Thursday, January 27, 2022

কলকাতায় আকস্মিক মৃত্যু এবং বাবা’র সাথের শেষ দিনগুলো

বাবা’র স্মৃতি-

-মিলু কাশেম:

গত ২২ জুলাই ছিল আমার বাবা আলহাজ সৈয়দ রাছ উদ্দিন আহমদ (রাছ মিয়া)এর ১৯ তম মৃত্যু দিবস। ২০০২ সালের এই দিনে ভারত ভ্রমণে থাকাকালে আকস্মিক হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে কলকাতা পি জি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। কলকাতায় আমি বাবা’র সফরসঙ্গি ছিলাম। আকস্মিক বাবা’র মৃত্যু এবং কলকাতায় তার সাথে কাটানো শেষ দিনগুলির স্মৃতি এবং মৃত্যু পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে আমার এই স্মৃতিকথা। সবাই আমার বাবা’র জন্য দোয়া করবেন।

আমার বাবা সৈয়দ রাছ উদ্দিন আহমদ (রাছ মিয়া)। সৈয়দ সাহেব হিসাবে যিনি সমাধিক পরিচিত ছিলেন। ১৯২৪ সালে বৃহত্তর সিলেটের জগন্নাথপুর থানার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম সৈয়দপুর “দেওয়ান বাড়ী”তে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম।তার বাবার নাম সৈয়দ ছৈদ আলী। সৈয়দপুরে জন্ম হলেও ছাত্র জীবন থেকেই তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।তরুন বয়সে সুনামগঞ্জ কোর্টে তার কর্মজীবন শুরু হলেও পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে তিনি সিলেটে চলে আসেন এবং ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন ঠিকাদার, সরবরাহকারি এবং আমদানী রপ্তানিকারক। স্বাধীনতার পর সিলেট থেকে লন্ডনে শাক সবজী ফল মুল মাছ শুটকি ইত্যাদি কাঁচামাল প্রথম যে প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করতো সেই” মেসার্স ফাইভ স্টার এন্ড কোম্পানি’র তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা পরিচালক। তাছাড়া জালালাবাদ বোল্ডার্স, মেসার্স কাশেম এন্ড কোম্পানি নামে তার প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহকারী আমদানীকারক হিসাবে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন ন্যাশনাল টি কোম্পানির সরবরাহকারি ও পরিবহন ঠিকাদার। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আমার বাবা ছিলেন একজন সৌখিন ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। শিকার ঘুরে বেড়ানো ছিলো তার সখ। প্রচুর ভ্রমণ করেছেন দেশে বিদেশে। ন্যায় পরায়ন স্পস্টবাদী শালিস ব্যক্তিত্ব হিসাবে তার সুনাম ছিলো সিলেট শহরে।
আমার বাবার তারুণ্যের কিছুটা সময় কেটেছিলো কলকাতায়। সিলেটের বিখ্যাত জাহাজি শ্রমিক নেতা আফতাব আলীর খিদির পুরের বাড়ীতে থাকতেন তিনি। সে সময় সিলেটের অনেক লোক জাহাজে চাকুরী করতেন। যার ধারাবাহিকতায় সিলেটের লোকজন লন্ডন আমেরিকায় আবাস গড়েছিলেন। তাই কলকাতা ছিলো তখনকার জাহাজিদের কেন্দ্রস্থল। আমার নানাসহ অনেক আত্মিয়-স্বজন বৃটিশ জাহাজে চাকুরী করতেন। বাবা তাদের কাছে কলকাতার গল্প শুনে তরুন বয়সে পাড়ি জমিয়েছিলেন কলকাতায়। কিছুদিন তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কলকাতার আনাচে কানাচে। সেইসব তিনি ভুলতে পারেন নি। প্রায়ই সেইসব গল্প করতেন।
নব্বই এর দশকের মাঝামাঝিতে আমি প্রবাস থেকে ফিরে কয়েকজন বন্ধুর সাথে মিলে কিছু ফ্লাইং ব্যবসা করতাম। সেই সুবাদে নিয়মিত আমার যাতায়াত ছিল কলকাতা দিল্লী । বাবার সাথে আমি মাঝে মাঝে কলকাতা দিল্লী শিলং গৌহাটি শিলচর করিমগঞ্জের গল্প করতাম।তখন তিনি নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতেন। ফিরে যেতেন তার তারুণ্যের দিনগুলোতে। আমাকে বলতেন পরেরবার আমি যাব তোর সাথে। কিন্তু নানা কারনে যাওয়া হতো না। এর মধ্যে বাবার শরীরটাও ভালো যাচ্ছিল না।