Monday, September 20, 2021

এইমওয়ে থেকে এক্সিল্যান্ট ওয়ার্ল্ড : এমএলএম প্রতারক রয়েল রানার নতুন ফাঁদ


আনোয়ার এইচ রয়েল রানা। বাড়ি ফেনী জেলায়। একসময় ছিলেন এমএলএম প্রতারণা কোম্পানী ডেসটিনির দালাল। তার গুরু ছিলেন চরমোনাইর পীরের ছেলের গুণধর পুত্র রেদোয়ান বিন ইসহাক। ব্যবসাটা লাভজনক হওয়ায় পরে চরমোনাইর পীরের ছেলের সাথে পরামর্শ করে ডেসটিনি থেকে বেরিয়ে এসে নিজেরাই এইমওয়ে নাম দিয়ে এমএলএম প্রতারণা কোম্পানী খোলে বসে। ছয় মাসে টাকা দ্বিগুন করার লোভ দেখিয়ে অল্প সময়েই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। গ্রাহকরা আসল টাকাও ফেরত না পেয়ে থানায় মামলা করলে পীরের পুত্র ইসহাক ও এমডি মাসুদ রানা (বর্তমানে আমেরিকায় পলাতক) গ্রেফতার হলে রয়েল রানা ও তার সহযোগী একরামুল হক ভুয়া আত্মগোপনে চলে যায়। কয়েক বছর পালিয়ে থাকার পর ঢাকায় এসে মুগদা এলাকায় ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা এসপিসি ওয়ার্ল্ডের আল আমিনের মতই ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ নাম দিয়ে এইমওয়ের কায়দায় এমএলএম প্রতারণার ব্যবসা করে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এগ্রো ফুড এন্ড কসমেটিক্স-তার আসল ব্যবসা নয়, এমএলএম এবং দ্বিগুন মুনাফা দেবার কথা বলে প্রতারণা করাই তার মূল ব্যবসা।

নিজস্ব প্রতিবেদক : এইমওয়ে প্রতারণা মামলার অন্যতম আসামী রয়েল রানা ও প্রতারক একরামুল করিম ভুইয়া প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে আবারো ৬ মাসে টাকা দ্বিগুন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার ব্যবসা করে কয়েকশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর ৮৪ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ক-১১/২ জগন্নাথপুর বিল্ডিংয়ের ৯ম তলায় এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড এগ্রো ফুড এন্ড কসমেটিক্স-এর হেড অফিস। এছাড়া রাজধানীর মুগদাপাড়া, চট্টগ্রাম সিলেটসহ বিাভন্ন এলাকায় শাখা অফিস রয়েছে। ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী তাদের উৎপাদিত পণ্যের সংখ্যা ৮৫টি। এক নম্বরে রয়েছে যৌনশক্তি বর্ধক পাওয়ার সোর্স কিং, মুল্য – ১০০০ টাকা, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কোন অনুমোদন নেই। এছাড়া আছে প্রোটিন প্লাস বেনিফিট, ম্লিম টি, তুলসি টি, শ্যাম্পু, ফিমেল কেয়ার প্লাস, প্রোটিন প্লাস, হেয়ার অয়েল ও তুলসি জুস ইত্যাদি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কিংবা বিএসটিআই- কোন সংস্থারই অনুমোদন নেই। এসব পণ্যের ড্রাগ লাইসেন্স বিষয়ে জানতে চাইলে রানা বলেন তার কোস্পানী জয়েন্ট স্টক কোম্পানী থেকে রেজিষ্ট্রিকৃত। তিনি এমএলএম ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছেন। ওষুধ আইনে এমএলএম ও হকারি করে ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড এমএলএম সিস্টেমে ওষুধ বিক্রির নামে প্রতারণা করছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- রানার নিজস্ব কোন কারখানা নেই, তিনি বিভিন্ন ভেজাল ইউনানী ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে ভেজাল ওষুধ তৈরি করে এনে তাতে ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে প্রতারণা করছে। রানা ইতিমধেই তার আখের গুছিয়ে নিয়েছে। গ্রাহকদের দ্বিগুন টাকা ফেরত দেবার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। কাজেই যেকোন সময় বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে রানা ও একরাম।

ফ্লাস ব্যাক : প্রতারণার নতুন নাম এইমওয়ে
