Wednesday, December 1, 2021

ছোট গল্প : নদীর টানে



রাজা সিরাজ
নসুর ২৫তম বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান। জমকালো আয়োজন। গুলশানের একটি অভিজাত চায়নীজ রেষ্টুরেন্ট ভাড়া নিয়েছে নসু। উচ্চস্বরে বাজছে হিন্দি গান। বাজনার তালে তালে বুক দুলিয়ে নাচছে একদল উগ্র-আধুনিক পোশাক পরা তরুণী। কেউ কেউ তাদের সাথে নাচতে শুরু করেছে মাতালের মত। রাত গভীর না হলেও পার্টি চলে গেছে অনেক গভীরে। অতিথিরা এখনো আসছেন। যারা কোনদিন এধরণের পার্টিতে যায়নি তারাও হেলেদুলে চলছে বাজনার তালে। এক কোনায় বসে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে গানের সাথে ঠোট মেলাচ্ছিল জামান আর সজীব। সজীবও নসুর স্কুল জীবনের বন্ধু। তবে জামানের মত ঘনিষ্ট ছিল না। একটি বেসরকারি অফিসের বড় কর্মকর্তা সজীব।
অসংখ্য নারী-পুরুষের মাঝ থেকে নসুর চোখ গেল জামানের দিকে। টলতে টলতে জামানের কাছে এসে বলল- তোমরা নিরবে বসে আছ কেন? চল নাচ-গান করি।
-হ্যা, যাবো, আরেকটু চার্জ হয়ে নেই।’ বলল জামান।
-ঠিক আছে দোস্ত, তোমাদের যা খুশি। আর শোন, সব ব্যবস্থাই কিন্তু আছে,্ আমি কোনকিছুর কমতি রাখি নাই। ঐযে সাজগোছ করে কয়েকটা মেয়ে ঘুরছে, তাদেরকে এনেছি তোমাদের আনন্দ দেবার জন্য। যাকে পছন্দ হয় ওয়েটারকে বলবে, ওরা জায়গামত নিয়ে যাবে। ঠিক আছে দোস্ত’ বলে জামানের কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
-এটা একটু বেশি হয়ে গেল না নসু ভাই? বলল সজীব। নসু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল-‘না না, বেশি হবে কেন? যার দরকার সেই নিবে।
-কিন্তু বন্ধুদের স্ত্রীরা যদি টের পেয়ে যায় তাহলেতো ঝামেলা হয়ে যাবে।’ বলল জামান।
-ঝামেলা হবে কেন? যাদের স্ত্রীরা কাছে নেই শুধু তাদের জন্যই এ ব্যবস্থা। অন্যেরা টের পাবে কেন? সারারাত থাকতে হবে কিন্তু, ঘুমানোর ব্যবস্থাও আছে। আমি অতিথিদের রিসিভ করতে যাই, তোমরা চালিয়ে যাও।
নসু চলে যাবার পর উগ্র আধুনিক পোশাক পরা এক তরুণী এল জামানদের টেবিলের সামনে। ঠোট বাঁকা করে বলল
-হাই! আমার নাম নদী, বসতে পারি?’ জামান ইশারায় বসতে বলার পর তরুণী জামানের পাশের চেয়ারে বসে একটা গ্লাস নিয়ে তাতে একটা বিয়ার ঢেলে বলল-‘আসুন চিয়ার্স করি।’ জামান নিজের গ্লাসটা হাতে নিয়ে তরুণীর গ্লাসে একটা টোকা দিয়ে বলল- ‘চিয়ার্স’। সজীবকে বসে থাকতে দেখে তরুণী বলল-‘কি ব্যাপার! আপনার কি মন খারাপ?’ জবাবে সজীব বলল-‘না তা নয়, কিছু ভাল লাগছে না।
-চলুন আমার সাথে, মন ভাল করে দেব।
-সরি, আমার প্রয়োজন নেই।’ বিরক্তি সহকারে বলল সজীব। এবার গ্লাসে চুমুক দিয়ে জামানের দিকে তাকাল নদী
-আপনার কি অবস্থা? আপনিও কি অক্ষম!
