Wednesday, December 1, 2021

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ


মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ। এতদিন স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও অতীতের রেকর্ড ভেঙে এখন দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে দেশ। চাষের মাছে বরাবরের মতো পঞ্চম স্থানে থাকলেও জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের ফলে উন্মুক্ত জলাশয় ও পতিত পুকুরে বেড়েছে মাছের চাষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছের অভয়াশ্রম তৈরি, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ শিকার বন্ধ ও জলাশয়াদিতে মাছ অবমুক্তকরণে এ সফলতা এসেছে। এ ছাড়া প্রদর্শনী আর প্রশিক্ষণ, ইনসেনটিভ দেওয়ার ফলে বেকারত্বের সংখ্যা যেমন কমে এসেছে, তেমনি পতিত পুকুর সংখ্যাও এখন শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২০’ এর মতে, ২০১৯ সালে বিশ্বে প্রায় ১৮ কোটি টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। এসব মাছের অর্ধেকেরও বেশি অভ্যন্তরীণ উৎসের বা স্বাদু পানির মাছ। আর বাকি মাছ সামুদ্রিক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। আর প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও ভারত। চাষের মাছে বাংলাদেশের অবস্থানটি পঞ্চম।
চাষের মাছে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম। এর আগে ২০১৭ সালে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ পঞ্চম থেকে তৃতীয় স্থানে উঠেছিল। আর সামগ্রিকভাবে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন বাড়ার হারেও বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় অবস্থানে। বর্তমানে মাছ বাড়ার হার ৯ শতাংশ। আর ১২ শতাংশ নিয়ে প্রথম অবস্থান দখল ইন্দোনেশিয়ার। প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে মাছ চাষের হার বেড়েছে ৫২৭ শতাংশ আর মাছ খাওয়ার হার বেড়েছে ১২২ শতাংশ।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশ বিশ্বে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয় ছিল। অতীতের রেকর্ড ভেঙে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে। এ সফলতা আসার বেশকিছু কারণ রয়েছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে চলমান প্রকল্প, প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, ইনসেনটিভ দেওয়াই মূল কারণ। এ ছাড়া মুক্ত জলাশয়, হাওড়, বিলে মাছের পোনা অবমুক্ত করা তো আছেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মা ইলিশ রক্ষা, মুক্ত জলাশয়ে মাছ অবমুক্ত করা আর মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করাতে বড় সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে চলমান প্রকল্প হাতে নেওয়ায় আগামীতে আরও ভালো অবস্থানে আসবে দেশ।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তরা বলেন, এখন মাছ চাষ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আমাদের গবেষণায় বিলুপ্ত মাছ- টেংরা, পাবদা, গুলশা চাষে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছি। এতে এক দিকে বেকারত্ব কমছে, অন্যদিকে বেড়েছে মাছ উৎপাদন।
বৈশ্বিক করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় দেশে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বর্তমান সরকারের মূল নির্দেশনা হলো ‘দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি পতিত না রেখে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে হবে’। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে মৎস্য অধিদফতরাধীন চলমান ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক’ প্রকল্পটি অক্টোবর, ২০১৫-জুন, ২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সারাদেশের ৬১টি জেলার ৩৪৯টি উপজেলায় প্রায় ২,৬০০.০ হেক্টর আয়তনের পতিত বা অব্যবহৃত ভরাট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন শ্রেণির জলাশয় (পুকুর/দিঘি/মরানদী/বরোপিট/বিল/হাওড় ইত্যাদি) পুনঃখননের মাধ্যমে মৎস্যচাষ উপযোগী সংস্কার করে স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষের আওতায় আনা।
বিবেচ্য প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দুটি, তা হলো ১. বছরে মোট ১০,২৩৪.০০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন (প্রায় ৪.০ মেট্রিকটন/হেক্টর/বছর) এবং ২. মোট ১৮,২০০ জন প্রান্তিক মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি (৭-১০ জন/হেক্টর)।
এছাড়াও সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিতকরন, সরকারি খাস জলাশয়ে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ, ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণসহ অনেক লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রকল্পটি গৃহীত। উন্নয়নকৃত জলাশয়ের পাড়/ডাইকগুলোতে শাক-সবজি, নেপিয়ার ঘাস ও ফলদবৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিগত জুন/২০২০ পর্যন্ত প্রায় ১,৩০০ হেক্টর জলাশয় পুনঃখনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং সংস্কারকৃত উক্ত জলাশয় হতে বর্তমানে বাৎসরিক প্রায় ৬,৫০০.০ মেট্রিকটন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনসহ (৫.০ মেট্রিকটন/হেক্টর/বছর) এবং প্রায় ৯,১০০ জন প্রান্তিক মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে (৭ জন/হেক্টর)। এছাড়াও পরোক্ষভাবে আরো দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ মানুষ আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই চলমান জলাশয় সংস্কার প্রকল্পটি করোনার প্রভাব মোকাবেলায় প্রধান লক্ষ্য পূরণে দেশে অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন এবং গ্রামীণ পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক প্রভাব ফেলেছে। এ কারণে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার গুরুত্ব অনুধাবন করে করোনা মহামারি মোকাবেলার অংশ হিসাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় এবং মৎস্য অধিদফতরের নিবিড় তত্ত্বাবধানে জলাশয় সংস্কার প্রকল্পের অর্থায়নে বর্তমান ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রায় ১,১০০.০ হেক্টর জলাশয় পুনঃখনন করে গঠিত সুফলভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মাধ্যমে মৎস্য চাষের আওতায় আনার কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে (কর্মসংস্থান সৃষ্টি- প্রতি হেক্টরে ৭-১০ জন ও অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন- ৪ মেট্রিকটন/হেক্টর/বছর) ইতিমধ্যে নির্বাচিত ভরাট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন শ্রেণির পতিত জলাশয় পুনঃখনন কাজ মাঠ পর্যায়ে প্রায় সমাপ্ত অবস্থায় আছে। দেশের ভয়াবহ করোনা মহামারিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে এ ব্যাপক জলাশয় পুনঃখনন কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন সংশ্লিষ্ট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, সিনিয়র উপজেলা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী, জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীগণ।
পুনঃখনন কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করণে নিবিড় মনিটরিং কাজে নিয়োজিত আছেন ৮ বিভাগের সুযোগ্য উপপরিচালক মহোদয়গণ। এছাড়াও কেন্দ্রীয়ভাবে মৎস্য অধিদফতর এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিম চলমান পুনঃখনন কার্যক্রম পরিদর্শন করছেন। সর্বপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্দেশিত প্রতিটি পুনঃখনন কাজের স্বাক্ষী সংরক্ষণ, অনুমোদিত চূড়ান্ত পরিমাপ কমিটি কর্তৃক সম্পাদিত কাজের হিসাব নিরুপন এবং গঠিত সুফলভোগী গ্রুপের নিকট পুনঃখননকৃত জলায়শটি মাছ চাষের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর কার্যক্রম জলাশয় পুনঃখনন কাজ শতভাগ স্বার্থকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021