Thursday, September 23, 2021

ঘুরে এলাম সুসং-দুর্গাপুর

রাজা সিরাজ :

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সকাল ৭টায় দাড়িয়েছিলাম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে সকাল সাড়ে ছয়টায় অন্য সহযাত্রীদের নিয়ে রওনা হয়ে আমাকে এখান থেকে ৭টায় গাড়িতে উঠিয়ে নেবার কথা। আধঘন্টা দেরিতে আমার সামনে এসে দাড়াল গাড়িটি। এবারও আবদুল বারী ভাইয়ের নেতৃত্বে রওনা হলাম সুসং দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। এবারের সঙ্গীরা হলেন- হামিদ মোহাম্মদ জসিম, সৈয়দ আজফার, রেজা কাসেম আরজু, খাজা খন্দকার, মুসফিকুর রহমান, দুলাল খান ও হাফিজ রহমানসহ আমরা ৯জন। সাড়ে ৯টায় মাওনা চৌরাস্তায় নাস্তা করে আবার রওনা হলাম মযমনসিংহগামী চার লেনের রাস্তা ধরে। ঢাকা থেকে গাজীপুর পেরুতেই সময় লাগল ২ঘন্টা অথচ দেড় ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম ময়মনসিংহে। দুর্গাপুর পৌঁছালাম বেলা ১২টায়। দুর্গাপুরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধি ধ্রুব সরকার- তার সাথে ছিলেন দুর্গাপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বাবুল আহমেদ এবং স্থানীয় একজন সাংবাদিক। প্রেস ক্লাবে চা পর্ব সেরে রওনা হলাম চীনামাটির পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। আগেই পেরিয়ে এসেছি কংস নদী। এবার পায়ে হেটে ও নৌকায় চড়ে সোমেশ^রী নদী পার হয়ে যেতে হবে কুল্লাগড়। নদীতে বিশাল চর। চর দখলের মতোই নদীটি এখন বালু লুটেরাদের দখলে। কয়েকশত বালু উত্তোলনের মেশিন বিকট শব্দে বালু উত্তোলন করছে নদী থেকে। বালুর সাথে আসছে নুড়ি পাথর। বালি থেকে পাথর আলাদা করে ট্রাকে উঠিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে। স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে-প্রতি ট্রাক বালির জন্য ইজারাদারকে দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা, সরকারী রাজস্ব ট্রাক প্রতি পাঁচ হাজার টাকা (যদিও সব টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।) প্রতিদিন এখান থেকে দেড় হাজার ট্রাক বালি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। পাঁচ হাজার টাকা হারে দেড় হাজার ট্রাক থেকে ইজারাদারের দৈনিক আয় ৭৫ লাখ টাকা, মাসিক আয় হবার কথা বাইশ কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকা। অথচ এক বছরের জন্য এটি ইজারা দেয়া হয়েছে তের কোটি টাকা। বছরে এখান থেকে আয় হবার কথা আড়াইশ’ কোটি টাকা। একইভাবে সমপরিমান রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হবার কথা। সে প্রসঙ্গ বাদ। বালির উপর দিয়ে কোয়ার্টার কিলোমিটার পায়ে হেটে যাবার পর নদী পার হতে হবে নৌকায়। পায়ে সমস্যার কারণে বালির উপর দিয়ে সবার সাথে তাল মিলিয়ে হাটতে পারছিলাম না। কিন্তু এটা কাউকে বুঝতে দেইনি। অনেকটা পেছনে পড়ে গেলাম। কষ্টের মাত্রা একটু বাড়িয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলাম খেয়াঘাটের কাছে। নৌকায় নদী পার হয়ে আবার হাটার পালা।

সোমেশ^রী নদী
