Thursday, September 23, 2021

গ্রন্থ আলোচনা- `স্বাধীনতার কবি’

দুলাল চৌধুরী দুলাল
সত্তর দশকের সিলেটের প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের যে ধারা প্রবাহিত হয়েছিল, সেদিনের সেই সংগ্রামী, সাহসী তরুণ, রাজপথে লড়াকু, কলম সৈনিকদের মাঝে অন্যতম হলেন ছড়াকার মিলু কাশেম।
১৯৭৩ সালে সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু নামে সাহিত্যেও ভুবনে যাত্রা শুরু হয়। গত শতকের সাতের দশকের ব্যস্ত এই শিশু সাহিত্যিকের প্রচুর ছড়া, কবিতা, কিশোর কবিতা ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সংকলনে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা পত্রিকার জনপ্রিয় ছোটদের পাতা ‘সাত ভাই চম্পার’ মাধ্যমে মিলু কাশেম নামে পরিচিতি লাভ করেন। আটের দশকের শুরুতে পাড়ি জমান বিদেশে। প্রায় একযুগ কাটিয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
মিলু কাশেম একাধারে ছড়াকার, কবি, সম্পাদক, গল্পকার এবং ভ্রমণ লেখক হিসেবে তার রহেছে আলাদা পরিচিতি। ভ্রামণিক চিত্ততার এই লেখক ভ্রমণ
করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। এসব দেশের চমৎকার সব দর্শনীয় স্থান নিয়ে লিখেছেন কবিতা ও ছড়া। সিলেটের দর্শনীয় স্থান নিয়েও আছে তার অসংখ্য সুন্দর সুন্দর লেখা। সাংবাদিক হিসেবেও তার পরিচিতি রহেছে। কাজ করেছেন বিভিন্ন জাতীয়, স্থানীয়, পত্র-পত্রিকা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ এবং বিনোদন মাধ্যমে। বাংলাদেশের ছড়াকারদের পরিচিতিমূলক প্রথম ছড়াগ্রন্থ ছড়া ও ছড়াকার এবং ছড়া বিষয়ক প্রথম সংবাদ পত্র ছড়া ‘সন্দেশ’ এর অন্যতম সম্পাদক এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম ছোটদের রঙিন কাগজ ঝিঙে ফুলের’ সম্পাদক ছিলেন ছড়াকার মিলু কাশেম।
এ পর্যন্ত এই বই ছাড়াও আরও ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলি হলো ‘দূরের দেশ কাছের দেশ'( ২০১০). ‘ সংগোপন স্বপ্নে’ (কবিতাঃ ২০১৪), ‘পদ্ম
পাতায় প্রীতির নাম’, (শিশুতোষ ছড়াকবিতা ২০১৬), ‘চলো যাই গ্রামে ফিরে’ (কাব্য ২০১৭) ‘ইউরোপ থেকে বাংলাদেশ’ (ভ্রমণ কাহিনি, ২০১৮), ‘লাল সবুজের হাসি দেশ কে ভালোবাসি'(‘ছড়াকবিতা, ২০১৯)।
মুজিব বর্ষ উপলক্ষে ছড়াকার মিলু কাশেম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘‘স্বাধীনতার কবি’’ নামে একটি শিশু, কিশোর কবিতার বই প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে। আমার জানামতে সিলেট থেকে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে ছড়াকার মিলু কাশেমই পাঠকদের উপহার দিলেন দৃষ্টি নন্দন এই বইটি, ‘স্বাধীনতার কবি’ বইটির নামকরণের মাঝেই ফুটে উঠেছে লেখকের বঙ্গবন্ধুর প্রতি হৃদয় নিংড়ানো অনুরাগ। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় যা তিনি কলমের কালির অক্ষরে মনের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে প্রকাশ করেছেন এই ছড়া, কবিতায়। এই লেখাগুলি পড়লেই পাঠক খুঁজে পাবেন একজন মননশীল ও শক্তিশালী লেখক মিলু কাশেমের পরিচয়। তার প্রতিটি ছড়া কবিতা সহজ সরল সাবলিল ভাষায় ছন্দের গাঁথুনিতে লিখেছেন যা পড়লে পাঠকের মন আনন্দে দোলে উঠবে।
অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে ৩২টি শিশু-কিশোর ছোট ছোট কবিতা দিয়ে বইটি সাজিয়েছেন সুনিপুণ হাতে। এবার বইটি থেকে কিছু কবিতার অংশ বিশেষ পাঠকদের কাছে তুলে ধরছি। বইয়ের প্রথম কবিতা,