-না, অক্ষম আমরা কেউ-ই নই। তবে এই পরিবেশে এই কাজটির জন্য প্রস্তুত নই। আমরা আনন্দ করতে এসেছি ঠিক, তবে তা কেবল মনের আনন্দ। ছোট থেকে বড় হলে মানুষ যে খেই হারিয়ে ফেলে সেটা আরেকবার দেখলাম।
-সত্যিই ভাইয়া, বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আমাদের ডাকা ঠিক হয়নি। আমার কাছে পার্টিটা একদম নিরামিষ মনে হচ্ছে। কেউ কাছে ডাকে না।
-তোমার সমস্যা কি? তোমার টাকা ত তুমি পাবেই।
-টাকাই তো সব নয় ভাইয়া, মনের তৃপ্তি বলেও একটা কথা আছে। যে কাজে এলাম সে কাজটা না করে টাকা নিতেও সংকোচ লাগে।’ একটা কলগার্লের সংকোচবোধ দেখে অবাক হলো জামান।
-তোমার সাথে আরেকদিন কথা বলব, তোমার মোবাইল ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও।
-শুধুই কথা বলবেন?
-হ্যা
-আমার তো পুষাবে না, লস হবে।
-টাকা দিয়ে পুষিয়ে দেব।
-আবার টাকার লোভ দেখাচ্ছেন!
-তো আর কি চাও তুমি?
-সেটা আপনি বুঝবেন না, আপনার ভিজিটিং কার্ড দিন, আমিই যোগাযোগ করবো আপনার সাথে।’ জামান নিজের মানিব্যাগ থেকে ভিজিটিং কার্ড বের করে দিল। কার্ডটা হাতে নিয়ে হন হন করে চলে গেল নদী।
রাত যতই গভীর হচ্ছে পার্টি ততই উত্তাল হচ্ছে। অনেক দম্পতি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আগেই কেটে পড়েছে, যারা এসব পার্টিতে অভ্যস্ত নয় চলে গেছে তারাও। রয়ে গেছে কেবল যারা নারীসঙ্গী ছাড়া এসেছে। নদী একটি উঠতি বয়সের ছেলের কাধ ধরে নাচছে আর জামানের দিকে তাকাচ্ছে যেন হিংসায় ফেটে পড়ে জামান। জামান তখনও আগের টেবিলটাতে বসেই ধীরে ধীরে পান করে যাচ্ছে।
আসল নাম নুরুল ইসলাম। সবাই নসু নামেই ডাকে। অঢেল টাকার মালিক হবার পর নসু নিজের নামটা আধুনিক করে ‘নাসা’ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউ-ই নাসা নামে ডাকে না। রিবক্ত হয় নসু কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা। দুবাইয়ের বড় ব্যবসায়ী নসু জামানের ছোটবেলার বন্ধু। স্কুল জীবনটা একসাথেই কেটেছে দু‘জনের। জামান ছিল ক্লাসের সেকেন্ড বয় আর নসু লাস্ট। নসুর বাবার আর্থিক অবস্থা ভাল না থাকায় নানার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতো। তার লক্ষ্য ছিল অনেক বড়। যেভাবেই হোক অনেক টাকার মালিক হতে চেয়েছে নসু। তার টার্গেট অনেক বড়। চলাফেরাও বাছাই করা লোকদের সাথে। এসএসসি ফেল করার পর দুবাই চলে যায় নসু। সেখানে বাংলাদেশি এক ব্যবসায়ীর একমাত্র কন্যাকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করে ফেলে। ব্যবসায়ী নসুকে জেলে ঢুকালেও মেয়ের কান্নাকাটিতে গলে যায় তার মন। জামাই হিসেবে মেনে নেয় নসুকে। এরপর আর তাকে পিছনে তাকাতে হয়নি। শ্বশুর ইহলোক ত্যাগ করেছেন। এখন