তাই প্রোগাম করলাম বাবকে নিয়ে কলকাতা যাব। বেড়ানোর সাথে সাথে ডাক্তার দেখানো আর বাবার প্রিয় কলকাতা দেখা হবে। সেই উদ্দেশ্যে ২০০২ সালের ১৪ জুলাই বিমানের ফ্লাইটে আমরা কলকাতা গেলাম। আমাদের সঙ্গি হলো আম্বরখানা এলাকার আমার এক ভাতিজা সোহেল। সে আম্বরখানার লাভলী স্টোর এর মালিক মাখন ভাইয়ের ছেলে। কলকাতা আমরা বিকেলে পৌছলাম। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস বিমান বন্দর থেকে টেক্সি নিয়ে চলে গেলাম নিউ মার্কেটের এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে। উঠলাম আমার পূর্ব পরিচিত এক হোটেলে। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে হোটেলের কাছাকাছি ঘুরাঘুরি করলাম এবং একটি ভারতীয় মোবাইল সিম কিনলাম দেশে বিদেশে যোগাযোগের জন্য। রাতে বাবা লন্ডন আমেরিকায়


সিলেটে আমার ভাই বোনদের সাথে মোবাইলে দীর্ঘ সসয় কথাবার্তা বলে সময় কাটালেন। উল্লেখ্য আমার মা বেঁচে নেই। তিনি ১৯৮৮ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। পরদিন আমরা আশেপাশের এলাকায় ঘুরে কাটালাম।বাবা নিউ মার্কেট চৌরঙ্গী পার্ক স্ট্রীট জাকারিয়া স্ট্রীটসহ তার স্মৃতি বিজড়িত অনেক জায়গা আমাকে ঘুরে দেখালেন। সেদিন সন্ধ্যায় সদর স্ট্রীট এর মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে বাবা তার পূর্ব পরিচিত ৫০ বছর আগের এক বন্ধুকে খুঁজে পান। দীর্ঘ সময় তারা গল্প গুজবে কাটান। বাবা তার সেই বন্ধুকে তার শারিরীক অসুস্থতার কথা বললে তিনি কলকাতার পিয়ারলেস হসপিটালের এক ডাক্তারের নাম বলে তাকে দেখানোর পরামর্শ দেন। পরদিন সকালে বাবাকে নিয়ে আমি পিয়ারলেস হসপিটালে যাই। অনেক বড় বিশেষায়িত আধুনিক হাসপাতাল। দেখলাম অনেক বাংলাদেশী এসেছেন চিকিৎসার জন্য। তাই রেজিস্ট্রেশন কাউন্টারে বেশ ভীড়। অনেক সময় লাইনে দাড়িয়ে কাজ শেষ করে গেলাম একজন ডাক্তারের কাছে। তিনি বেশ কিছু টেস্ট দিলেন। নির্ধারিত রুমে গিয়ে টেস্ট করালাম। রিপোর্ট পরের দিন মিলবে। তাই হোটেল ফিরে আসলাম।
রাতে ট্রেজার আইল্যান্ড মার্কেটসহ আশে পাশের স্ট্রীট মার্কেটে ঘুরলাম বাবাকে নিয়ে। পরদিন সকালে আবার গেলাম পিয়ারলেস হাসপাতালে। রিপোর্ট সংগ্রহ করে গেলাম সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার রেফার করলেন একজন আই স্পেশালিষ্ট, একজন ডায়াবেটিকস বিশেষজ্ঞ ও একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। ধারাবাহিকভাবে সেদিন চোখের ডাক্তার ও ডায়াবেটিকস বিশেষজ্ঞ দেখানে হলো। হার্টের ডাক্তার দেখাতে হবে পরদিন দুপুর ১২ টায়। তাই হোটেলে ফিরে আসলাম। সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করে কাটালাম।
পরদিন আবার গেলাম পিয়ারলেস হসপিটালে। আজকে আমাদের এপয়েন্টমেন্ট একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে। এই মুহুর্তে আমার তার নামটা মনে পড়ছে না। তবে খ্যাতিমান ডাক্তার, বয়স পঞ্চাশের মত। নির্ধারিত সময়ে আমরা প্রবেশ করলাম তার চেম্বারে। দীর্ঘ সময় নিয়ে তিনি বাবার সব রিপোর্ট দেখলেন। শারিরীক বিষয়ে অনেক কিছু জানতে চাইলেন বাবার কাছে। এক পর্যায়ে বাবার কাছে জানতে চাইলেন তার হার্টের সমস্যা আছে কি না। বাবা বললেন না হার্টের সমস্যা নেই। তবে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে। মাঝে মাঝে গ্যাস্ট্রিকের বেশী ব্যথা হয়। শুনে ডাক্তার বললেন- কাকা বাবু আপনি যেটাকে গ্যাস্ট্রিক বলছেন সেটা গ্যাস্ট্রিক নয় হার্টের ব্যথা।