ডেসটিনি, ইউনিপে টু ইউসহ অন্যান্য এমএলএম কোম্পানির পর এইমওয়ে করপোরেশনের আমলনামা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে যাবার পর সংস্থাটির বিরুদ্ধে ৪০ হাজার গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। বেশি লাভের প্রলোভন দেখিয়ে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার নামে সংগ্রহ করা ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৩১ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এইমওয়ে করপোরেশনের অধীনে আলোর দিশারী ক্ষুদ্র্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গঠন করে প্রায় ৪০ হাজার সদস্যের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এইমওয়ে করপোরেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ রিদওয়ান বিন ইসহাকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক। আসামির তালিকায় অন্যরা হলেন এইমওয়ে করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাইফুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জিএম সালাউদ্দিন, পরিচালক (অর্থ) মশিউর রহমান, রয়েল রানা ও মাসুদ রানা।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মোট ১২ কোটি ৬৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭৮৫ টাকা জমা করা হয় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রাজধানীর বিজয়নগর শাখায়। অর্থের উৎস গোপন করে এইমওয়ে করপোরেশনের নামে খোলা হিসাবে টাকাও জমা করা হয়েছিল। এর মধ্য থেকে ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৩১ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। অবশিষ্ট টাকা জব্দ করার পর ওই ব্যাংক হিসাবে জমা আছে।
সূত্র জানায়, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ওই হিসাব থেকে অধিকাংশ অর্থ নগদে জমা ও উত্তোলন করায় বাংলাদেশ ব্যাংক ওই লেনদেনকে সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত করে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তদন্ত করে ওই লেনদেনকে মানি লন্ডারিং আইন পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনটি দুদকে পাঠানো হলে দুদক
অনুসন্ধান করে প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পায়। জানা গেছে, আমদানি, রফতানি, উৎপাদন, বিতরণ ও নির্মাণ সংক্রান্ত ব্যবসার উদ্দেশ্যে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে এইমওয়ে করপোরেশনের নিবন্ধন গ্রহণ করা হলেও আইন ভঙ্গ করে এমএলএম পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে সমবায় অধিদফতর থেকে সমবায় সমিতি আইন-২০১১ ও সমবায় সমিতি বিধিমালা অনুযায়ী আলোর দিশারী ক্ষুদ্র্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নিবন্ধন গ্রহণ করা হয়। সমবায় সমিতি বিধিমালা অনুযায়ী কমিশনের ভিত্তিতে এমএলএম পদ্ধতিতে সমিতির শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের কোনো সুযোগ নেই। সমবায় অধিদফতরের এ বিধান লঙ্ঘন করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বেশি লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ।
দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তরা আলোর দিশারী ক্ষদ্র্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নামে সংগ্রহ করা অর্থ এ সমিতির প্রায় ৪০ হাজার সদস্যের স্বার্থে বিনিয়োগ করেননি। বরং সদস্যদের আড়াল করে মোট ৯ কোটি ২৪ লাখ ৫২ হাজার ৫৮৯ টাকায় সমিতির কর্মকর্তাদের স্বার্থে এইমওয়ে হারবাল লিমিটেড, এইমওয়ে করপোরেশনের নামে জমি ক্রয়, রাজধানীর ৫০/এ, পুরানা পল্টনে হাবিব সেন্টার নামে ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট ক্রয় করা হয়েছে।

তিন হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ডেসটিনির মতো ‘এইমওয়ে’ নাম দিয়ে গ্রাহকদের ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে প্রতারকচক্র। বহু বিতর্কিত ডেসটিনি ও ইউনিপেটুইউসহ কয়েকটি হায় হায় কোম্পানির কর্মকর্তা মিলে এ এইমওয়ে গঠন করে ৬ মাসে টাকা দ্বিগুণ করার কথা বলে সাড়ে ৭ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করেছে। যে মুহূর্তে ডেসটিনি ইউনিপেটুইউ ও যুবকসহ এমএলএম নামের প্রতারক কোম্পানিগুলোর অবৈধ কর্মকা- তদন্তে সরকারের ১২টি মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তদন্তে মাঠে নেমেছিল, সেই সময় পুরনোদের নতুন নামের এই কোম্পানির অবৈধ ব্যাংকিং পর্যবেক্ষণ করে মানি লন্ডারিং আইনে তাদের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেময় তারা ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী দুই মাস কোম্পানি থেকে কোন টাকা/কমিশন কোন গ্রাহককে ফেরত দেয়া হবে না। পরে ওই সময়ের মধ্যেই তারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এ প্রতিষ্ঠানটি মানুষকে নানাভাবে বোকা বানিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, এ কো¤পানিটি ক্ষুদ্র্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অনুমোদন নিয়ে অবৈধ ব্যাংকিং করছে। পাশাপাশি তারা পণ্য হিসেবে কবরস্থান বিক্রি, রিহ্যাব বা রাজউকের অনুমোদন না থাকলেও রিয়েল এস্টেট বিজনেস করেছে, বিএসটিআইর অনুমোদন ছাড়া নি¤œমানের কসমেটিকস ও হারবাল পণ্য বাজারজাত করেছে এবং সর্বশেষ চরমোনাই পীর সাহেবের নাম বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা গ্রাহক থেকে সংগ্রহ করছে। এইমওয়ে কর্পোরেশন জয়েন্ট স্টক কো¤পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। তবে কো¤পানির পরিশোধিত মূলধন কত তা কোথাও বলা হয়নি। এইমওয়ে তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নিয়ে অনেকগুলো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছিল। এগুলোর মধ্যে এইমওয়ে মাল্টিপারপাস, এইমওয়ে কবরস্থান, এইমওয়ে হেলিকপ্টার এভিয়েশন সার্ভিস, এইমওয়ে কসমেটিক্স অ্যান্ড ফুড সাপ্লিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, এইমওয়ে মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, এইমওয়ে ব্যাংক, এইমওয়ে ইন্স্যুরেন্স, এইমওয়ে সুপার শপ, এইমওয়ে মিনারেল ওয়াটার, এইমওয়ে গার্মেন্টস, এইমওয়ে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, এইমওয়ে রিয়েল এস্টেট, এইমওয়ে মেগাসিটি, এইমওয়ে পর্যটন সিটি, এইমওয়ে ট্রান্সপোর্ট, এইমওয়ে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট, এইমওয়ে অ্যাম্বুলেন্স ও এইমওয়ে টেলিভিশন। তবে সবকিছুই ছিল কাগজে-কলমে, বাস্তবে এসবের কোন অস্থিত্ব ছিল না।
ডেসটিনির সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক কোন পার্থক্য ছিল না। এ কারণে তারা তাদের নতুন একটি স্লোগান তৈরি করেছিল। ডেসটিনি থেকে বের হয়ে আসা লোকজনই ডেসটিনির বিকল্প এমএলএম কোম্পানি হিসেবে এইমওয়ে কর্পোরেশন লি. গড়ে তুলেছিল। শুধু পার্থক্য এখানে বিনিয়োগ করলে ছয় মাসে দ্বিগুণ লাভ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রশান্ত মজুমদার নামের একজন গ্রাহক বলেন, আমরা চরমোনাই পীরের কথার ওপর বিশ্বাস করে এইমওয়েতে বিনিয়োগ করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের আর কোন কমিশন দেয়া হচ্ছে না। এমনকি পুঁজি নিয়েই পালিয়ে গেছে।
নয় মাসে এইমওয়ে সাড়ে সাত লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পাঁচ মাসের মাথায় এসে কো¤পানি ঘোষণা দিয়েছিল ছয় মাসে দ্বিগুণ টাকা দিলে কো¤পানি টিকবে না তাই তারা ১২ মাসে দ্বিগুণ দেবে। তাদের এ কার্যক্রম কয়েকদিন চালিয়ে যখন তারা দেখল কো¤পানিতে ইনভেস্ট কম হচ্ছে তখন তারা আবার আগের নিয়ম চালু করে। এখানেও তারা চালাকি হিসেবে সব সময় বলত আগামী এক সপ্তাহের জন্য এই অফার দেয়া হয়েছে, এরপর আর এ অফার থাকবে না। তখন মানুষ ছয় মাসে দ্বিগুণ পাওয়ার আশায় বেশি করে ইনভেস্ট করতে থাকে। অফার শেষ হওয়ার দিন আবার তারা বলত আপনাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে আরও এক সপ্তাহ সময় বৃদ্ধি করা হল। এভাবেই কো¤পানি কর্তৃপক্ষ বারবার মানসিক চাপ দিয়ে এখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করত। সর্বশেষ ওই বছর ৭ এপ্রিল পর্যন্ত এ অফার বর্ধিত করা হয়েছিল। শেষ সময়ে গড়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে বলে কো¤পানির পরিচালক অপারেশন মোঃ মামুনুর রশীদ খান ও রয়েল রানা জানিয়েছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এইমওয়ে কর্পোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাওলানা রেদওয়ান বিন ইসহাক ছয় মাসে টাকা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাত্র এক বছরের মধ্যেই কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। প্রতারণার কৌশল হিসেবে তিনি গ্রাহকদের সব সময় বলতেন, আমি ছোট থেকেই টাকা দেখে বড় হয়েছি, আমরা ধর্মীয় লোক বলে আমাদের টাকা-পয়সার কোন অভাব বা লোভ নেই। অথচ তিনি এই কো¤পানি খোলার সময়ও রিকশায় চলাচল করতেন। পরে তিনি কো¤পানির টাকায় চলছেন কোটি টাকা দামের প্রাডো গাড়িতে। পরিচালকরা কেউ এখান থেকে বেতন নেয় না বলে দাবি করলেও সাত মাসে সামান্য সময়ের মধ্যেই তিনি ৫০/১ পুরানা পল্টন এলাকায় এইমওয়ে সেন্টার নামের এক বিশাল বাণিজ্যিক ভবন কিনে নিয়েছেন। জানা গেছে, ৯২ কোটি টাকার বেশি মূল্য দিয়ে কেনা এ ভবনের মালিক খোদ সৈয়দ মাওলানা রেদওয়ান বিন ইসহাক। ২০০১ সালে মক্কা-মদিনা হজ নামীয় একটি প্রতারক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে সৈয়দ রেদওয়ান বিন ইসহাক এবং তার বড় ভাই সৈয়দ কাউসার বিন ইসহাক শত শত হজযাত্রীকে প্রতারিত করার পর দু’জনই গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন। পরবর্তীকালে সৈয়দ রেদওয়ান বিন ইসহাক ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হন এবং এর পরিচালক গোফরানুল হকের সঙ্গে বিশেষ স¤পর্ক গড়ে তোলেন। পরে গোফরানের পরামর্শ এবং সহযোগিতায় রেদওয়ান বিন ইসহাক এইমওয়ে প্রতিষ্ঠা করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিচালকের সহকারী জানান, ওই বছর ৬ ও ৭ এপ্রিল রাতে কো¤পানির পরিচালনা পর্ষদ এক জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে তারা দীর্ঘ সময় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন, ছয় মাসে দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেয়া যাবে না বলে তারা বিশেষ পদ্ধতিতে কো¤পানিটি বন্ধ করে দেবেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৮ এপ্রিল কো¤পানির ৫০/১ পুরানা পল্টন অফিসে প্রধান প্রধান সদস্যদের ডেকে নিয়ে আসা হয়। সন্ধ্যার ওই মিটিংয়ে কো¤পানির প্রায় চারশ’ টপআর্নার ও প্রধান সদস্যদের মোটিভেশন দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিটি বাতলে দেয়া হয়। মিটিং শুরুর আগে কো¤পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মাসুদ রানা বলেন, তিনি যে কথাগুলো বলবেন তার যেন কোন প্রকার ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করা না হয়। এজন্য প্রত্যেকের মোবাইল বাধ্যতামূলক বন্ধ রাখা হয়। পাশে অপরিচিত কোন লোক থাকলে তাকে অবহিত করতে বলেন। ঘরের খবর (গোপন কথা) পরকে বলে দিলে ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি মিটিংয়ের মাঝে মাঝে খবর নেন মোবাইল বন্ধ আছে কিনা। সাংবাদিকদের কাছে তার তথ্য পাচার হতে পারে বলে তিনি অগ্রিম সতর্কতা অবলম্বন করেন। কিন্তু তারপরও কিছু লোক তার কথাগুলো গোপনে রেকর্ড করে গণমাধ্যমের কাছে জমা দিয়েছেন। এক ঘণ্টা তিন মিনিটের ওই রেকর্ডে জানা যায়, তিনি যা বলেন সাংবাদিক এবং সরকারি তদন্ত দল যদি জানতে পারে আমরা ইনভেস্টমেন্ট কো¤পানি তাহলে আমাদের কো¤পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আপনারা নিশ্চয় চান না যে কো¤পানি বন্ধ হয়ে যাক। আমাদের কাছে অগ্রিম খবর আছে আগামী দুই মাস সাংবাদিক, এনএসআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিবিসহ অনেকেই অফিসে তদন্ত করতে আসবে। তারা যাতে কোনভাবেই বুঝতে না পারে আমরা ইনভেস্টমেন্ট কো¤পানি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী ৯ এপ্রিল থেকে ৮ জুন পর্যন্ত দুই মাস কো¤পানির অ্যাকাউন্টস থেকে আপনাদের কোন প্রকার টাকা দেয়া হবে না। তবে আপনারা চাইলে মাঝে মধ্যে গোপনে ইনভেস্ট করতে পারবেন। কো¤পানির অন্যান্য