কাজে ব্যবহার করছেন।

কৃষিবিদ আমিনুলের সীমাহীন লুটপাট
মূল কাজ পুকুর পুনঃখনন, এর কোনো খবর নেই। আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যস্ত কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে গাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনা হয়েছে ২৯টি। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল সেটি পূরণ না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাস্তবায়নের লক্ষ্য থেকে এখনও ৩৬ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে প্রকল্পটি। মূল কাজ বাস্তবায়ন না করে আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করাকে অনিয়ম হিসেবে দেখছে আইএমইডি। মাত্র ৩৯ কোটি টাকার ‘হাজামজা বা পতিত পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পাট পচানো পরবর্তী মাছ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন’ প্রকল্পের এ চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএমইডি’র সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেন, মূল কাজ বাদ রেখে অন্যান্য কাজ করায় প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে। এটা অবশ্যই বিশাল অনিয়ম। তবে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম হলে সেটি ভিন্ন কথা ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রকল্পটি যে নামে তৈরি হয়েছে সেই কাজই করা হয়নি। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া।
সূত্র জানায়, পাটের আঁশ ও পানির গুণগত মান ঠিক রাখার লক্ষ্যে শ্রম ও ব্যয় সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য এ প্রকল্পটি হাতে নেয় পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ)। এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, পতিত পুকুর পুনঃখনন করে সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পাট পচানো এবং পরে সেখানে মাছ চাষ করা। অন্যান্য উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে : স্বল্প খরচে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎকৃষ্ট মানের পাটের আঁশ উৎপাদন করা। বাজার ব্যবস্থায় অবাধ অংশগ্রহণ এবং উৎপাদিত উৎকৃষ্ট মানের পাটের বাজারজাত সহজীকরণ। উন্নত মাছ চাষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি। সংগঠিত জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পুঁজি গঠন ও ঋণ বিতরণের মাধ্যমে আর্থিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ উপকারভোগী পাট পচানোর জন্য পুকুর ব্যবহার করেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে। সমবায়ভিত্তিক পাট পচানো ও পরে মাছ চাষে ব্যক্তিমালিকানার পুকুরগুলো কি শর্তে সমবায় সমিতির অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সমিতির সদস্যদের শেয়ার কি হারে হবে এসব বিষয় তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কোনো পুকুরেই এখন পর্যন্ত একই সঙ্গে পাট পচানো এবং মাছ চাষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি।
সমীক্ষায় অংশ নেয়া ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ চাষী প্রচলিত সনাতন পদ্ধতিতে পাট পচিয়ে থাকেন। যার ফলে প্রকল্পের দ্বিতীয় ও তৃতীয় উদ্দেশ্যও পূরণ হয়নি। প্রকল্পের আওতায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৮০টি শ্যালো মেশিন কেনার সংস্থান থাকলেও এখন পর্যন্ত একটিও কেনা হয়নি। তবে একটি জিপ গাড়ি ও ২৮টি মোটরসাইকেল কেনার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া পুকুর পুনঃখননের ক্ষেত্রে ডিপিপির কাজের সঙ্গে দরপত্রের কাজে অসাঞ্জস্যতা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) উল্লিখিত কাজ না করাটা অবশ্যই বড় ধরনের অনিয়ম। মূল কাজ না করে অন্যান্য কাজ করাটা আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটে। তাছাড়া এ রকম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এমন প্রকল্প নেয়ার যুক্তিটাই বা কি? এদের কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না। ফলে মূল কাজের পরিবর্তে গাড়ি, এসি সংগ্রহেই বেশি মনোযোগ থাকে। প্রকল্পে যদি মূল উদ্দেশ্যই পূরণ না হয় তাহলে বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া প্রকল্প দিয়ে ফাউন্ডেশন বাঁচিয়ে রাখার যুক্তিটা কি?