আপনার ২/১ বার মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে। আপনি বুঝতে পারেন নি। এখন থেকে খুব সাবধান। আমাকেও ডাক্তার বলে দিলেন সে কথা। আমার বাবা’র একটা অভ্যাস ছিল কারো সাথে দেখা বা পরিচয় হলে তার বা তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইতেন। যে কারনে তিনি বৃহত্তর সিলেট এমনকি বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত পরিবারের ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ে জানতেন। চিনতেন অনেক মানুষকে। তার স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। ডাক্তার বাবুর চেম্বার থেকে বেরুবার মুহুর্তে বাবা তাকে উদ্দেশ্য করে জানতে চাইলেন, ডাক্তার বাবু আপনার পূর্ব পুরুষরা কি কলকাতার মানুষ না আমাদের বাংলাদেশের? তিনি বললেন ‘না আমার পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশের ব্রাম্মনবাড়িয়ার। তখন সাথে সাথে আমার বাবা এক হিন্দু জমিদারের নাম উল্লেখ করে বললেন, তাহলে তো আপনারা অমুকের দেশের লোক। সাথে সাথে ডাক্তার বাবু বললেন উনিতো আমার ঠাকুর দাদা। বাবা সাথে সাথে বললেন তাহলে আপনি কি অমুকের ছেলে। ডাক্তার বাবু বিস্ময়ে চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে গিয়ে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। আপনি তো দেখছি আমার বাপ দাদা সবাইকে চিনেন। বাবা বললেন সিলেটের সুনামগঞ্জে আপনাদের সব আত্মীয় স্বজন আমার পরিচিত বন্ধু। তাদের সাথে আমি আপনাদের বাড়ীতে গেছি। আপনার পিসি যার বিয়ে হয়েছিলো ময়মনসিংহে আমি তাকেও চিনি। সব শুনে তিনি বাবাকে কিছু সময় বসিয়ে রাখলেন। জানতে চাইলেন আমরা কোথায় আছি কতদিন থাকবো। বিদায় বেলা আমাকে বললেন বাবাকে খেয়াল রেখো। বয়সের তুলনায় তিনি ভালো আছেন। হসপিটালের ফার্মেসী থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম।
বিকেলে বাবা বললেন কলকাতায় অনেক আগে ট্রাম চড়েছি। লন্ডন নিউইয়র্ক মন্ট্রিয়ালে মেট্রো চড়েছি। কলকাতার মেট্রো কেমন দেখা দরকার। তাই আমরা চৌরঙ্গী এলাকা থেকে মেট্রোতে উঠে পড়লাম। গেলাম টালিগঞ্জ পর্যন্ত। টালিগঞ্জ এলাকায় কিছু সিলেটিদের বসবাস। সিলেটের প্রবীণ ২/১ জন আইনজীবির পরিবার এই এলাকায় থাকেন। এরা বাবার পরিচিত। মনে মনে বাবা খুঁজলেন তাদেরকে। আমি বাবাকে সিলেটের সন্তান প্রখ্যাত ছড়াকার সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরীর কথা বললাম। কাছাকাছি তার বাড়ী। আমি সেই বাড়ীটা চিনি একবার আমি গিয়েছিলাম। বাবার আগ্রহে ঢু মারলাম সেই বাড়ীতে। তাকে পাওয়া গেল না। সেখানে একটু ঘুরাঘুরি করে আবার চড়লাম মেট্রোতে এবার গেলাম দমদম পর্যন্ত। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে আবার মেট্রো তে ফিরলাম পার্ক স্ট্রীট। বিখ্যাত কস্তুুরী রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। ডাক্তার দেখানো শেষ। এবার বাবাকে নিয়ে যেতে হবে তার তারুণ্যের স্মৃতি বিজড়িত খিদারপুরে। পরদিন ছিল শুক্রবার। তাই আমরা খিদিরপুর জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে ১১ টার দিকে বেড়িয়ে পড়লাম। টেক্সি করে গেলাম খিদিরপুর ডিউটি ফ্রি মার্কেটের সামনে। উল্লেখ্য সমুদ্র বন্দর এলাকা হওয়ায় এখানে অনেক গুলো ডিউটি ফ্রি মার্কেট


আছে। যেখানে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের বিদেশী প্রসাধনী ও ইলেকট্রিক সামগ্রী ইত্যাদি। কিছু সময়ে একটা মার্কেট চক্কর দিয়ে খিদিরপুর জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করলাম। এবার বাবা খুঁজতে লাগলেন তার তারুণ্যের স্মৃতি বিজড়িত জাহাজি শ্রমিক নেতা আফতাব আলীর সেই বাড়ীটি। ৫০/৬০ বছরে এলাকার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেই পুরনো বাড়ীটিও নেই। সেখানে এখন বিশাল ভবন। সরকারী একটা দফতর। বাবা কিছু সময় ঘুরাঘুরি করলেন সেই এলাকায়। স্মৃতিচারণ করলেন পুরনো দিনের। তারপর খিদিরপুরের একটা মুসলিম হোটেলে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম।