‘শেখ মুজিবের নাম’’ কবিতায় বঙ্গবন্ধু কে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের শ্যামল প্রকৃতির মাঝে। যেমন কবি বলছেন, বাংলার শহর নদী সাগর সবুজ শ্যামল গ্রাম, মাঠ বনানী আলো বাতাসে শেখ মুজিবের নাম।
চমৎকার ছন্দে লেখা কবিতাটি পড়লে সবার ভালো লাগবে। ‘‘মুজিব তুমি মহান’’ কবিতায় দেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে সুন্দর ভাবে, যেমন – দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেলে প্রাণ, জাতির জনক তুমি যে মহান। অপূর্ব ছন্দেবন্ধে লেখাটি মনোমুগ্ধকর। যে কবিতা দিয়ে বইটির নামকরণ করা হয় ‘স্বাধীনতার কবি’ কবিতা থেকে তুলে ধরছি ‘মুজিব
হলেন জাতীর পিতা স্বাধীনতার কবি, কাব্য ছড়ায় এঁকে
যাই তাই তো তাহার ছবি। কবি এখানে বলছেন তার সমস্ত লেখায় মাঝেই বারে বারে মুজিবের ছবি লেখায় আঁকা হয়ে যায়। শেখ মুজিবুর কবিতায়, সংক্ষেপে
বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান, তার বেড়ে উঠা তুলে ধরেছেন,
যেমন – ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে,
একটি ছেলের জন্ম নিলো শেখ মুজিবুর নামে।
একটি নামই লেখা কবিতায় কবি বলছেন-রং-তুলিতে
একটা ছবি আঁকি, বুকের মাঝে যতœ করে রাখি,যায না
মোছা সেই নাম আর ছবি, অমর তিনি স্বাধীনতার কবি।
ছোট এই কবিতায় ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার
ভালোবাসার সাক্ষর।
জীবন দিয়ে মিটিয়ে গেছেন কবিতায় কবি বলছেন –
হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি বিশ্বে যাহার খ্যাতি, যার কারণে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো বাঙালি জাতি। সত্যিই তো আজ আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে আছি
তার আত্মদানে। তুমি প্রতি ঘরে কবিতায় সুন্দরভাবে
তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধু কে পাখির শিসে, নদীর কলধ্বনিতে, পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায়,আউল
বাউল ফকিরের গানে, চিত্রকলায় কবিতায়, বাংলার পথে প্রান্তরে, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষের হৃদয়ে।
জন্মদিনে স্মরণ, এই কবিতাটির রচনাকাল ১৭মার্চ
১৯৭৪ সাল। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে দৈনিক বাংলার বাণীর
শাপলা কুঁড়ির আসরে প্রকাশিত। তৎকালীন সময়ে
ছড়াকার মিলু কাশেমেই এই কবিতার মাধ্যমে সিলেটের
প্রতিনিধিত্ব করেন। কবিতাটি হলো-, জন্মদিনে আজ স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু তোমার দান, বাঁচালে জাতির প্রাণ
দুনিয়ায় বুকে কায়েম করেছো বাংলা মায়ের নাম।
এমনি আরও অনেক চমকপ্রদ সব কবিতায় ভরপুর পুরো বইটি। এই বইয়ে লেখক মিলু কাশেম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে কবিতাগুলি লিখেছেন তারজন্য মিলু কাশেমকে অভিনন্দন জানাই। এই বইয়ে নব চিন্তা চেতনায় বঙ্গবন্ধুকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। যা পড়লে নতুন করে অনেককিছু জানতে পারবেন। বইটি ইতিমধ্যেই পাঠকের মনোযোগ কেড়েছে। আশা করি বইটি পাঠক জনপ্রিয়তা পাবে।
বইটির প্রকাশক নাগরী। স্বত্ব সৈয়দা সামিরা সাহারিন প্রীতি। প্রচ্ছদ সামির বিপ্লব। অনলাইন পরিবেশক রকমারি ডটকম। মূল্য ৭০ টাকা। প্রথম প্রকাশ আগস্ট ২০২০। বইটি উৎসর্গ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...