সবকিছুর মালিক নসু। বছরের বেশির ভাগ সময় দুবাইতেই থাকে। বছরে দুইবার বেড়াতে আসে। গ্রামের বাড়িতে দুতলা বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে মা-বাবা ও ভাইবোনদের জন্য। জমিও কিনেছে অনেক। ঢাকার গুলশানে আলীশান বাড়ি বানিয়েছে। সারাবছর কেবল দারোয়ান থাকে বাড়িতে। নসু আর তার স্ত্রী দেশে এলে সরগরম হয় বাড়িটা। গাড়ি আছে ২টা। নসু চড়ে লেক্সাস-এ আর স্ত্রী চলে প্রিমিও-তে। সবসময় ডিউটি না করলেও দুই ড্রাইভারকে সারা বছরের বেতন দেয় নসু। এবার তার ২৫তম বিবাহবার্ষিকী বেশ ঘটা করে পালন করছে নসু। স্কুল জীবনের বন্ধু থেকে শুরু করে সকল বন্ধুদেরকে দাওয়াত করেছে সে। তবে গ্রাম থেকে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন যারা এসেছেন তাদের জন্য ব্যবস্থা হয়েছে গুলশানের বাড়িতে। সেখানে শুধু নাচ-গান আর বাহারী খাবারের আয়োজন। কয়েকজন পরিচিত কন্ঠশিল্পীকে ভাড়া করা হয়েছে সারারাত গান করার জন্য। আর চায়নিজে দাওয়াত করা হয়েছে হাই সোসাইটির বন্ধুদেরকে। সস্ত্রীক এলে খুশি হব’ কথাটি লেখা রয়েছে দাওয়াতপত্রে। সব আয়োজনই আছে এখানে। হুইস্কি, ব্রান্ডি, জীন, ভদকা, টাকিলা, বিয়ার-যার যা পছন্দ। যারা হার্ড ড্রিংক-এ অভ্যস্ত নয় তাদের জন্য রয়েছে হাল্কা পানীয়। নাচ-গান হৈচৈ চলবে সারারাত। নামী-দামী সংগীত শিল্পীদের সাথে একদল নাচের (ক্লাব ড্যান্সার) মেয়েকেও আনা হয়েছে অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য।
॥ দুই ॥
রাত গভীর হয়েছে, সাথে সাথে পার্টিও বেশ জমে ওঠেছে। নসু মাতাল হয়ে নেচে-গেয়ে গরম করে তুলেছে পার্টিটা। মাঝেমধ্যেই স্ত্রী জেরিনাকে মাথায় তুলে নাচছে। নসু নিজের শরীরের ব্লেজার ও শার্ট খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। পড়নে আছে কেবল প্যান্ট আর একটা সেন্ডু গেঞ্জি। সবাই যখন উদ্দাম নৃত্যে মশগুল তখনই দৌড়ে এলো ম্যানেজার। হাফাতে হাফাতে বলল-‘স্যার, থামেন পুরো হোটেল পুলিশ ঘিরে ফেলেছে।’ এবার ক্ষেপে গেল নসু- ‘ঘিরে ফেলেছেতো কি হয়েছে? আমি কি পুলিশরে ডরাই? এরকম অনেক পুলিশ আমার বাসায় পাহাড়ায় থাকে। আমি এখন লেংটা হয়ে নাচবো দেখি কেডা কি করে!’ বলেই পেন্টটা খুলে ছুরে ফেলে দিল। এসময় কয়েকজন সাদা পোশাকধারী লোক নসুকে ঝাপটে ধরে বলল- ‘আর খুইলেন না ভাই, এবার চলেন আমাদের সাথে।’ নসু চিৎকার করতে লাগল-‘আপনারা চিনেন আমাকে! আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমার বন্ধু, আমরা একসাথে মদ খাই, দুবাইয়ের বাদশা আমার সাথে মদ খায়। মধ্যপ্রাচ্যের সব রাজা-বাদশা এবং যুবরাজরা আমার রিসোর্টে আসে এনজয় করার জন্য। আমি বিদেশ থেকে নামী-দামী নায়িকা-গায়িকা মডেল এনে তাদেরকে উপহার দেই। তারা আমার বন্ধু। আমার সাথে বেয়াদবি করলে আমি বাংলাদেশের সব বিদেশি সাহায্য বন্ধ করে দিতে বলব। বাংলাদেশের অনেক মেয়েকে আমি দুবাই নিয়ে বড়লোক বানিয়ে দিয়েছি। আমার রিসোর্টে এক‘শ’র বেশি মেয়ে আছে বিভিন্ন দেশের। বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রী আমার প্রমোদখানায় বেড়াতে যায়।’ নসু চিল্লাতে থাকল আর কয়েকজন পুলিশ নসুকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেল। নসুর চেঁচামেচিতে উপস্থিত লোকজন তার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে একটা ধারণা পেল। জামান আর সজীব নিরবে বসে দেখছিল সব। ওয়াকিটকি হাতে একজন পুলিশ অফিসারকে জামানদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ওঠে দাড়াল জামান। অফিসার কাছে আসতেই জামান বলল -আমরাতো এসেছি বিবাহবার্ষিকীর অণুষ্ঠানে, এরকম অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।’ অফিসার জামানকে থামিয়ে দিয়ে বলল-‘আমরা এসেছি নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে, এই হোটেলের মদ বিক্রি করার লাইসেন্স নেই, তাছাড়া অসামাজিক কর্মকা- চলছে বলেও অভিযোগ পেয়েছি।
-অনেক ভিআইপি অতিথি আছে, আমরা খুবই লজ্জিত।’ বলল জামান।
-অতিথিদেরকে নিয়ে আপনারা চলে যান। আমরা হোটেল কর্তৃপক্ষ আর অসামাজিক কাজে নিয়োজিতদেরকে নিয়ে যাব। আর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বন্ধুকেও নিয়ে যেতে হবে, তাকে ওয়াশ না করালে সমস্যা হতে পারে।
জামান ও সজীব অতিথিদেরকে নিয়ে নিচে নামার পর দ্রুত যার যার মত সবাই কেটে পড়ল। সজীব কখন কেটে পড়ল টেরও পেলোনা জামান। শেষ দৃশ্যটা দেখার ইচ্ছায় আড়ালে দাড়াল সে। পুলিশের পিকআপ গাড়ির ফ্লোরে পুলিশ কনষ্টেবলদের পায়ের নীচে শুইয়ে রাখা হয়েছে নসুকে। মনে হচ্ছে তার চৈতন্য নেই। স্ত্রী দাড়িয়ে আছে তার গাড়ির সামনে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মনোরঞ্জন দেবার জন্য আগত মেয়েগুলোসহ কয়েকজন হোটেল বয়কে নিচে নামিয়ে এনে বড় একটা গাড়ীতে ওঠানো হলো। নদীও আছে তাদের মধ্যে। অনেকেই ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকলেও নদী ছিল স্বাভাবিক, কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাই দেখা যায়নি নদীর চোখেমুখে। বড় অফিসার গাড়িতে বসার পর চলতে শুরু করল গাড়িগুলো।

॥ তিন ॥