এবার বাবা যাবেন আদি গঙ্গা’র পাড়ে যেখানে সেই আমলে বিখ্যাত এক মুসলিম ব্যবসায়ির নামকরা একটা কাপড়ের দোকান ছিল। তখন সেখান থেকে তারা কেনাকাটা করতেন। সেই দোকানটা আছে কি না দেখবেন বাবা। এক টেক্সি ড্রাইভারের সাথে আলাপ করলাম। সে জায়গাটা ঠিকমত চিনতে পারলো না। আমি বাবাকে বললাম, অনেক বছর আগের স্মৃতি আপনার। কলকাতা অনেক বদলে গেছে হয়ত আপনিও চিনবেন না জায়গাটা। বাবা একটু রেগে গিয়ে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন,আমি ঠিকই চিনবো। ড্রাইভারকে বললেন চলো আমি তোমাকে চিনিয়ে নিয়ে যাব। বাবার নির্দেশমত গাড়ী চালিয়ে আমরা আদি গঙ্গা’র পাড়ে একটা বড় রাস্তার মোড়ে এসে থামলাম। এলাকাটার অনেক পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় বাবা তার সেই দোকানের অস্থিত্ব খুঁজে পেলেন না। কিছু সময় আমরা সেখানে ঘুরলাম। এক পর্যায়ে বাবা সেখানে ডিউটিরত মধ্যবয়সি এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে গিয়ে তার কাছে সেই দোকানের নাম বলে জানতে চাইলেন সেই দোকানটা কি আছে। পুলিশ অফিসার বিস্ময়ের সহিত বাবা’র দিকে তাকালেন। বললেন সেতো অনেক আগের কথা কাকা। আমি নাম শুনেছি সেই দোকানের। একটা ভবন দেখিয়ে বললেন এই জায়গায় ছিল সেই দোকান। সেই মুসলিম ব্যবসায়ির বংশধররা এখন
অন্য ব্যবসা করেন। এই দোকানের নাম বললে বর্তমান প্রজন্মের কেউ চিনবে না। আমরা বাংলাদেশের সিলেট থেকে এসেছি শুনে তিনি জানালেন তার দাদার বাড়ীও সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। দেশ বিভাগের পর তার বাবা কলকাতায় চলে আসেন। আমার বাবার সাথে তার গল্প বেশ জমে উঠলো। বাবা শ্রীমঙ্গলের কিছু পুরনো হিন্দু ব্যবসায়ির নাম বললেন। দেখা গেলো এরা তার আত্মীয় স্বজন। পরে সেখান থেকে একটা টেক্সি নিয়ে হোটেলে ফিরে আসলাম। সন্ধ্যার পর নিউ মার্কেটের আশেপাশে ঘুরাঘুরি আর টুকটাক কেনা কাটা করে সময় কাটালাম।
পরদিন দুপুরে আমরা গেলাম কলকাতার মুসলিম এরিয়া জাকারিয়া স্ট্রীটে। সেখানে আমরা জোহরের নামাজ পড়লাম বিখ্যাত বড় মসজিদে। নামাজ শেষে মসজিদের পাশে কলকাতার বিখ্যাত মুসলিম হোটেল আমজদীয়া’য় দুপুরের খাবার খেয়ে বাবা আতর টুপি লুঙ্গি গেঞ্জি ইত্যাদি কেনাকাটা করলেন। বড় বাজারের আশে পাশে একটু ঘুরাঘুরি করে আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম। কলকাতায় আজ আমাদের শেষ দিন। হোটেল কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আমরা গেলাম বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। বেশ কিছু সময় কাটলো সেখানে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে আমি বাবা’র ছবি তুললাম। সেটাই এখন বাবার জীবনের শেষ ছবি হিসাবে আছে আমার কাছে।পরে পাশের গড়ের মাঠে কিছু সময় হাটাহাটি করে পায়ে হেটেই সদর স্ট্রীটে ফিরলাম। পরের দিন সকাল ১০ টায় আমাদের ফ্লাইট। টিকেট কনফার্ম করা আছে। এই কয়েক দিনে কেনাকাটা প্রচুর হয়েছে। তাই আমি সোহেলকে নিয়ে মালপত্র গুছিয়ে নিলাম। পরে এশা’র নামাজ পড়তে বাবাকে নিয়ে গেলেম পাশের মসজিদে। এই ক’দিনে বেশ কয়েকজন মুসল্লির সাথে বাবার ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছে। বাবা তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। আমরা হোটেল খালিক এ রাতের খাবার সেরে হোটেলে ফিরলাম। হোটেলে বাবা এবং সোহেল ছিলেন একই রুমে আমি অন্য রুমে। যেহেতু সকাল ৭ টায় আমাদের হোটেল ছাড়তে হবে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে তাই সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ার তাগিদ দিচ্ছিলাম আমি। কিন্তু বাবা তার নাতি সোহেলের সাথে জুড়ে দিলেন তার তারুণ্যের নানা গল্প। সেই ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় সালুটিকর ঘাটিতে বৃটিশ সেনাদের ব্যরাকে কাজ করা থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জ সিলেট করিমগঞ্জ শিলং কলকাতা লন্ডন নিউইয়র্ক মন্ট্রিয়াল সৌদি আরবের নানা গল্প কাহিনী।