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকরী সংস্থা পিডিবিএফের তহবিল থেকে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুকূলে ব্যয় হয়েছে ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কিন্তু ব্যয়ের কোন স্পষ্টতা নেই। প্রকল্প পরিচালক নিজের খেয়াল খুশিমত সবকিছু করছেন। এ সময় পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতির লক্ষ্য ছিল ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ। ফলে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে ৪৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এদিকে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির লক্ষ্য ছিল ৮৫ শতাংশ। কিন্তু অর্র্জিত হয়েছে ৪৯ শতাংশ। এ ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে ৩৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত ২৮১টি সমিতি গঠন করে পাঁচ হাজার ৯২২ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু এগুলো করা হয়েছে কাগজে-কলমে বাস্তবে এসবের কোন অস্তি¡ত্ব নেই। তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হল, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ২৮টি উপজেলায় প্রতিটিতে ১০টি করে মোট ২৮০টি পুকুরকেন্দ্রিক সমিতি গঠন করতে হবে। যেখানে প্রতিটি সমিতিতে মাছ চাষের জন্য ১০ জন ও অন্যান্য আয়বর্ধক কাজের জন্য ১০ জন সদস্য থাকবে। কিন্তু বাস্তবে পুকুরভিত্তিক কোনো সমিতি গঠন করা হয়নি। এমনকি মাছ চাষ ও অন্যান্য আয়বর্ধক কাজের জন্য সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ডিপিপিতে বর্ণিত আনুপাতিক হার অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত এপ্রিল পর্যন্ত ৯৮টি হাজামজা বা পতিত পুকুর পুনঃখনন ও মেরামতের জন্য মোট ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে কাগজে কলমে বাস্তবে নাই, ঋণ গ্রহিতাদের তালিকা চেয়েও পাওয়া যায়নি। অপরদিকে পতিত পুকুরে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে মোট ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অগভীর নলকূপ, যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইন সরবরাহের সংস্থান থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতিই হয়নি। তবে প্রকল্পের আওতায় ঋণ গ্রহণকারী সদস্য চার হাজার ৫৭৪ জন। এ অঙ্গে অগ্রগতি হয়েছে ৮১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত তিন হাজার ৫০ জন উপকারভোগীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৫৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। প্রকল্পের নির্ধারিত পাঁচটি ওয়ার্কশপের মধ্যে তিনটি সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। তবে এসব কাজের তালিকা সরবরাহ করতে রাজি হননি প্রকল্প পরিচালক। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়েও পাওয়া যায়নি।

কর্মস্থলেই প্রকল্প পরিচালকের ব্যবসা!
চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে নিজেই ব্যবসা করছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বর্তমান প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আমিনুল ইসলাম-এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগে আর্থিক সুবিধা নেয়াসহ নানা অনিয়ম করেছেন তিনি।
এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অতিরিক্ত সচিব) খালিদ পারভেজ খানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পিডিবিএফের সব প্রকল্প স্থগিত করেছে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। এর আগে দুর্নীতির কারণে পিডিবিএফের যুগ্ম পরিচালক ড. মনারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তিনি একাই তিনটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। প্রকল্পগুলো হল- পিডিবিএফ সম্প্রসারণ, আইসিটি ও ই-সেবা শক্তিশালীকরণ এবং গঙ্গাচড়া ও হাতিবান্ধা উপজেলার প্রত্যন্ত এবং চরাঞ্চলে সোলার স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন।
তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সব কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া মনারুলের আর্থিক দুর্নীতির বিষয় খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)।
উল্লিখিত বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মো. রেজাউল আহসান। তিনি বলেন, ‘পিডিবিএফের সাবেক ভারপ্রাপ্ত এমডি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সব প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। তারা নতুন করে ৩টি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি নতুন প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ ড. মনারুল ইসলামের আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট দেয়নি বলেও জানান সচিব রেজাউল আহসান।