ভারতের মেঘালয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সোমেশ^র নদী স্থানীয়ভাবে ‘সিমসাং’ নামে পরিচিত। মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সৃষ্টি। গারো পাহাড়ের নোকরিক থেকে উৎপত্তি হয়ে এই নদী মেঘালয়ের বাগমারা হয়ে নেত্রকোনার সুসাং-দুর্গাপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং সোমেশ^রী নামে পরিচিত হয়েছে। এই নদী নেত্রকোনার রাণীখং পাহাড়ের পাশ বেয়ে দক্ষিণ দিক বরাবর শিবগঞ্জ বাজারের কাছ দিয়ে বরাবর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। সেই পথে কুমুদগঞ্জ বাজার হয়ে ধনু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সোমেশ্বরীর মূলধারা তার উৎসস্থলে প্রায় বিলুপ্ত। বর্ষা মওসুম ছাড়া অন্যকোন মওসুমে পানি প্রবাহ থাকে না। ১৯৬২ সালের দিকে পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী বরাবর দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে নতুন গতিপথের সৃষ্টি করেছে। যা স্থানীয়ভাবে শিবগঞ্জ ঢালা নামে খ্যাত। বর্তমানে এই ধারাটি সোমেশ্বরীর মূল স্রোতধারা। এই স্রোতধারা চৈতালি হাওর হয়ে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে কংশ নদীর সঙ্গে মিলিত সুনামগঞ্জের বালিয়া নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সোমেশ্বরী নদীর শাখার মধ্যে রয়েছে, আত্রাখালি, আতরাখালী, নয়া গাঙ, গুনাই, বালিয়া, খারপাই প্রভৃতি। সিমসাং বা সোমেশ্বরী বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় ও নেত্রকোনা এলাকার অন্যতম বড় নদী হিসেবে পরিচিত। তীরবর্তী অঞ্চলসমূহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ। এটি বাংলাদেশের অন্যতম সীমান্ত নদী। সোমেশ^রীর উপনদীর মধ্যে রয়েছে, চিবক, রংদিক, রম্পা ও রিংদি।
নদীর পাড়ে শিবগঞ্জ বাজার, বাজারে আমন ধানের বিশাল স্তুপ। চাষীরা বস্তায় বস্তায় ধান নিয়ে বাজারে আসছেন বিক্রি করার জন্য। বাজার পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেই শিবগঞ্জ মোড়। সেখানের একমাত্র যানবাহন ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সা। অটোচালকদের রয়েছে সমিতি। সমিতি নির্ধারন করে দিয়েছে ভাড়া। একটি অটো সাড়ে তিন ঘন্টার জন্য ভাড়া নিলে দিতে হবে ৭০০ টাকা। অটোচালক ওই এলাকার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে সাড়ে তিন ঘন্টার মধ্যে। আলাদাভাবে অটোতে চড়তে জনপ্রতি ভাড়া ১০০টাকা। তবে যাত্রী ৮জন না হওয়া পর্যন্ত অটো চলবে না। ২টি অটো রিজার্ভ নিয়ে প্রথমেই চলে গেলাম চীনামাটির পাহাড়ে। পাহাড়ের কাছে অটো থামতেই ৮/৯ বছর বয়সী এক কিশোর দৌড়ে এসে বলল ‘আমাকে ২০টাকা দিলে সব এলাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাব।’ ছেলেটির নাম রিয়াজ, ২য় শ্রেনিতে পড়ে। রিয়াজের পিছু পিছু চললাম আমরা।

নীল পানির লেক
পুকুরের পাড়ে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘বিপজ্জনক পুকুর, পানিতে নামবেন না।’বিরিশিরির নীল পানির লেকটিকে স্থানীয়রা চিনামাটির লেক, চুনাপাথরের লেক, নীল পুকুর প্রভৃতি নামে সম্বোধন করে থাকে। শীতকালে এই লেকের নীল পানি হল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ছোট এই লেকটিকে পুকুরও বলা যায়। সাধারণত শীতকালে পুকুরের পানি কাদাটে সবুজ রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু এই লেকের পানি চিনামাটির জন্য নীল রঙ ধারন করে। চিনা মাটি খনন করার পর পুকুরের পানি নীল রঙ ধারন করে। স্থানীয়দের মতে পুকুরটির গভীরতা প্রায় ৬০ ফুট থেকে ৮০ ফুট।