এ ভাবে রাত ১২টা বেজে গেলে আমি বাবা আর সোহেলকে ঘুমাতে বলে আমার রুমে এসে লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি। কখন চোখে ঘুম নেমেছে বলতে পারি না।হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে। রাত তখন ১ টা। দরজা খুলে দেখি সুহেল দাড়িয়ে। সে জানালো-দাদা’র ঘুম আসছে না। তার শরীরটা মনে হয় ভালো নেই। আমি সাথে সাথে তাদের রুমে গেলাম। বাবার কাছে জানতে চাইলাম কি সমস্যা। তিনি জানালেন-খুব অস্বস্তি লাগছে বুকে চিন চিন ব্যাথা ঘুম আসছে না শরীরটা ঘামছে। আমি তাকে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাইয়ে রুমের বন্ধ এ সি টা চালিয়ে দিলাম। বললাম দেখেন ঘুম আসে কি না। সোহলকে বললাম দেখো বাবার ঘুম আসে কি না। আমি জেগে আছি প্রয়োজনে আমাকে ডেকো।
আমি রুমে এসে শুয়ে থাকলাম। কিন্তু ঘুম এলো না। হঠাৎ আবার সুহেলের ডাক। বাবা’র বুকের ব্যাথা বেড়ে গেছে। আমি গিয়ে দেখি বাবা বিছানায় বসে ছটফট করছেন। চেহারা দেখে মনে হলো খুব কষ্ট হচ্ছে তার।
আস্তে আস্তে ব্যাথা বেড়ে যায়। বাবা আমাকে বলেন তাকে কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যেতে। সে দিন ছিল রোববার। ছুঠির দিন। সব কিছুতে ছুঠির আমেজ। রাস্তাঘাটে কোন যানবাহন টেক্সি নেই। নিরুপায় হয়ে হোটেল ম্যানেজারকে ডেকে উঠালাম। বললাম বাবার অসুস্থতার কথা। ভদ্রলোক ছুঠে গেলেন এক প্রতিবেশী র বাড়িতে যার নিজের টেক্সি আছে। ঘুম থেকে ডেকে তুললেন তাকে। সাথে সাথে তিনি গাড়ী নিয়ে হাজির। এর মধ্য বাবার বুকের ব্যাথা বেড়ে গেলে ও তিনি স্বাভাবিকভাবে আমার হাত ধরে নিচে নামলেন। বসলেন টেক্সিতে। ড্রাইভারকে আমি দ্রুত কাছাকাছি কোন হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললাম। মধ্যরাত সানডেতে কলকাতার রাস্তা ফাকা। দ্রুত আমাদের গাড়ী ছুঠে চলছে। কাছাকাছি তেমন কোন হাসপাতাল নেই। পেছনের সিটে বাবাকে ধরে আমি বসা। তার সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে আর প্রচন্ড রকম ঘামছে। আর আমার দিকে অসহায়ের মত তাকাচ্ছেন। কিছু না বললেও আমি বুঝতে পারি বাবার কষ্ট বেড়ে গেছে। এর মধ্যে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে এসে থামে আমাদের গাড়ী। আমি দ্রুত রিসিপশনে গিয়ে সাহায্য কামনা করি। কিন্তু তারা তেমন সহযোগীতা করলো না। বরং তারা অগ্রিম টাকা পয়সা দিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকতা আগে শেষ করতে চাইলো। পরে একজন এসে বললো জরুরী রোগীর জন্য আমরা দ্রুত কিছু করতে পারবো না। আপনি রোগী নিয়ে কলকাতা পি জি হাসপাতালে চলে যান। কি আর করা ছুটলাম সেখানে।ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে পি জি র জরুরী বিভাগের সামনে চলে গেলো।আমি দ্রুত বাবা কে নিয়ে নামলাম। ট্রলি আনতে চাইলাম। বাবা বললেন হেটেই যেতে পারবেন। রিসিপশন থেকে একটা টিকেট নিয়ে জরুরী বিভাগে চলে গেলাম। কর্তব্যরত ডাক্তার রা তাড়াতাড়ি বাবাকে একটা বেডে শুইয়ে দিয়ে কিছু পরিক্ষা নিরিক্ষা করলেন। তারপর নিজেদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা বললেন। তাদের হাবভাব দেখে আমার মনে হলো বাবার অবস্থা ভাল নয়। তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। এরপর অন্য একজন ডাক্তার এলেন। বাবাকে নেড়ে চেড়ে দেখে একটা ইনজেকশন পুশ করলেন। এ সময় বাবা চোখ মেলে একটু এদিক ওদিক থাকালেন। তার পর মনে হলো ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি একটু দূরে দাড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছি। সেই ডাক্তার আবার শরীরে হাত রাখলেন পালস অক্সিজেন চেক করে ভাবলেশহীনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, উনি তোমার কি হন? বাবা,বলার সাথে সাথে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন আমি দুঃখিত বাবা, তোমার বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মনে মনে পড়লাম ইন্নালিল্লাহি….. রাজিউন।
