Sunday, September 19, 2021

টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজে আলাউদ্দিন মিয়ার অরাজকতা

পরীক্ষা না হলেও ‘আনুসাঙ্গিক ফি’র নামে ৬ হাজার টাকা হারে আদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক : টঙ্গী পাইলট স্কুল এ- গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা হলেও তিনি কোন নিয়মই মানছেন না। প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ বানিয়ে নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক অভিভাবক। নিজের খেয়াল-খুশিমত ব্যবহারের উদ্দেশ্যে টঙ্গী পাইলট স্কুল এ- গার্লস কলেজ পরিচালনার জন্য গভর্ণিং বডি তৈরি না নিজের পছন্দের লোকদেরকে দিয়ে আহবায়ক কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং ইচ্ছেমত লুটপাট কওে যাচ্ছেন।
করোনা দুর্যোগের কারণে এবছর এইচ এস সি পরীক্ষা না হলেও ‘আনুসাঙ্গিক ফি’র নামে প্রত্যেক ছাত্রীর কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা হারে আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে। টঙ্গী পাইলট স্কুল এ- গার্লস কলেজ অভিভাবক ফোরামের একাধিক সদস্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কোচিং বাণিজ্য
সরকারি সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে ‘কোচিং বাধ্যতামূলক’ করে অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে ছাত্র/ছাত্রীদের কাছ থেকে। নিয়মিত ক্লাশ শেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে গণহারে প্রায় আধঘণ্টার কোচিংয়ের নামে মাসে এক হাজার টাকা করে ফি নেয়া হচ্ছে। মাসিক বেতনের সাথে অতিরিক্ত এই টাকা গুনতে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা। অভিভাবকরা জানান, প্রতিদিন নিয়মিত ক্লাশ শেষে ৫ম, ৮ম ও ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদেরকে বেলা ১২:৫০টা থেকে ১৩:১৫টা পর্যন্ত প্রায় ২৫ মিনিটের বাধ্যতামূলক কোচিং করানো হয়। অতিরিক্ত এই ক্লাশের নামে প্রভাতি শাখার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১০০০ হাজার টাকা করে এবং দিবা শাখার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হয় ৫০০শ’ টাকা করে। প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীর মাসিক কোচিং ফি বাবদ প্রায় দশ লাখ টাকার মধ্যে অধ্যক্ষ নিজে আশি ভাগ এবং বাকি ২০ ভাগ টাকা যেসব শিক্ষক কোচিং ক্লাশ নেন তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয় বলে সূত্র জানায়। এছাড়া জেএসসির নিবন্ধন, ফরম ফিলাপ, এডমিট কার্ড ইত্যাদির অজুহাতে বছরে তিন কিস্তিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিনা রশিদে মোট ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা করে আদায় করা হয়। অথচ এক্ষেত্রে সব মিলিয়ে বোর্ড নির্ধারিত ফি সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা।
গত বছরের জেএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রথম কিস্তির ৭০০ টাকা করে গত এপ্রিল মাসে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আদায় করা হয়েছে। পরবর্তী দুই কিস্তি যথাক্রমে ফরম ফিলআপ ও এডমিট কার্ড বিতরণের অজুহাতে নেয়া হয়। আর এসব টাকা আদায় করা হয় বিনা রশিদে সরাসরি শ্রেণী কক্ষ থেকে।
এমনকি জেএসসি পরীক্ষার্থীদের ব্যবহারিক পরীক্ষার নামেও প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতারণা করে ৩০০ টাকা করে আদায় করা হয়। অথচ জেএসসিতে ব্যবহারিক পরীক্ষার কোনো অস্তিত্বই নেই। প্রতিবছর পরীক্ষার পর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী যে কোন বন্ধের দিন ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিষ্ঠানে নিয়ে ৩০০ টাকা করে রেখে বলা হয় ‘আর পরীক্ষা লাগবে না’।
এদিকে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বার মাসের বেতন নেয়ার নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত আরো চার মাসের বেতন নেয়া হয়। এছাড়া মডেল টেস্ট, একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ বা ইয়ার চেঞ্জ, ব্যবহারিক পরীক্ষা, সেশন ফি, রেজিস্ট্রেশন ও ফরম ফিলআপ ইত্যাদি নানা অজুহাতে অতিরিক্তি অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