চিনামাটিতে বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এই পুকুরের পানির স্বাদ তেতো। সম্ভবত প্রচুর পরিমানে কপার সালফেট থাকার কারনে এখানকার পানি নীল রঙ ধারন করেছে।
নীল এই লেকটিতে যাওয়ার পথে আশেপাশের ছবির মত দৃশ্যের পাশাপাশি সমেশ্বরী নদীর অপার সৌন্দর্যে আপনি বিমোহিত হবেন। পুরো যাত্রাপথটি এতটাই আনন্দদায়ক যে আপনার বারবার যেতে মন চাইবে। আপনি যদি একজন আত্মবিশ্বাসী সাঁতারু হয়ে থাকেন তবে লেকের পানিতে শরীরকে ঠা-া করতে সাথে করে শর্টস আনতে পারেন। তবে সাঁতার না জানলে ভুলেও লেকের পানিতে নামবেন না।
সম্ভবত এটি বাংলাদেশের একমাত্র নীল পানির চিনামাটির লেক। ময়মনসিংহে আরো একটি চিনা মাটির লেক থাকলেও সেটি এই লেকের মত এত সুন্দর নয়।

সাদা মাটির কাছে যেতেই চোখে পড়ল একটা সাইনবোর্ড ‘বিপজ্জনক পুকুর, গোসল করা নিষেধ।’ রিয়াজের কাছে জানতে চাইলাম ‘পুকুরে নামা নিষেধ কেন?’ রিয়াজ বলল ‘পুকুরে নামলে আর ওঠা যায়না, দানবে শিকল লাগিয়ে টেনে নিয়ে যায়।’
Ñ তুই কখনো কাউকে টেনে নিতে দেখেছিস?
Ñ দেখিনি, শোনেছি।
Ñ কার কাছে শোনেছিস?
Ñ মা’র কাছে।
Ñ তোর মা দেখেছে?
Ñ না, শোনেছে।
আসলে কেউ-ই দেখেনি, সবাই শুনেছে। তবে সাঁতার না জানা কেউ একবার পানিতে নেমে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে বিশেষ সতর্কতা। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে এখানের ডোবাগুলো খুব গভীর (৬০ থেকে ৮০ ফুট) এবং মাটিগুলো পিচ্ছিল তাছাড়া পাড়গুলো একেবারে খাড়া-ওঠানামার কোন ব্যবস্থা নেই। একটা মাটির টিলা পেরোতেই চোখে পড়ল আরেকটা ডোবা- ওঠানামার কোন ব্যবস্থা না থাকলেও কয়েকজন তরুন তরুণী গোসল সেরে দিব্যি কাপড় পাল্টাচ্ছে। রিয়াজকে জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরা তো গোসল করে ওঠল, ওদেরকে দানবে ধরল না কেন? কোন উত্তর দিল না রিয়াজ। চীনামাটির পাহাড় ও নীল পানির লেক ঘুরে চলে এলাম রাশিমনি স্মৃতিসৌধের কাছে। রাশিমনি স্মৃতিসৌধের কাছেই রাশিমনি বাজার। বাজারে কয়েকটি ছোটখাট খাবার হোটেল, চা দোকান ও মুদি দোকান আছে। রাস্তার পাশে বাহারী শাক-সব্জি নিয়ে বসেছে চাষীরা।
গ্রাম্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ক্ষেতে বসলাম একটা হোটেলে। ডাল ভর্তা, গুড়া মাছ ও ডাল দিয়ে আয়েশ করে সবাই খেলাম পেটপুরে, সবসময়ের তুলনায় একটু বেশিই খেলাম আমি নিজেও। সবচে আশ্চর্যের বিষয়-১০ জনের খাবার বিল হল (২লিটার মিনারেল ওয়াটারের বোতলসহ) মাত্র ৪৫০ টাকা। অথচ গতবার ধনবাড়ি ভ্রমণে দুপুরের খাবার বিল হয়েছিল ৪৯০০ টাকা। খাবার শেষে হাজংমাতা রাশিমনি স্মৃতিসৌধে ফটোসেশন।

কৃষকমাতা বীর শহীদ রাশিমণি স্মৃতিসৌধ
নেত্রকোনা জেলার উত্তর সীমান্ত সুসং-দূর্গাপুর’র খরস্রোতা পাহাড়ী নদী সোমেশ্বরী পার হলেই শহীদ রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। অবিভক্ত বাংলায় কৃষকের ভূমিকে কেন্দ্র করে প্রথাবিরোধী যে কয়েকটি আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে টংক প্রথা বিরোধী আন্দোলন তার অন্যতম। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বীর নারী কৃষক মাতা রাশিমণির অবদানের স্মরণে এই স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়েছে। কৃষকের অধিকার ও সম্ভ্রম রক্ষার প্রতীক শহীদ রাশিমণি এখানকার মানুষের কাছে মাতা হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারী তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘টংক শহীদ দিবস’ পালন করা হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। চলে সপ্তাহব্যাপী রাশিমণি মেলা এবং সমাগম ঘটে বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি কর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ।