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুলো না। মনে হলো আকাশটা যেন মাথায় ভেঙে পড়লো। আরো ক’জন ডাক্তার সেবিকা এসে আমাকে জড়িয়ে সহানুভূতি জানিয়ে সান্তনা দিলেন। বললেন মনকে শক্ত করো। বাবার লাশ নিয়ে তোমাকে ফিরতে হবে দেশে। তারা পরামর্শ দিলেন লাশ মর্গে রেখে তুমি চলে যাও। হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে দেশে যোগাযোগ করে প্লান করো কিভাবে কি করবে। বাবাকে রেখে আমি সোহেলকে নিয়ে হাসপাতালের গেইটের সামনে এসে দাড়ালাম খোলা আকাশের নীচে। মাথায় কোন কাজ করছে না। শোকে পাথর বনে গেছি। চোখ দিয়ে কোন জল আসছে না। কান্নাও ভুলে গেছি। এতবড় দুঃসংবাদ আমি কাকে কিভাবে জানাবো। কিছুই ঠিক করতে পারছি না। সকালে চলে যাব বলে মোবাইল রিচার্জ করা হয় নি। বিদেশে কথা বলার মত টাকা নেই মোবাইলে। এত রাতে কোন পিসিও খোলা নেই ফোন করার জন্য।
সন্ধ্যা রাতে আমি দেশে আমার ছোট ভাই লিটুর সাথে ফোনে কথা বলেছি। বলেছিলাম পরদিন ১২ টায় আমরা


ঢাকায় ফিরবো। তারপর ট্রেনে রাত ৯ টায় সিলেট। সে যেন আমাদের গাড়ী নিয়ে স্টেশনে থাকে। লন্ডনে আমার ভাই লিলু, হিরু, দিলু ও আমেরিকায় বোন শিল্পীর সাথে ফোনে কথা বলেছি। বাবার সাথেও কথা হয়েছে সবার। বাবা বলছেন অনেক বছর পর তার তারুণ্যের স্মৃতি জড়িত কলকাতা ভ্রমণ পাশাপাশি শারিরীক চেকআপের কথা।
দেশে ফিরে কথা হবে। সে রকম বলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি আমরা।
আমার বাবা খুব সৌখিন ভ্রমণ বিলাসী মানুষ ছিলেন। সেই ছাত্র জীবন থেকেই তিনি ঘুরেছেন দেশের এক প্রান্ত
থেকে অন্য প্রান্তে। তারুণ্যের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন কলকাতার খিদিরপুরে। জাহাজি শ্রমিকনেতা আলতাব আলীর সান্নিধ্যে। তার স্কুল জীবনের সহপাঠী বন্ধু ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আবদুস সামাদ আজাদ, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডঃ আখলাকুর রহমান প্রমুখ। বরুন রায়, দেওয়ান ফরিদ গাজী, মাহমুদ আলী, পীর হাবিবুর রহমান, আবদুল হামিদ আবদুন নূর মাস্টারসহ শাহ আজিজ, ইনামুল হক চৌধুরী, আশরফ আলী,ব াবরুল হোসেন বাবুল, মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, ইফতেখার হোসেন শামীম, আ,ন,ম শফিকুল হক প্রমূখসহ দেশবরেণ্য অনেক রাজনীতিবিদদের সাথে তার ছিল সখ্যতা। আমেরিকা কানাডা ব্রিটেন ভ্রমণ করেছেন অনেকবার। তিনবছর কাটিয়েছেন কানাডার মন্ট্রিয়াল এ। হজ্বব্রত পালন করেছেন পাঁচ বার। যৌবনের স্মৃতি বিজড়িত কলকাতাকে তিনি ভুলতে পারতেন না। আমি কলকাতা ঘুরে গিয়ে কলকাতার গল্প করলে তিনি নস্টালজিক হয়ে পড়তেন। বলতেন পরেরবার আমাকে নিয়ে যা। আমি তোকে আমাদের কলকাতা দেখাবো। ঠিকই মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে ঘুরে দেখিয়ে গেছেন তার প্রিয় কলকাতা।
হাসপাতালের সামনে দাড়িয়ে দিশেহারা নাবিকের মত বিনিদ্র রজনী কাটাই। হঠাৎ হাসপাতালে’র পাশেই একটা ফোনের দোকানের সাইন চোখে পড়লো। দোকানটি খোলা নেই। তবে সৌভাগ্যক্রমে আশেপাশে দোকানের মালিক যুবকটিকে পাওয়া গেল। সে আমার বিপদের কথা শুনে দোকানের তালা খুলে টেলিফোন করার সুযোগ করে দিল। প্রথম ফোন করলাম লন্ডনে আমার ইমিডিয়েট ছোট ভাই সৈয়দ আবুল মনসুর (লিলু) কে। অসময়ে কলকাতর ফোন দেখে ১ম রিং এর সাথেই সে ফোন রিসিভ করে আতংকিতভাবে জানতে চায় কি হয়েছে ? কোন সমস্যা? আমি জবাব দিলাম খবর ভালো নয়। আমার গলার আওয়াজে সে ঘটনা আচ করে নেয়। জানতে চায় আমি ঠিক আছি তো? বিস্তারিত সব বললাম তাকে। সে আমাকে শান্তনা দিয়ে বললো যা হবার তো হয়ে গেছে।