রাতে ভাল ঘুম হয়নি জামানের। নেশার ঘোরে ভাল ঘুম হবার কথা, কিন্তু তা হয়নি। বার বার কানে বাজছিল নসুর কথাগলো ‘মধ্যপ্রাচ্যের সব রাজা-বাদশা এবং যুবরাজরা আমার রিসোর্টে আসে এনজয় করার জন্য। আমি বিদেশ থেকে নামী-দামী নায়িকা-গায়িকা, মডেল এনে তাদেরকে উপহার দেই, বাংলাদেশের অনেক মেয়েকে আমি দুবাই নিয়ে বড়লোক বানিয়ে দিয়েছি। আমার রিসোর্টে এক‘শ’র বেশি মেয়ে আছে বিভিন্ন দেশের। বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রী আমার প্রমোদখানায় বেড়াতে যায়।’ জামান জানতো ‘নসু বিদেশি নামী-দামী কোম্পানীতে মালামাল সাপ্লাই করে। কিন্তু সেই মালামাল যে ‘নারীপণ্য’ সেটা ভাবেনি কখনো। তারমানে সে নারী পাচার কাজেও জড়িত! নাহ, ওর সাথে আর সম্পর্ক রাখা যাবে না। ভাগ্য ভাল লাবণ্য ঢাকায় ছিল না। তার সামনে এরকম ঘটনা ঘটলে মাথাটা হেট হয়ে যেতো। সে হয়তো মনে করেছে এখনো ঘুমুচ্ছে জামান, তাই ফোন করে খোঁজ নেয়নি। রাতে পার্টিতে গেলে একটু বেশিই গিলে ফেলে সে, বাসায় অবশ্য তিন পেগের বেশি নিতে দেয়না লাবণ্য। গতরাতে পার্টি থেকে বাসায় এসেও আরো দুই পেগ নিয়েছে। মাথাটা অনেক ভার হয়ে আছে। একটা ব্ল্যাক কফি খেলে মন্দ হয়না। কফির গ্লাসে চুমুক দিতেই বেজে ওঠল ফোনটা। নসুর নামটা দেখেই বিরক্তি ভরে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু ফোনটা বেজেই চলেছে। অবশেষে শেষ পরিণতিটা জানার আগ্রহে রিসিভ করল ফোনটা। ‘হ্যালো, কি খবর?
-সরি দোস্ত, আমি ভেরি সরি, বুঝতে পারিনি বিষয়টা। তোমাদের দেশটা যে এখনো সেই আগের মতোই আছে সেটা বুঝতে পারিনি। শেরাটন, র‌্যাডিসন অথবা সোনারগাঁওয়ে আয়োজনটা করলেই পারতাম, তাহলে আর এই বেইজ্জতিটা হতে হতো না।

  • সে কথা বাদ, কেমনে কি হলো তাই বল।
  • কেমনে আবার কি! টাকা দিয়েছি, সব শেষ। আমি নেশাগ্রস্ত না হলে ওখানে বসেই ম্যানেজ করে ফেলতাম, পার্টিটাও চলতো, আমার ইজ্জতও পাংচার হতো না।
    -যাক, যা হবার হয়ে গেছে, বাদ দাও।
  • না দোস্ত বাদ দেবার পাত্র আমি নই, লজ্জা নিয়ে আমি আর দুবাই যাবো না।
    -কি করবে তাহলে?
    -আগামী সপ্তায় র‌্যাডিসনে পার্টি দেব।
    -এবার কি পার্টি দেবে?
  • কেন, জন্মদিনের।
    -কার জন্মদিন?
    -কেন, আমার অথবা তোমার ভাবীর, কেউই তো আর তারিখ মুখস্থ করে রাখেনি! তাহলে কথা ফাইনাল।
    নসুর সাথে কথা বলার সময়েই একটা অপরিচিত নাম্বার বার বার পুত পুত করছিল, নসুর কলটা রেখে কল ব্যাক করল জামান।
    -হ্যালো, কে বলছেন?
    -বলুনতো কে আমি?’ মেয়েলি কণ্ঠ। জামানের বুঝতে বাকী রইল না। বলল
  • তুমি না পুলিশের গাড়িতে ছিলে?
    -তাতে কি? পুলিশ কি মানুষ না? তাদের কি টাকার দরকার নেই?
    -বুঝলাম না।
    -বুঝবেন কিভাবে? আপনি এ যুগের মানুষ হলেও এ যুগের অনেক কিছুই আপনি জানেন না।
    -মানে !
    -মানে হচ্ছে- এ যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে টাকা আর নারী। আর নারীটা যদি আমার মত সুন্দরী হয় তাহলেতো কথাই নেই!