‘টংক’কে স্থানীয় ভাবে বলা হয় টাকা-কড়ি সেলামি দেয়া । কিন্তু এই ‘টংক’ প্রথায় কৃষককে টাকা-কড়ির পরিবর্তে আবাদকৃত জমির ওপর নির্ধারিত ফসল দিতে হতো। এই নির্ধারিত ফসলের হার এতটাই বেশী ছিল যে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশই জমিদারের গোলায় চলে যেতো। প্রাকৃতিক কোন কারণে জমিতে ফসল না হলে পরের বছর অবশ্যই তা পরিশোধ করতে হতো, কোন রকম মকুব করা হতো না । ফলে কৃষককে হালের গরুসহ সম্পদ বিক্রি করে নির্ধারিত ফসল বাজার থেকে কিনে দিতে হতো অথবা জমিদার জোতদারের লাঠিয়াল বাহিনী অত্যাচার নিপীড়ণ চলিয়ে কৃষকের সম্পদ ক্রোক করে আদায় করে নিতো।
জমিদার জোতদারদের শোষণ শাসন অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয় কৃষক। তারা প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে। শুরু হয় টংক আন্দোলন। এই আন্দোলনে নারী বাহিনীর নেতৃত্ব দেন মাতা রাশিমণি। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ধাত্রী এবং ভেষজ চিকিৎসক। টংক’র বিরুদ্ধে গ্রামে গ্রামে কৃষাণ-কৃষাণীদের সংগঠিত করেন এই মহিয়সী বীর নারী। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পরে টংক আন্দোলন। জ্বলে ওঠে সুসং-দশকাহনিয়া-লাহোর পরগণা। অর্থাৎ শ্রীবর্দি থেকে ধরমপাশা পর্যন্ত সমগ্র সীমান্ত এলাকার সকল কৃষক এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরে। ব্রিটিশ সরকার, জমিদার, জোতদাররা কৃষকের আন্দোলনে দিশেহারা হয়ে নির্বিচারে গ্রামে গ্রামে দমন-পীড়ণ শুরু করে। কৃষকের ধান- প্রাণ- সম্ভ্রম লুটে নিতে আক্রমণ শুরু করে।
১৯৪৬ সাল ৩১ জানুয়রি বহেড়াতলীর পার্শবর্তী গ্রামে মাতা রাশিমণি তার একদল সহকর্মীদের সাথে নিয়ে মিটিং করছিলেন। খবর এলো যে, বহেড়াতলী গ্রামে ইস্টর্ণ ফন্টিয়ার বাহিনী ঢুকে লুট-পাট, অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে। তারা কৃষক নেতা লঙ্কেশর হাজংয়ের নব বিবাহিতা বধূ কুমুদিনী হাজংকে জোড় করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ ফন্টিয়ার বাহিনীর হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র। কৃষক বাহিনীর কাছে লাঠি, দাও, বেত, বর্শা, তীর, ধনুক। অন্যরা যখন কিভাবে মোকাবিলা করে কুমুদিনীকে রক্ষা করা যায় তার নিয়ে কৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন ঠিক তখনই মাতা রাশিমণি বললেন, ‘ময় তিমৗত, তিমৗতলা মান ময় বুজি, তুরা নীতি নিয়ৗ বুইয়ৗ থাক, ময় যা’লে অগন রক্ষা করিবৗ, ময় অগন রক্ষা কুরিব নয়তে মুরিব।’ (আমি নারী, নারীর মর্যাদা কি আমি জানি, তোমরা কৌশল নিয়ে বসে থাক, আমি গেলাম তাকে রক্ষা করতে, আমি তাকে রক্ষা করবো নয়তো মরবো। ) এই বলে মাতা রাশিমণি কুমুদিনীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলেন। পেছনে গেলেন তার নারী বাহিনী। এরপর একদল পুরুষ কৃষক বাহিনী সুরেন্দ্র হাজংয়ের নেতৃত্বে রাশিমণিকে সহযোগিতার জন্য গেলেন পেছনে পেছনে।