এখন তুমি সুস্থ থেকে বাবার লাশ নিয়ে দেশে ফিরতে হবে। তাই হোটেল ফিরে তুমি বিশ্রাম নাও। আমি সবার সাথে যোগাযোগ করে তোমার সাথে কথা বলবো। অবশেষে বাবার লাশ মর্গে রাখার ব্যবস্থা করে হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলের সোফায় বসে বসে ভোর হয়ে গেল। এর মধ্যে কয়েকবার ফোন এলো লন্ডন থেকে। আমাকে কিছু দিক নির্দেশনা দেয়া হলো। সকালে প্রথমেই গেলাম বাংলাদেশ বিমান অফিসে। কর্তব্যরত অফিসার মিসেস বীনা রায়কে জানালাম বিস্তারিত। তিনি ফোনে কথা বললেন বিমানের স্টেশন ম্যানেজারের সাথে। দু’ তলায় আমাকে পাঠানো হলো তার কাছে। খুব অমায়িক ভদ্রলোক। আগে লন্ডনে ছিলেন। আমাদের অনেকের পরিচিত। তাই লন্ডন থেকে তাকে জানানো হয়েছে আমার ব্যাপারে। তিনি আমাদের আজকের টিকেট বাতিল করে বীনা রায় কে বলে দিলেন আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য। ভদ্র মহিলা আমাকে একটা কাগজে ধারাবাহিকভাবে লিখে দিলেন লাশ দেশে নেবার জন্য কি কি কাজ করা আমার জরুরী। আমি যেন এই কাজগুলো শেষ করে তার কাছে আসি। তিনি লাশ বিমানে পরিবহণের ব্যবস্থা করবেন এবং সাথে তার মোবাইল নাম্বার দিয়ে বললেন কোথাও আটকে গেলে যেন তাকে ফোন দেই। মিসেস বীনা রায়ের নির্দেশনা মতো একটা টেক্সি নিয়ে আমি প্রথমেই গেলাম বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনে। ডেপুটি হাই কমিশনার আমার এক কাজিনের বন্ধু। তাই তাকেও আমার ব্যাপরে জানানো হয়েছিলো। তাই হাই কমিশনে দ্রুত তারা বাবার পাসপোর্ট বাতিল করে প্রয়োজনীয় কাজ করে দিলেন। হাই কমিশনের কাগজ নিয়ে গেলাম লাল বাজার থানায়। পুলিশ রিপোর্ট ছাড়া লাশ নেয়া যাবে না। থানা থেকে বলা হলো ডেথ সার্টিফিকেট আনতে হাসপাতাল থেকে। তাই করলাম।
থানার মহিলা পুলিশ অফিসার অনেক ােমলার মাঝেও সহানুভূতির সহিত ভীষন সহযোগীতা করলেন। পুলিশ
রিপোর্ট নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। এবার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাশ নিতে হবে ‘ পিস হেভেন’ এর
মরচুয়ারিতে। ঝামেলা ছাড়াই হাসপাতালের সব কাজ শেষ হলো। ছোট্ট ট্রাকে করে লাশ এলো পিস হেভেনে। দেশে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবে। বিমানের যাত্রা কনফার্ম হলে তাদের জানাতে হবে। তারা কফিন বন্দি করে মরদেহ তাদের বিশেষ গাড়ীতে করে পৌছে দিবে বিমান বন্দরে। পিস হেভেনে লাশ রেখে বিমান অফিসে ফোন দিলাম মিসেস বীনা রায়কে। জানালাম আমার কাজের অগ্রগতির কথা। তিনি বললেন আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। দ্রুত চলে এসো আমার কাছে। দেখি আগামি কালকের ফ্লাইটেই তোমার টিকেট কনফার্ম করে দেব। পথে অনেক ট্রাফিক জ্যাম। টেক্সি ড্রাইভারকে আমাদের সমস্যার কথা জানালে সে সোহেলের হাতে একটা লাল কাপড় দিয়ে বললে তুমি হাত বের করে লাল কাপড়টা নাড়তে থাকো। আমি কোন সিগনাল না মেনেই হর্ণ বাজিয়ে দ্রুত চলে যাবো। তাই হলো। তবুও বিমান অফিসে পৌছতে বেশ দেরী হেেলা। মিসেস রায় আমার অপেক্ষায়ই ছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি আমার টিকেট বুকিং দিয়ে বিনা ভাড়ায় লাশ পরিবহনের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। আমার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে নিয়ে ফটোকপি করে সব কনফার্ম করে পিস হেভেনকে জানিয়ে দিলেন ফ্লাইট সিডিউল। আমাকে বললেন আমি যেন কাল সকালে হোটেল ছেড়ে টেক্সি নিয়ে পিস হেভেনে চলে যাই। ভদ্রমহিলাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহ নিয়ে হোটেলে ফিরলাম।