পিডিবিএফ প্রবিধান ও সরকারি কর্মচারী আইন অনুযায়ী, সরকারি কোনো কর্মচারী পূর্বানুমোদন ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। একই সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা ব্যবসায়ও জড়াতে পারেন না। কিন্তু বিধিবিধান অমান্য করে ক্রয় কমিটির প্রধানের দায়িত্বে থেকেও পিডিবিএফের সাবেক ভারপ্রাপ্ত এমডি আমিনুল ইসলাম নির্বিঘেœ কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন তিন বছরের বেশি সময় ধরে। ২৫ আগস্ট পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মী। উল্লেখযোগ্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- সৌরশক্তি উন্নয়ন কর্মসূচির ৮ কোটি টাকার কাজ সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নামে এনজিরা সোলার ও সানার্জি টেকনোলজি লিমিটেডের মাধ্যমে বাজারদরের দ্বিগুণ দামে উপকরণ কিনে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান হলেও এনজিরা সোলারের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের স্ত্রী এবং সানার্জি টেকনোলজির সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক পার্টনার রয়েছেন এমডি আমিনুল ইসলাম।
সানার্জি টেকনোলজির ১৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে ৫ হাজার শেয়ারের মালিক আমিনুল। তিনি পিডিবিএফের ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব নেয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রকল্প ‘সৌরশক্তি উন্নয়ন কর্মসূচি’র সিংহভাগ কাজ পায় (২ কোটি টাকা) সানার্জি টেকনোলজি। অভিযোগ অনুযায়ী, আমিনুল পিডিবিএফে তার অধীন প্রকল্পে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে তিনগুণ দামে পণ্য কিনছেন।


বাজারে যে সোলার ১২ হাজার টাকা, সেই সোলার কেনা হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকায়। এভাবে আমিনুল পিডিবিএফের প্রধান হয়েও আলাদা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান খুলে ২ প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন, যা পিডিবিএফ প্রবিধানমালার ৪নং অনুচ্ছেদ-৩-এর (ক) এবং (খ)-এর পরিপন্থী। এ দুটি ধারায় বলা হয়েছে, (ক) ফাউন্ডেশনে তার কর্মকালীন সময়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্য কোথাও কোনো পদে অথবা অন্য কোনো অফিস বা প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক কোন কাজ করিবেন না। (খ) ফাউন্ডেশনের ব্যবসার বা কাজ-কারবারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নিকট থেকে কোনরূপ উপহার সামগ্রী গ্রহণ করা যাইবে না।
এছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ ও সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উচ্চতর পদে পদায়ন এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হয় ওই অভিযোগপত্রে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে খতিয়ে দেখতে ২৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ।
সানার্জি টেকনোলজির ৫ হাজার শেয়ার কেনার কথা স্বীকার করলেও বাকি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিডিবিএফের ভারপ্রাপ্ত এমডি আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী এনজিরা সোলার কোম্পানির কোনো সাইনিং অথরিটি নন। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি নেই। আমি ইতোমধ্যে সানার্জি টেকনোলজির শেয়ার সারেন্ডার করেছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
একজন নাগরিক হিসেবে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনতে পারি। এতে পিডিবিএফের প্রবিধানমালার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।’ আর্থিক সুবিধা নিয়ে কাউকে নিয়োগ বা উচ্চপদে পদায়ন করেননি বলেও মন্তব্য করেন আমিনুল ইসলাম। অভ্যন্তরীণ পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পিডিবিএফের ভারপ্রাপ্ত এমডি আমিনুলের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প ‘হাজামজা বা পতিত পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে সংগঠিত জনগোষ্ঠীর পাট পচানো-পরবর্তী মাছ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের কাজ না করেই টাকা লোপাটের প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে তার বিরুদ্ধে।