এবার একেবারে ফন্ট্রিয়ার বাহিনীর সামনা সামনি হলেন মাতা রাশিমণি। পুলিশের হাতে বন্দিনী কুমুদিনী বাঁচার জন্য আর্তনাদ করলেন। বাকবিতন্ডা হল। অনন্যপায় হয়ে কুমুদিনীকে রক্ষার জন্য তার হাত ধরে থাকা পুলিশের ধর দা’য়ের এককোপে আলাদা করে দিলেন। শুরু হল অসম লড়াই। পুলিশের রাইফেল গর্জে উঠল। শোষকের বুলেট ভেদ করলো মাতা রাশিমণির বুক। রক্তে রঞ্জিত হলো সাদা পাহাড়ের পথ বহেড়াতরীর পূণ্যভূমি। কৃষক মাতা রাশিমণি টংক আন্দোলনে প্রথম শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। মাতা রাশিমণিকে হত্যাকারী শোষকের বুকে বর্শার ফলা ঢুকিয়ে দিলেন সুরেন্দ্র হাজং। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বুলেট তাঁর বুক ভেদ করে গেল। সুরেন্দ্র শহীদ হলেন। কৃষক বাহিনী প্রতিশোধের নেশায় মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাল। অনেকক্ষণ লড়াই চলল। ফন্টিয়ার বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালাল।
কৃষক মাতা রাশিমণির মৃত্যুতে সারা এলাকায় শুরু হলো সশস্ত্র প্রতিরোধ। ফলে বিভিন্ন স্থানে ফ্রন্টিয়ার বাহিনীর সাথে সন্মূখ যুদ্ধে প্রাণদেন রাশিমণি বাহিনীর সহকর্মী শঙ্খমণি, তুলা রাণী, নীলমণি, পদ্মমণি, রেবতী সহ জানা অজানা শতাধিক কৃষাণ-কৃষাণী। বিখ্যাত লেখক ফয়েজ আহ্মেদ তাঁর ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ গ্রন্থে ‘বিদ্রোহী হাজংদের সংগ্রামী ঐতিহ্য ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘এলাকার কৃষকদের সঙ্গে সংগ্রামে অংশ নিতে আসেন ভূপেন ভট্টাচার্য, পুলিন বকশী, আলতাফ আলী, রবি নিয়োগী, প্রমথ গুপ্ত, জলধর সেন প্রমূখ। …ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন স্তব্ধ করতে না পেরে সরকার সংস্কারের পথ অবলম্বন করেন এবং ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে একটি সার্ভে কমিটি গঠন করলেন। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দু’বছর পর উৎপাদন ক্ষমতার নিরিখে জমিদারদের প্রাপ্য (চুক্তি) ধানের পরিমাণ অর্ধেক করা হলো। এ ছিল হাজং কৃষকদের টংক আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে বিজয়। যদিও টংকের পরিমাণ অর্ধেক হলো, উচ্ছেদ হলো না। কিন্ত এতে বিধান ছিল যে, নির্দিষ্ট ধান কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারলে কৃষক জমির স্বত্ব পাবে – জমির ওপর অধিকারের স্বীকৃতি ।’ মাতা রাশিমণির কালজয়ী গৌরবময় আত্মদান বাংলার কৃষক আন্দোলনের এক অনন্য ঐতিহ্য এবং নারী আন্দোলনের অনুপম অহংকার। তিনি ছিলেন বাংলার কৃষক মুক্তি আন্দোলনের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক ও প্রেরণা। এবং এ কারণেই নেত্রকোনা জেলার সুসং-দূর্গাপুরকে কৃষক আন্দোলনের পূণ্যভূমি বলা হয়।
রাশিমনি স্মৃতিসৌধে আসার আগেই দুর থেকে দেখা হয়েছিল ধর্মপল্লী রানীখং মিশন। সোমেশ্বরীর কূল ঘেঁষে স্থাপিত এ মিশনকে ঘিরে গড়ে উঠা এই ক্যাথলিক ধর্মপল্লীতে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি না থাকায় দুর থেকে দেখেই চলে এসেছিলাম রাশিমনি স্মৃতিসৌধে।

রাণীখং মিশন