    -সেতো বুঝলাম। কিন্তু কেমনে কি হলো, একটু বল শুনি।
    -এটাতো একদম সাধারণ ব্যাপার। গাড়িটা একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে থামল। শুরু হলো দরাদরি। অবশেষে নসুর স্ত্রী টাকার বা-িল বের করে দিলেন গাড়ি থেকে। আমি রাজুকে ফোন করেছিলাম। রাজু এসে আমাকে নিয়ে গেল।
    -রাজু কে? সে অনুষ্ঠানে ছিলনা কেন?
    -রাজু আমার ঐ, খুব ভালবাসে আমাকে। ওর আরেকটা পার্টি ছিল। ও থাকলে আমাকে গাড়িতে তুলতেই পারত না।
    -ঐ মানে কি?
    -ঐ মানে কি তাও বুজেন না! কি পুরুষ আপনি?
    -সে তোমার সবকিছু জেনেও..?
    -সে কথা আরেকদিন বলব, এখন বলুন কি করছেন?
  • বসে আছি।
    -ভাবি কোথায়?
    -বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেছে।
    -তাহলে তো ভালই হলো, আসুন না গল্প করি।
  • কোথায় আসবো?
    -আমার বাসায় আসতে পারেন।
    -বাসায় নিয়ে সাইজ করবে না তো?
    -সোসাইটি গার্ল হলেও এতোটা খারাপ নই, আমিতো বলেছি টাকাই আমার জীবনের সব না। তাই যদি হতো রাজু আমাকে ভালবাসতো না।
    -আজ নয়, আরেকদিন আসবো, আজ অনেক কাজ পড়ে আছে।
    -কবে আসবেন?
    -আমি তো তোমার চাহিদা পূরণ করতে পারবো না, তোমার লস হবে না?
    -চাহিদা পূরণ দরকার নেই, শুধু গল্প করবো, কবে আসবেন?
    -আগেই ফোন করবো।
    -ওকে, অপেক্ষায় থাকবো। বাই বাই।’

॥ চার ॥

নদীর দেয়া ঠিকানায় সহজেই পৌঁছে গেল জামান। চামেলী বাগে এক সময় নিয়মিত যাতায়ত ছিল জামানের। বাংলা সিনেমার নায়িকা সোনিয়াও এক সময় এখানে ভাড়া থাকতো। এখন স্বামীর সাথে লন্ডনে থাকে। পেশাগত কারণে মাঝে-মধ্যেই যেতে হতো শান্তিনগরে। অনেকদিন পর আবার শান্তিনগরে-নদীর টানে। কয়েকদিন অনবরত কথা বলতে বলতে নদীর প্রতি একটা সফ্ট কর্ণার তৈরি হয়ে গেছে জামানের। তবে এই টানের অর্থ কি জানেনা জামান। এটা কিসের টান? শরীরের না মনের তাও জানেনা সে। কোন জৈবিক তাড়নাও নেই। তাহলে কিসের টানে ছুটে এলো জামান! উত্তর জানেনা সে নিজেও। পুরণো প্রেমিকার মত নিচে দাড়িয়ে আছে নদী। জামানকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে অভ্যর্থণা জানিয়ে ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। সাজানো গোছানো তিন বেডরুমের ফ্ল্যাট। ড্রয়িং রুমেই বসলো দু’জন মুখোমুখি।
-এখানে কি ভাড়া থাক না নিজের?
-ভাড়াও থাকিনা, নিজেরও না।
-তাহলে?
-বাবার।
-বাবা কোথায়?
-বাবা নিজের রুমে আছেন, প্যারালইজ্ড। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সরকারি চাকরি করতেন। রিটায়ার করে যে টাকা পেয়েছিলেন তার সাথে গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে এটা কিনেছেন।
-ভাতা পান না?
-বাবা ভাতার জন্য কখনো এপ্লাই করেনি। বলেন ‘ভাতার জন্য যুদ্ধে যাইনি, অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে যুদ্ধে গিয়েছি, দেশ স্বাধীন করেছি এটাই বড় পাওয়া।’
-দারুন তো, তোমার বাবার জন্য নিশ্চই গর্ববোধ কর তুমি?