একটু বিশ্রাম নিয়ে বাংলাদেশে লন্ডনে ফোন দিয়ে সবাইকে বিস্তারিত জানালাম। ঢাকায় ফোন দিলাম আমাদের
পারিবারিক বন্ধু বড় ভাই মুনির ভাইকে (ইঞ্জিনিয়ার মুনির উদ্দিন আহমদ, সাবেক ছাত্রনেতা, সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) কলকাতা আসার দিন তিনিই তার বাসা থেকে নিজে বাবাকে বিমানে তুলে দিয়ে বলেছিলেন চাচা ফেরার দিন বিমান বন্দরে আমি থাকবো আমার গাড়ী নিয়ে। পরদিন সকালে আমরা হোটেল ছেড়ে চলে গেলাম পিস হেভেনে। যাবতীয় কাজ শেষে কফিনে মোড়ানো মরদেহ তোলা হল বিশেষ গাড়ীতে। সাইরেন বাজিয়ে
গাড়ী ছুটলো দমদম বিমান বন্দর অভিমুখে। পেছনে অন্য গাড়ীতে আমি। কফিন নিয়ে গাড়ী সোজা চলে গেল
কার্গো কমপ্লেক্সে। সেখানে ও আগে থেকে জানিয়ে রেখেছেন বীনা রায়। তাই দ্রুত সব কাজ শেষে কফিন চলে গেল বিমানের ভেতর। আমার কিছুই করতে হলো না। একজন অফিসার এসে আমাকে খুজে নিলেন। জানালেন স্টেশন ম্যানেজার আর বীনা রায় তাকে আমার কথা বলে রেখেছেন। তিনি আমার পাসপোর্ট টিকেট নিয়ে যাবতীয় কাজ শেষ করে আমাকে বিমানের দরজা পর্যন্ত পৌছে দিলেন। বিমানের কেবিন ক্রুদের ঢেকে বলে দিলেন আমাকে দেখার জন্য। সবাই আমার বাবার মৃত্যুর ঘটনা জেনে দুঃখ প্রকাশ করে সহানুভূতি জানালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান ঢাকার পথে আকাশে পাখা মেললো। আমি জানালার পাশে বসে আকাশ আর কলকাতা শহর দেখতে দেখতে গত দুই দিনের ঘটনাবলি ভাবতে থাকলাম। চোখের সামনে ভাসতে থাকলো বাবার মুখ, হাসপাতাল, রাতের কলকাতা, বিমান অফিস, লালবাজার থানা, পিস হেভেন, বিশেষ করে বিমান কর্মকর্তা মিসেস বীনা রায়ের কথা। যার সহযোগীতা আর গাইডলাইন না পেলে আমি এত সহজে আর দ্রুত সময়ে বাবার লাশ নিয়ে ফিরতে পারতাম না। এসব ভাবতে ভাবতে বিমান ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরন করলো। একজন বিমান বালা এসে আমাকে সহযোগীতা করলেন নামতে। বিমান থেকে নেমেই দেখি মুনির ভাই তার একজন সঙ্গি সহ দাড়ানো। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিলেন।তার পর লাশ পরিবহনের যাবতীয় কাগজপত্র চেয়ে নিয়ে একজনকে দায়িত্ব দিলেন বিমান থেকে কফিন সংগ্রহের। মুনির ভাই আসার সময় সিলেট পর্যন্ত বাবার লাশ পরিবহনের জন্য এম্বুলেন্স নিয়ে এসেছেন। এম্বুলেন্স নিয়ে সেই লোক কার্গো কমপ্লেক্সে চলে গেলেন লাশ রিসিভের জন্য। আমি আর মুনির ভাই দাড়িয়ে রইলাম গেইটে। সামান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাশ নিয়ে এম্বুলেন্স চলে এলো। শরীর মনের অবস্থা ভালো নয়। বাবার লাশ নিয়ে বাড়ীতে না পৌঁছা পর্যন্ত মনে স্বস্তি নেই। সেখানে আমার ভাই বোন আত্মিয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি শুভাকাঙ্খীরা অপেক্ষায় আছেন। তাই মুনির ভাইয়ের প্রতি ঢাকা কলকাতা বিমান বন্দরে লাশ রিসিভ সিলেটে প্রেরণ সবকিছুর জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তার ধমক খেলাম। তিনি বললেন আমি তো তোদের বড় ভাই উনি তো আমারও বাবা। তাই আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। মুনির ভাইয়ের কথায় আমিও আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লাম। তাই কথা না বাড়িয়ে এম্বুলেন্সে উঠে বসলাম। মুনির ভাই ড্রাইভারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে আমাদের বিদায় জানালেন। বাবার লাশবাহী এম্বুলেন্স রাতের অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চললো সিলেটের অভিমুখে…

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...