নেত্রকোনা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ পাহাড়ি জনপদের আরেকটি আকর্ষণ রানীখং টিলা এবং এর ওপর নির্মিত শত বছরের প্রাচীন রানীখং মিশন। সোমেশ্বরীর কূল ঘেঁষে স্থাপিত এ মিশনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্যাথলিক ধর্মপল্লী। স্থানীয়ভাবে এটি ‘সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী’ নামে পরিচিত। ভারত সীমান্ত ঘেঁষে নান্দনিক কারুকার্যে নির্মিত এই ক্যাথলিক মিশন একটি দর্শনীয় স্থান। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে যান সেখানে। প্রকৃতি আর ইতিহাস সেখানে সযতেœ রয়েছে একসঙ্গে।
‘রানীখং’ নামকরণের নেপথ্যেও রয়েছে নানা ইতিহাস। এটি মূলত পাহাড়ি টিলার নাম। কথিত আছে, একসময় এই জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলটিতে ‘খংরানী’ নামে এক রাক্ষুসী ছিল। গারো আদিবাসীরা তাকে পরাস্ত করে সেখানে জনবসতি গড়েন। খংরাণীর নামানুসারেই জায়গাটির নাম রাখা হয় রানীখং। তবে এই ইতিহাসের স্বপক্ষে যুক্তি নেই। নামকরণ যেভাবে বা যে কারণেই হোক না কেন এর ‘রাণী’ শব্দটির প্রয়োগ যথার্থ ও স্বার্থক। কেননা এই অঞ্চল সত্যিই সৌন্দর্যের রানী। গারো পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য যেকোনো আগন্তুকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পরিচয় করিয়ে দেয় নতুন এক পৃথিবীর সঙ্গে।
রানীখং মিশন ও ক্যাথলিক গীর্জা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৫ সালে। যদিও এর আগে ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ময়মনসিংহ অঞ্চলে খ্রিস্টের বাণী প্রচারিত হতে থাকে। কিন্তু দুর্গাপুরে এর সূচনা হয় আরও অনেক পরে, বিশ শতকের শুরুতে। তখনও পর্যন্ত এ অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদে বসবাসরত গারো-হাজংরা তাদের নিজস্ব ধর্মরীতি বিশ্বাস করত। জানা গেছে, ১৯০৯ সালে সুসং দুর্গাপুরের টাকশালপাড়া গ্রামের পাঁচ সদস্যের একটি আদিবাসী প্রতিনিধি দল ঢাকা ধর্ম প্রদেশের ধর্মপাল বিশপ হার্থের সঙ্গে দেখা করে তাদের এলাকায় মিশনারী যাজক পাঠানোর অনুরোধ জানান। বিশপ হার্থ ১৯১০ সালে ঢাকা ত্যাগ করার সময় তাদের জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ ও গারো অঞ্চলে মিশনারী প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। এরপর ধর্মপালের দায়িত্ব নেন লিনেবর্ণ। তিনি এডলফ্ ফ্রান্সিস নামে একজন ফাদারকে দুর্গাপুরের টাকশাল পাড়ায় যীশুর বাণী ও ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠান। ১৯১১ সালের ১৯ মার্চ একদল গারো নারী-পুরুষকে বাপ্তিষ্ম প্রদানের মধ্য দিয়ে তিনি প্রচার কাজের সূচনা করেন। এরাই পৃথিবীর প্রথম ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত গারো সম্প্রদায়। প্রথম চারবছর টাকশালপাড়া থেকেই অস্থায়ীভাবে ধর্ম প্রচারের কাজ চালানো হয়। এরপর ১৯১৫ সালে সুসং এর জমিদারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে রানীখং টিলায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয় মিশন ও ক্যাথলিক গীর্জা। এটিই ‘সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী’। প্রায় আট হাজার বিশ্বাসী ভক্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ধর্মপল্লীর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, বড় গীর্জাসহ ৪০টি ছোট গীর্জা।