-হ্যা, করি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র ছিলেন, বাবা-মাকে না জানিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন দেশ স্বাধীন হবার পর। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কেরাণীর চাকরি গ্রহণ করেন।
-আর কে আছেন? একটা ছোট ভাই আছে, দশম শ্রেণীতে পড়ে। মা আছেন, তিনিও বৃদ্ধ।
-ভাইটা এখন কোথায়?
-হয়তো খেলতে গেছে, আর মা বাবার রুমে আছে।
-আমিতো মা’র কথা জিজ্ঞেস করিনি।
-একটু পরেইতো করতেন! তারপর কি জানতে চাইতেন সেটাও জানি।
-তাই! কি সেটা? বল শুনি।
-জানতে চাইতেন কেন নোংরা পথে পা বাড়ালাম।
-সত্যিই তুমি জিনিয়াস! এখন জানতে ইচ্ছে করছে কেন তুমি নিজেকে এমন নির্দয় পথে পা বাড়ালে!
-আসলে বাবা রিটায়ার করার পর যে টাকা পেতেন তাতে কষ্ট করে সংসার চালাতে হতো, কলেজে পড়ার সময় এক বান্ধবীর প্ররোচণায় এক শিল্পপতির দাওয়াতে একটা অনুষ্ঠানে গেলাম। অনেক মজা হলো, শিল্পপতি অনেক দামী উপহার দিলেন আর বললেন ‘যখনি কোনকিছুর প্রয়োজন হবে আমাকে নির্দ্বিধায় বলবে, আমি খুশি হব।’
এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই তার কাছে যেতাম, চাইবার আগেই তিনি টাকার বা-িল ধরিয়ে দিতেন। একদিন আমাকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যেতে চাইলেন, আমি না বলতে পারলাম না। এরপর তার সাথে বিভিন্ন দেশে বেড়াতে গেছি। বলা যায় আমি নিজেই নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আমি নিজেই তার কাছে চলে যেতাম। এরপর গ্র্যাজুয়েশন করার পর তিনি একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে আমাকে একটা চাকরি দিয়ে দিলেন, বললেন ‘তোমার বিয়ের সমস্ত খরচ আমি দেব, পাত্র পছন্দ করে আমাকে জানিও।’
-তার সাথে সম্পর্ক কি এখনও আছে?
-তিনি আসলে এক জিনিস বেশিদিন ব্যবহার করেন না। এখন আরেকজনকে যোগার করে নিয়েছেন। মাঝেমধ্যেই ফোন করে খোঁজখবর নেন, প্রয়োজন যেতে বলেন।
-চাকরি ছেড়ে এপথে এলে কেন?
-চাকরিটা আসলে চাকরি ছিল না, সেখানে আমাকে প্রায়ই বিভিন্ন জনের মনোরঞ্জনে যেতে হতো। একদিন পরিচয় হলো রাজুর সাথে। সে বিভিন্ন পার্টিতে মেয়ে সরবরাহ করে। নামী-দামী নায়িকা-গায়িকা-মডেল সবই আছে তার হাতে। যে যেরকম চায়। এক পার্টিতে আমাকে একা পেয়ে রাজু বলল ‘তুমি সুন্দরী-শিক্ষিত-স্মার্ট মেয়ে, এক জায়গায় বন্দি হয়ে আছ কেন? আমি বললাম ‘কি করবো তাহলে? রাজু বলল ‘তুমি যে টাকা বেতন পাও সেই টাকা এক রাতেই রোজগার করতে পার, মাসজুড়ে বিভিন্নজনের বিছানায় যাওয়ার দরকার কি? রাজুর কথায় চাকরি ছেড়ে দিলাম। এখন রাজু বিভিন্ন পার্টিতে নিয়ে যায়।
-বিয়ে করবে না?
-ও যদি করে।
-এতকিছু জানার পরও সে তোমাকে বিয়ে করবে?