এসএসসি ও এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের প্রসংসাপত্র বাবদ বিনা রশিদে এক হাজার টাকা করে, মূল সনদপত্র ২০০ টাকা করে এবং একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট (নম্বরপত্র) ৫০০ টাকা করে নেয়া হয়। অথচ এসব খাতে কোন টাকা নেয়ারই নিয়ম নেই।
একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সেশন ফি’র নামে গুনতে হয় সাত থেকে নয় হাজার টাকা। নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রত্যেক অকৃতকার্য বিষয়ে জরিমানার নামে আদায় করা হয় পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা করে। বছরের শুরুতে প্রতি শ্রেণীতে ভর্তি ফি নেয়া হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা করে। ছেলে হোক বা মেয়েই হোক প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা করে মাসিক বেতনে প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশুনা করতে হয়। পরীক্ষার ফি নেয়া হয় পাঁচশত থেকে সাতশত টাকা করে। প্রতিষ্ঠানটিতে মাসিক বেতন ও পরীক্ষার ফি অনেক কিন্ডারগার্টেন বা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি। এছাড়া প্রতি বছরই নিবন্ধন ও ফরম ফিলাপের নামে সরকার নির্ধারিত ফি’র দুই থেকে চার গুণ বর্ধিত হারে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়ে থাকে। ইতোপূর্বে উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার পর বর্তমানে অভিনব কায়দায় আবারো অতিরিক্ত ফি নেয়া হচ্ছে। এদিকে প্রতি বছরই বিভিন্ন প্রকাশনা কোম্পানী তাদের বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অধ্যক্ষকে সেলামির নামে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে থাকে।
অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অধ্যক্ষ বই থেকেও কমিশন খান। যার ফলে অভিভাবকদেরকে বাধ্য হয়ে বেশি মূল্যে বই কিনতে হয়। কারণ, স্কুলে আগাম বখরা দেয়ায় লাইব্রেরিগুলো কমিশন বা কম মূল্যে বই বিক্রি করতে চায় না। অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, সরকার শিক্ষকদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও আমরা এর কোনো সুফল ভোগ করতে পারছি না। এমপিও বা সরকারি অংশের বেতন, শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন, সেশন ফি ইত্যাদি ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির মার্কেট তাদের একটি বড় আয়ের উৎস্য। এরপরও তারা অতিরিক্ত বেতনসহ নানা অজুহাতে অভিভাবকদের ওপর এক ধরণের জুলুম চালিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করে থাকে।

‘অনিয়ম-দুর্নীতি’র প্রতিবাদ করায় অভিভাবকদের ‘হুমকি’
টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজে ‘চলমান লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠনের দাবী করায় অভিভাবকদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ফোরামের আহবায়ক আব্দুস সাত্তার মোল্লা’।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষা পেতে অভিভাবকদের হুমকি প্রদানসহ নানামুখী অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ মাঠ দখল করে গড়ে তুলা অধ্যক্ষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পার্টনারকে দিয়ে আরেকটি কাউন্টার অভিভাবক ফোরাম গঠন করে পরিকল্পিতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাধারণ অভিভাবকদের ন্যায্য দাবী ও অনিয়ম-দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষা পেতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ ও অভিভাবকদের ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য যখন অভিভাবকরা সোচ্চার ঠিক সেই মূহুর্তে অভিযুক্তরা পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে সৌজন্য সক্ষাতের নামে প্রতিবাদকারীদেরকে পরোক্ষভাবে পুলিশী হয়রানীর হুমকি দিচ্ছে। ‘মহানগর পুলিশ কমিশনারের সাথে তাদের সৌজন্য সাক্ষাতের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছে’। অভিভাবক ফোরামের আহবায়ক আব্দুস সাত্তার মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠটি হকারদের কাছে ভাড়া দেওয়াসহ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হলেও এই খাতের কোন অর্থ স্কুল ফান্ডে জমা না দিয়ে কুক্ষিগত করা হচ্ছে। বৈশাখী মেলায় স্কুল মাঠে বিভিন্ন স্টল ভাড়া বাবদ প্রায় ১১ লাখ টাকা কুক্ষিগত করা হয়েছে। এসব টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির টয়লেটগুলোও যদি পরিষ্কার করা হতো তবুও শিক্ষার্থীদের উপকার হতো মন্তব্য করে তিনি জানান, সম্প্রতি একজন ছাত্রী টয়লেটের উৎকট দুর্গন্ধে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। প্রতিষ্ঠানের মূল ভাউন্ডারির ভেতর খেলার মাঠ হকারদের দখলে থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের খেলা-ধূলাও বিঘিœত হচ্ছে।

তদন্ত হিমাগারে
‘টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজে’র দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আশিকুল হক প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে ‘টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ’ পরিদর্শন করেন। তদন্তে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষনিকভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। পরবর্তীতে এই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি রহস্যজনক কারণে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা বোর্ডের কোন নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করে না বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি গঠন ও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের দাবীতে স্কুল প্রাঙ্গনে সমাবেশ করেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। সেখানে টঙ্গী থানা যুবলীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার মোল্লাকে আহ্বায়ক ও টঙ্গী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শাহজাহান সিরাজ সাজুকে সদস্য সচিব করে ২১ সদস্যের অভিভাবক ফোরাম গঠন করা হয়।
অভিভাবকরা জানান, বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে পূর্ণাঙ্গ কোন কমিটি ছাড়াই কথিত এডহক কমিটির নামে প্রতিষ্ঠানটিতে লুটপাট চালানো হচ্ছে। অস্বচ্ছ ও অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিনা টেন্ডারে একাডেমিক ভবন নির্মাণসহ কোটি কোটি টাকার কাজ করা হচ্ছে। অধ্যক্ষ ও কথিত এডহক কমিটির বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানের মাঠে অসংখ্য দোকানপাট বসিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বাজারে পরিণত করা হয়েছে। খেলার মাঠে আড্ডার জায়গা তৈরি করে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকার যুব সমাজকে বিপথগামী করা হচ্ছে। মাঠের উত্তর পাশে ঝুঁকিপূর্ণ একতলা ভবনের ছাদে প্ল্যান বর্হিভূতভাবে দ্বিতল মার্কেট করা হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে মোটা অংকের টাকা নিয়ে কুক্ষিগত করা হচ্ছে। মসজিদ নির্মাণের নামে অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠানের পুকুর ভরাট করা হলেও এখনো সেখানে মসজিদ নির্মাণের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং পুরনো মসজিদ সংস্কার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের মাঠ দখল করে অধ্যক্ষ ও তার ভাই যৌথ অংশিদারিত্বে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তহবিল তসরুফ করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষকই ক্লাশ নেন না। এমনকি ক্লাশ রুটিনে অনেকের নামও নেই এবং শিক্ষার্থীরাও তাদেরকে চিনেন না। তারা প্রতিষ্ঠানে না এসে মাস শেষে এক দিনেই হাজিরা খাতায় পুরো মাসের স্বাক্ষর দিয়ে বেতন ভাতা ভোগ করছেন। কলেজ শাখার ক্লাশ হয় সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। অথচ কলেজ শাখার অভিযুক্ত শিক্ষক আমজাদ হোসেন