সমতল থেকে বেশ উঁচু রানীখং টিলা। টিলার দক্ষিণ দিকে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বার পেড়িয়ে একটু এগুলেই চোখে পড়বে ধর্মপাল বিশপ হার্থসহ পাঁচ গারো হাজং আদিবাসীর মূর্তিসংবলিত একটি নান্দনিক ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের ডানদিকে একটি ফলকে লিখে রাখা হয়েছে ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ভাস্কর্যের ঠিক পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে খ্রিস্টের মূর্তি। এখান থেকে একটু দূরের একটি কক্ষে সাধু যোসেফের মূর্তিও রয়েছে। এর বাম পাশে শত বছরের প্রাচীন ক্যাথলিক গীর্জা। পাঁচটি চূড়াসহ গীর্জাটির স্থাপত্যশৈলী অনন্য; মার্বেল পাথরের কারুকার্যশোভিত। গীর্জার সামনের পথ দিয়ে ওপরের দিকে এগুলে দেখা যাবে বিশ্রামাগার এবং মিশন পরিচালিত বিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের পৃথক হোস্টেল। সবকিছু সাজানো-গোছানো, ছিমছাম। দেখে মনে হবে-পুরো এলাকাটিই যেন সুসজ্জিত বাগান। জায়গাটি দেশি-বিদেশি নানা ফুল-ফল ও বনজ গাছে পরিপূর্ণ।
টিলার পূর্বপাশে দাঁড়িয়ে একটু নিচে তাকালেই সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলধারা বয়ে যেতে দেখা যায়। উত্তরের গারো পাহাড় থেকে ঝরনার মতো নেমে আসা এ নদীটির আদি নাম ‘সিমসাঙ্গ’। পরে সুসং রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সোমেশ্বর পাঠকের নামানুসারে এর নাম হয় ‘সোমেশ্বরী’। নদীর স্বচ্ছ জলধারার নিচ দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় সিলিকা বালিকণা। নজর কেড়ে নেয় বালিকণার নিচ থেকে আদিবাসী নারী-পুরুষদের পাহাড়ি কয়লা এবং কাঠ সংগ্রহের দৃশ্য। ওপরের নীল আকাশও খুব কাছাকাছি মনে হয় রাণীখং টিলায় দাঁড়ালে। উত্তর পাশে চোখ মেললে হাতছানি দেয় ভারত সীমান্তে অবস্থিত মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড় সারি, অরণ্য, পাহাড়ের মাঝখান থেকে উঁকি মেরে থাকা আদিবাসীদের বাড়িঘর।

চীনামাটির পাহাড় বিজয়পুর
সুসং দুর্গাপুর থেকে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে অটোরিকশায় গেলে পাওয়া যাবে সাধু যোসেফের ধর্মপল্লীর নির্দশন। রানিখং থেকে বিজয়পুর পাহাড়ে যাওয়ার পথে বহেরাতলীতে অবস্থিত রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। রাশিমণি স্মৃতিসৌধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে বিজয়পুরে আছে চীনা মাটির পাহাড়। এখান থেকে চীনা মাটি সংগ্রহের ফলে পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট পুকুরের মতো গভীর জলাধার। পাহাড়ের গায়ে স্বচ্ছ জলাধারগুলো দেখতে চমৎকার। সুসং দুর্গাপুরে রয়েছে বাদামবাড়ি, ডাহা পাড়ার, গারো পাহাড়।
দূর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়াপাড়া ও মাইজপাড়া মৌজায় বিজয়পুরের সাদা মাটি অবস্থিত। বাংলাদেশের মধ্যে প্রকৃতির সম্পদ হিসেবে সাদা মাটির অন্যতম বৃহৎ খনিজ অঞ্চল এটি। ছোট বড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমি জুড়ে প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে এই অঞ্চলে সাদামাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লক্ষ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ৩ শত বৎসরের চাহিদা পূরণ করতে পারে। চিনা মাটির প্রাচীন ইতিহাস না জানা গেলেও ১৯৫৭ সাল থেকে এ মাটি উত্তোলনের কাজ শুরু হয়। ১৯৬০ সালে সর্বপ্রথম কোহিনুর এলুমিনিয়াম ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই সাদামাটি উত্তোলনের কাজ শুরু করে। পরে ১৯৭৩ সালে বিসিআইসি সাদামাটি উত্তোলনে যোগ দেয়। বর্তমানে ৯টি কোম্পানী এই সাদামাটি উত্তোলনের কাজ করছে। প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক এই মাটি উত্তোলনের সাথে জড়িত। বিভিন্ন রংয়ের মাটি, পানি ও প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মনকে বিমোহিত করে। সাদা, গোলাপী, হলুদ, বেগুনি, খয়েরী, নিলাভ বিভিন্ন রংয়ের মাটির পাহাড় চোখকে জুড়িয়ে দেয়। সাদামাটি এলাকা জুড়ে আদিবাসীদের বসতি।
এরপর বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড় ঘুরে চলে এলাম বিরিশিরির উপজাতি কালচারাল একাডেমিতে।

উপজাতি কালচারাল একাডেমী
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিচর্যা, উন্নয়ন ও চর্চা এবং লালনের লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালে সংকৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহকুমার দুর্গাপুর থানাধীন বিরিশিরিতে এ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃহত্তর ময়মনসিংহে বসবাসরত গারো, হাজং, কোচ, বানাই, ডালু, মান্দাই এসব নৃ-গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সামাজিক প্রথা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভাস, নৃত্য-গীত, লোকাচার তথা ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেসব আকর্ষণীয়, বর্ণিল মূল্যবান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমূহ হারিয়ে যাচ্ছে। কোন কোন নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো একবারেই হারিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এ প্রতিষ্ঠানটি অত্রাঞ্চলের সেসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীয়দের বিলীয়মান সংস্কৃতি সংরক্ষণ, লালন, চর্চা ও প্রয়োজনীয় উন্নয়নসাধন সহ বৃহত্তর জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সেগুলোর বিকাশকে সাবলীল, সহজীকরণ ও সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এলক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সম্মুখে রেখেই এসব নৃ-গোষ্ঠী সমূহের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃত্য-গীত প্রভৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত চর্চা, সংশ্লিষ্ট নৃ-গোষ্ঠীদের নিজ সংস্কৃতি ভালোবাসা ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধকরণ; তাদের প্রধান উৎসবসমূহ সংরক্ষণ; প্রকাশনা, অডিও-ভিজুয়্যাল প্রভৃতির মাধ্যমে সংরক্ষণ; জাতীয় সংস্কৃতির মূল শ্রোতধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হিসেবে এর উপর গবেষণা ও উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা এসব গুত্বপূর্ণ কার্যাদি সম্পাদন করা হয়েছে।
বন্ধের দিন হওয়ায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমিটি ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি। বাইরে থেকে ফটোসেশন শেষে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ময়মনসিংহ মোড়ে সরিষা ভর্তা দিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘মেরা’ খেয়ে এসে ঢাকায় পৌঁছালাম রাত ১১টায়।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...