-করবে, ও খুব বড় মনের মানুষ। প্রায়ই বলে ‘চল আমরা বিয়ে করে এই দেশ ছেড়ে চলে যাই, সংসারী হয়ে যাই। আমি বলি ‘মা-বাবা ভাইকে ছেড়ে কিভাবে যাব’ ছোট ভাইটা একটা চাকরি পেলে এ বিষয়ে চিন্তা করবো।
-তোমার বাবা-মা কিছু জানে?
-জানে না, তবে মাঝে মাঝে যেভাবে বাঁকা চোখে তাকায়, আমার ভয় হয়।
-কেউ কখনো বাসায় আসে।
-না, বাসায় রাজু ছাড়া আর কেউ এলাউড নয়।
-আমাকে ডাকলে যে?
-বলেছি রাজুর বড়ভাই আপনি।
-রাজু জানে?
-না, ও একটা প্লেজারট্রিপে কক্সবাজার গেছে
-তো আমাকে আসতে বলার হেতু কি?
-শুধুই গল্প করা, আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছে যে আপনি নারীকে কেবল ভোগ্যপণ্য হিসাবে দেখেন না। সুন্দরী নারী পেলেই বিছানায় নিয়ে যেতে ছটফট করেন না, আপনার সাথে গল্প করা যাবে। নারীলোভী পুরুষরাতো কেবল স্ত্রীদের বদনাম বলে বলে পরনারীর সান্নিধ্য পেতে চায়। রাজু সবসময় ব্যস্ত থাকে, গল্প করার লোক পাই না।
-তা ঠিক বলেছ। একটু আনমনা হলো জামান। নদী হয়তো তার জীবন সংগ্রামের কাহিনী বলার জন্যই জামানকে ডেকেছে। কিন্তু তাতে নদীর কি লাভ? জামানতো আর নদীকে ভালবাসবে না, বিয়েও করবে না। তাকে নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরতেও যাবে না। তাছাড়া নদীর সাথে জামানের বয়সের পার্থক্য দ্বিগুন। নসু একদিন বলেছিল ‘পরিণত বয়সের মেয়েরা সাধারণত আঙ্কেলদেরকেই বেশি পছন্দ করে আর মধ্যবয়সী নারীরা পছন্দ করে টিনএজ ছেলেদেরকে।’ এখানে কোন রসায়ন কাজ করছে নদীই বলতে পারবে।’ জামানের মধ্যচ্ছেদ ঘটিয়ে নদী বলল
-রান্না হচ্ছে, আপনি কিন্তু না খেয়ে যেতে পারবেন না!
-চল তোমার বাবাকে একটু সালাম জানাই।
একটা উঁচু বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে নদীর বাবা। হাত পায়ে কোন বোধশক্তি নেই। চোখ দু’টি দিয়ে ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে জামানের দিকে। সালাম দিল জামান। ডান হাত অবশ, তাই বাম হাত উঠিয়ে ঈশারায় বসতে বলল জামানকে। পাশেই ঘুমিয়ে আছে নদীর মা। জামান আরেকদিন আসবো বলে বিদায় নিল নদীর বাবার কাছ থেকে। কিন্তু নদী না খাইয়ে ছাড়বেই না। শেষে টোস্ট আর কফি খেয়ে বিদায় নিল নদীর কাছ থেকে।
তার ভাবনায় যুক্ত হলো নতুন আরেকটি নাম। যে তার জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছে মা-বাবার সেবায়। তবে নদী এপথে পা না বাড়িয়েও হযতো কাজটি করতে পারতো। তাকে এপথে পা বাড়াতে আমাদের সমাজব্যবস্থা যতটুকু কাজ করেছে তার চেয়েও বেশি কাজ করেছে তার লোভ, তার উচ্চাকাঙ্খা আর বিলাসী জীবন যাপনের স্বপ্ন। আসলে অন্ধকার পথে পা না বাড়িয়েও যে সুখি-সুন্দর জীবন-যাপন করা যায় সে শিক্ষাটা পায়নি নদী। মায়া হয় মেয়েটার জন্য।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021