নিয়মিত বিকেলে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান। কোন ক্লাশ রুটিনেও তার নাম নেই। তিনি কলেজ শাখায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৯২ সালে। অথচ তিনি একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীর সনদ লাভ করেন ১৯৯৬ সালে। তার মত আরো অনেক শিক্ষকই কলেজ শাখায় একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ লাভ করেছেন এবং আমজাদ হোসেনসহ কয়েকজন শিক্ষক একইসাথে স্কুল ও কলেজ শাখা থেকে দ্বৈত বেতন ভোগ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পদোন্নতি প্রদান ও প্রতিষ্ঠানটিতে মারাত্মক বেতন বৈষম্যেরও অভিযোগ রয়েছে। অধ্যক্ষ নিজেই প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে মাসিক এক লাখ ১০ হাজার এবং এমপিও বা সরকারি অংশের বেতন উত্তোলন করেন ৪২ হাজার টাকা। অর্থাৎ দেড় লাখ টাকার বেশি বেতন পান অধ্যক্ষ। তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগলাভের আগে প্রতিষ্ঠানটিতে তার এক সন্তানকে সাময়িকের জন্য ভর্তি করে বিশেষ আর্শিবাদপুষ্টে পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য মনোনীত হন। প্রদর্শক জাফর আহমেদ প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে মাসে ২২ হাজার ও এমপিও থেকেও পান ২২ হাজার টাকা বা মোট ৪৪ হাজার টাকার বেতন। অথচ কলেজ শাখার একজন প্রভাষকও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে মাসে ৯ হাজার টাকাও পান না। বর্তমান অধ্যক্ষ যোগদানের পর প্রতিষ্ঠানটিতে মাদকাসক্ত, বেয়াদব, অপেশাদার ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলেও অভিভাবকরা অভিযোগ করেন। একজন শিক্ষককে ইতিমধ্যে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে (রিহাব) ভর্তি করা হয়েছিল বলেও অভিভাবকরা জানান।

দুর্নীতির পুরস্কার পদোন্নতি!
একজন শিক্ষক একই সাথে স্কুল ও কলেজ শাখার সরকারি বেতন ভোগ করলেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বরং ওই শিক্ষককে উল্টো জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে পদোন্নতিসহ আরো উচ্চতর স্কেল পাইয়ে দেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়ও ইতঃপূর্বে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয় বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট ওই শিক্ষককে নিয়ে। টঙ্গীর পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের এমন লাগামহীন দুর্নীতির ঘটনা মাউশি ও দুদক পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রাপ্ত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, টঙ্গীর পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের স্কুল শাখায় ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগলাভ করেন আলোচিত শিক্ষক আমজাদ হোসেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৩ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন। যার ইনডেক্স নম্বর ২৭৩২৩২। অপর দিকে স্কুলযুক্ত এই কলেজে তিনি ১৯৯২ সালের ২৫ অক্টোবর হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাষক হিসেবেও নিয়োগ পান। কলেজ শাখায় নিয়োগলাভের আগে তিনি স্কুল শাখার সহকারী শিক্ষকের পদ থেকে পদত্যাগ বা তার ওই নিয়োগ প্রত্যাহার করেননি। এভাবে গোপন প্রক্রিয়ায় তিনি ২০০১ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায়ও এমপিওভুক্ত হন। কলেজ শিক্ষক হিসেবে তার ইনডেক্স নম্বর ৬১৮৯৭৫। এভাবে তিনি দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই দ্বৈত বেতন ভোগ করেন। একই অভিযোগ রয়েছে কলেজ শাখার গণিতের শিক্ষক রণজিৎকুমার সাহার বিরুদ্ধেও। স্কুল শাখায় তার ইনডেক্স নম্বর ২৮১০৯৯ ও কলেজ শাখায় ৬১৬৬৪১। আমজাদ হোসেনের মতোই গোপন প্রক্রিয়ায় রণজিৎকুমার সাহা ২০০০ সালের জুনে কলেজ শাখায় নিয়োগলাভ করে দ্বৈত বেতন ভোগ করেন। আমজাদ হোসেন ও রণজিৎকুমার সাহা একই সাথে অর্থাৎ ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ স্কুল শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থেকে ১৯৯২ সালের ২৫ অক্টোবর কলেজ শাখায়ও নিয়োগলাভ করেন। আমজাদ হোসেন ২০০১ সালের জানুয়ারিতে ও রণজিৎ ২০০০ সালের জুনে কলেজে এমপিওভুক্ত হন এবং তারা উভয়েই দুটি শাখাভুক্ত উভয় প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত বেতন ভোগ করেন। কিন্তু এ পর্যন্ত তাদের এই দুর্নীতির কোনো বিচার হয়নি। ইতোমধ্যে আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কলেজ শাখার একজন ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে ছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমজাদ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। স্কুলের শিক্ষক ও স্থানীয়দের ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য, ভাগ্যধনের এমনই কপাল এক প্রতিষ্ঠানে দুই পদের সরকারি বেতন ভোগের ভাগ্যবান ব্যক্তি।
প্রাপ্ত ডকুমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আমজাদ হোসেনের টাইম স্কেল ২২ হাজার টাকা থেকে ২৯ হাজার টাকায় উন্নীত করেছেন। টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজ গভর্নিং বডির বিগত ২০১০ সালের ১৯ জুন অনুষ্ঠিত পঞ্চম অধিবেশনে কলেজ শাখার ছয়জন প্রভাষক-প্রভাষিকা ও স্কুল শাখার তিনজন শিক্ষকের উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্তির সুপারিশ করা হয়। একই রেজুলেশনে আলোচিত বিতর্কিত শিক্ষক আমজাদ হোসেনকে বিধি মোতাবেক সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্যও সুপারিশ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বিধি মোতাবেক (কোটা না থাকায়) ওই পদে আর পদোন্নতি পাননি। পদোন্নতির আশায় থেকে উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্তির সুযোগটিও তার হাতছাড়া হয়। এ অবস্থায় তিনি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে ম্যানেজ করে উল্লিখিত পঞ্চম অধিবেশনের রেজুলেশনে উচ্চতর স্কেলের সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নামের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করান। কমিটির ওই রেজুলেশনে উচ্চতর স্কেলের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত কলেজ শাখার ছয়জন ও স্কুল শাখার তিনজন মোট ৯ জন শিক্ষকের নামের তালিকায় ২০১৮ সালে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ১০ নম্বর ক্রমিকে আমজাদ হোসেনের নাম লিখে দেয়া হয় যা ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সাথে অধ্যক্ষের প্রতারণার সামিল। ম্যানেজিং কমিটির ২০১০ সালের ওই রেজুলেশনে ২০১৮ সালে জালিয়াতির আশ্রয়ে পরিবর্তন এনে আমজাদ হোসেনের টাইম স্কেল ২২ হাজার টাকা থেকে ২৯ হাজার টাকায় উন্নীত করার ঘটনায় অন্য শিক্ষকদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ বিধি ভঙ্গ করে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তঞ্চকতাপূর্ণ ওই রেজুলেশন দিয়েই আমজাদ হোসেনকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। অথচ তার আগে এমপিওপ্রাপ্ত শিক্ষকরা এখনো পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। বিধি অনুযায়ী এমপিওতে যিনি সিনিয়র তাকেই সিনিয়র পদের স্কেলে যাওয়ার প্রস্তাব করার নিয়ম থাকলেও আমজাদ হোসেনের ক্ষেত্রে তা পালন করা হয়নি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত শুরু
অভিভাবক ফোরামের আহবায়ক বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সাত্তার মোল্লা সম্প্রতি ‘পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কমিটি গঠন ও অধ্যক্ষের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকা-এর চেয়ারম্যান বরাবরে একটি আবেদন করেছেন। কলেজ পরিদর্শক ড. হারুন অর রশিদকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. হারুণ অর রশিদ। এসব বিষয়ে অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন মিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ‘সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন।’

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...