এতে বলা হয়, মূল কাজ পুকুর পুনঃখনন না করে ২৯ গাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনাসহ অন্য কার্যক্রম ব্যস্ত ছিলেন কর্মকর্তারা। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

আমিনুলের তেলেসমাতি
দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে সদ্য সাবেক হওয়া আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি এই পাবলিক প্রতিষ্ঠানটিতে এমডির ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে ছিলেন মাত্র এক বছর চার মাস। এই সময়ে নিজের এবং স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে ১০ কোটি টাকার কাজ দেওয়ার মাধ্যমে কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ, বদলির কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য লিখিতভাবে মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলেও সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে ১৬৩ জনকে নিয়োগ এবং দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি করেছেন। এ বাবদ তাঁর পকেটে গেছে ১২ কোটি টাকা। আর ঝড়ের গতিতে চাকরিবিধি উপেক্ষা করে নিজের জন্যও একাধিক পদোন্নতি বাগানোর তথ্য-প্রমাণ উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিডিবিএফের কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা কার্যালয়ের সিনিয়র উপজেলা দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তা (সিনিয়র পিডিবিএফ) ছিলেন শেখ মো. আবুল বাশার। ২০১৭ সালে সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণের নামে তিন লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগসহ একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত কমিটি করে প্রতিষ্ঠানটি। তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় বিভাগীয় মামলা হয়। ওই মামলায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে সিনিয়র থেকে জুনিয়র পদে এবং বেতন স্কেলের নিম্ন ধাপে অবনমিত করা হয়। পাশাপাশি আত্মসাৎ করা টাকা এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়। শাস্তি-পরবর্তী সময়ে বগুড়ার পাঁচবিবি উপজেলায় তাঁকে বদলি করা হয়। কিন্তু আমিনুল ইসলাম ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের এমডি হয়েই মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সাজাপ্রাপ্ত বাশারকে পদোন্নতি দিয়ে জামালপুর জেলায় ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব দেন। আরেক ঘটনায় বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা পিডিবিএফের উপজেলা দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা হয়। ২০১৫ সালে ৪৪ হাজার ৯৬ টাকা আত্মসাৎসহ গ্রামের মানুষকে সোলার প্যানেল বরাদ্দ দেখিয়ে নিজের পরিবারের ব্যবহারের অভিযোগে ওই মামলা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকেও শাস্তিস্বরূপ বেতন স্কেলের এক ধাপ নিচের পদে অবনমিত করা হয়। কিন্তু এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকেও আমিনুল আর্থিক সুবিধা নিয়ে উচ্চতর পদ ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক (ডিডি) হিসেবে লালমনিরহাট জেলায় দায়িত্ব দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু আবুল বাশার আর আব্দুর রহমানই নন, গ্রামের দরিদ্র মানুষের ঋণের টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ থাকা টাঙ্গাইলের আব্দুল্লাহ আল মামুন, পাবনার গোলাম মোস্তফা, ময়মনসিংহের আবু ইউসুফ মো. শাজাহানসহ ৩৪ জনকে ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক পড়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু আমিনুল সিনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং দায়িত্ব না দিয়ে এ রকম দুর্নীতিবাজ শতাধিক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি এবং সুবিধাজনক জায়গায় বদলির মাধ্যমে পকেটে পুরেছেন ঘুষের কয়েক কোটি টাকা।
আমিনুল ইসলামের দুর্নীতি এবং অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। সাজাপ্রাপ্তদের পদোন্নতিই শুধু নয়, মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আমিনুল ছয়টি পদে নতুন করে ১৬৩ জন নিয়োগ দিয়ে হাতিয়ে নেন ১০ কোটি টাকার বেশি। নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করা, স্বজনদের অ্যাকাউন্টে ঘুষের টাকা লেনদেন, ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাৎ, হাজামাজা প্রকল্পের পুকুর খনন ও মাছ চাষ প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে তদন্তে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. খালিদ পারভেজ খানের নেতৃত্বে উপসচিব কেরামত আলী ও সিনিয়র সহকারী সচিব আরিফুল হককে নিয়ে ওই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।
অভিযোগ আছে, আমিনুল নিজেও তাঁর প্রমোশন বাগিয়ে নেন দুর্নীতির মাধ্যমে। পিডিবিএফের সব পদে পদোন্নতির জন্য চাকরির প্রবিধানমালা অনুযায়ী তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকার বিধান থাকলেও এ বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয় তাঁর ক্ষেত্রে। সাবেক এমডি মাহাবুবুর রহমানকে ম্যানেজ করে মাত্র এক বছর ছয় মাসের মধ্যে ২০১৩ সালে উপপরিচালক থেকে যুগ্ম পরিচালক পদে পদোন্নতি নেন তিনি। এরপর নিয়মমাফিক অতিরিক্ত পরিচালক পদে উন্নীত হন। অতিরিক্ত পরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি পেতে প্রবিধানমালা অনুযায়ী পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তিন বছর ১৪ দিনের মাথায় প্রভাব খাটিয়ে তিনি হয়ে যান পরিচালক। এরপর সিনিয়র দুজন পরিচালককে ডিঙিয়ে এবং হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটিও নিজের করে নেন আমিনুল। তাঁকে এই পদে বসানোর নেপথ্য কারিগর হিসেবে ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কামাল উদ্দিন তালুকদার।
এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পিডিবিএফের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েই দুর্নীতির মচ্ছব শুরু করেন আমিনুল। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত সুত্রে জানা গেছে, তিনি আবার আগের পরিচালক পদে ফিরেছেন গত বছরের ২১ ডিসেম্বর।
আমিনুল এই পাবলিক প্রতিষ্ঠানের একজন স্থায়ী কর্মচারী হয়েও নিজের মালিকানাধীন কম্পানি সানার্জি টেকনোলজিস লিমিটেডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে কোটি কোটি টাকার সোলার সামগ্রী সরবরাহ করেছেন। একইভাবে তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন কম্পানি ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অ্যাঙ্গিরা ইলেকট্রনিকসও সোলার সামগ্রীসহ বিভিন্ন ফার্নিচার সরবরাহ করে। জয়েন্ট স্টক কম্পানির প্রফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, সানার্জি টেকনোলজিসে এক নম্বর শেয়ার হোল্ডার হিসেবে আছেন আমিনুল। এই কম্পানির পাঁচ হাজার শেয়ার রয়েছে তাঁর মালিকানায়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের কম্পানির মাধ্যমে সৌর শক্তি প্রকল্পেরও সভাপতি ছিলেন আমিনুল। সৌর শক্তি প্রকল্পের পরিচালনা কমিটির সভাপতির পদ কাজে লাগিয়ে নিজের এবং স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়ে ব্যবসা করেছেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী।
সানার্জি ও অ্যাঙ্গিরার প্রফাইল ও কার্যাদেশপত্র যাচাই করে দেখা যায়, আমিনুলের মালিকানাধীন সানার্জি টেকনোলজিসকে এক কোটি ২৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আর স্ত্রীর মালিকানাধীন অ্যাঙ্গিরা ইলেকট্রনিকসকে চার কোটি টাকার কার্যাদেশ দেন। স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানকে সোলার সামগ্রী কেনার জন্য আরো প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে মুজিবশতবর্ষ পালন উপলক্ষে ‘চেতনায় বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম প্রচারের কথা বলে কৌশলে ৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আমিনুলের বিরুদ্ধে। এমডি থাকাকালে বিভিন্ন মামলায় আইনি খরচের নামে ৮২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়, যা অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছিলেন আমিনুল ইসলাম। নিয়োগ, পদোন্নতি আর নিজের ও স্ত্রীর নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আমিনুলের দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তার পরে ফাউন্ডেশনে নিয়োগ পাওয়া নতুন এমডি মুহম্মদ মউদুদ উর রশীদ সফদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উনার বেশ কিছু অনিয়মের বিষয়ে আমি জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় তদন্তও করছে। আরো কয়েকজন পরিচালকের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ মউদুদ উর রশীদ বলেন, পিডিবিএফের বোর্ড উনার বিষয়টি জানেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চেষ্টা করছি যতটা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানোন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা প্রণোদনাও দিয়েছে সরকার। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পিডিবিএফ পরিবার কৃতজ্ঞ।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...