প্রজেক্ট ও প্রডাক্ট স¤পর্কে ওই মিটিংয়ে এমডি বলেন, আপনাদের জন্য নারায়ণগঞ্জে বাণিজ্যিক কবরস্থান প্রজেক্ট চালু করা হয়েছে। এ, বি এবং সি ব্লকের একেকটি কবরের মূল্য রাখা হয়েছে যথাক্রমে ৪ লাখ, ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ৪০ হাজার টাকা। সম্প্রতি আমেরিকায় আবিষ্কৃত সর্বরোগের মহৌষধ ননী জুস ক্যাপসুল খুব শিগগিরই পাওয়া যাবে। ৩০টি ক্যাপসুলের দাম রাখা হবে মাত্র ৬ হাজার টাকা। মিনারেল ওয়াটার প্যাকেজ ১০ লাখ টাকায় ক্রয় করা যাবে। তাহলে ১২ মাস পর মূলধন এবং পরবর্তী প্রত্যেক বছরে ২০% কমিশন দেয়া হবে। সিলেটে ফাইভ স্টার হোটেল প্যাকেজের মূল্য ৪ লাখ টাকা। প্রত্যেকটি প্রজেক্ট ও প্রডাক্ট বিক্রি বাবদ মূল্যের ওপর ১০% ¯পন্সরিং কমিশন ও ১০% ম্যাচিং কমিশন দেয়া হবে। তাদের কাছে আবহাওয়া অফিসের মতো সরকার ও সাংবাদিকদের সব খবর আগে এসে পৌঁছায় বলে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার আগামী দুই মাসের মধ্যে এমএলএমের নীতিমালা করবে বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। ওই নীতিমালায় দেশের ৭২টি কো¤পানির মধ্যে সরকার ১৭টি কো¤পানির অনুমোদন দেবে, তার মধ্যে এইমওয়ে কো¤পানি দুই নাম্বার অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার এইমওয়েকে নীতিমালা দিলে আমরা আবার ইনভেস্টমেন্ট প্লানে চলে যাব তবে তখন ৬ মাসে দ্বিগুণ না হয়ে ১৮ বা ২৪ মাসে দ্বিগুণ দেয়া হবে। সর্বশেষ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন করার অনুমতি দেবে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে। এইমওয়ে কর্পোরেশনে ৪ ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা ছিল। এগুলো হচ্ছেÑ সিলভার, প্লাটিনাম, গোল্ড ও ডায়মন্ড। প্রস্তাব অনুযায়ী সিলভার অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগতো ২ হাজার ১ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার টাকা কো¤পানির শেয়ার বাবদ অনির্দিষ্টকালের জন্য কেটে রাখা হতো। বাকি ১ হাজার টাকার বাধ্যতামূলকভাবে নি¤œমানের কিছু হারবাল পণ্য কেনার জন্য দিতে হতো। আর ১ টাকা দিতে হতো পরিচয়পত্র বাবদ। একইভাবে গোল্ড অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য লাগতো ৩ হাজার ১০০ টাকা। এক্ষেত্রে কো¤পানির শেয়ার বাবদ নেয়া হতো ২ হাজার টাকা। বাকি টাকার পণ্য। প্লাটিনাম অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য লাগতো ৮ হাজার ১০০ টাকা। এর জন্য শেয়ার বাবদ কাটা হতো ৩ হাজার টাকা। ডায়মন্ড অ্যাকাউন্ট খুলতে দিতে হতো ৫ হাজার ১০০ টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার টাকা কাটা হতো কো¤পানির শেয়ার বাবদ। বাকি টাকার নি¤œমানের পণ্য গছানো হতো। অ্যাকাউন্টভেদে ৫ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা রাখা যেতো। সিলভার অ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা দৈনিক ৪০ হাজার, গোল্ডেন অ্যাকাউন্ট ৯০ হাজার, প্লাটিনাম অ্যাকাউন্ট ১ লাখ ৮ হাজার ও ডায়মন্ড অ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা দৈনিক ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারবেনÑ এমন অবিশ্বাস্য লোভনীয় প্রস্তাব তাদের। ডেসটিনির বরিশাল অঞ্চলের প্রধান মোহাম্মদ মাসুদ রানা ছিলেন এইমওয়ে কর্পোরেশনের এমডি। এখন রয়েল রানা একই পদ্ধতিতে ‘এক্সিলেন্ট ওর্য়াল্ড নাম দিয়ে প্রতারণার ব্যবসা করছে প্রকাশ্যে।
এর সঙ্গে চিত্রনায়ক রুবেল, আমিন খান, অমিত হাসান, নীরব, জায়েদ খান, সিদ্দিকসহ অনেকেই সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন।

এইমওয়ের ফাঁদে চলচ্চিত্র তারকারা
এমএলএম ব্যবসায় কোনো নীতিমালা না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো অলিগলিতে গজিয়ে উঠছে এমএলএম কোম্পানি। এইমওয়ে হারবাল পণ্য ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করলেও পণ্যটা মূলত লতা হারবাল নামক একটি হারবাল কোম্পানির পণ্য। শুধুমাত্র এইমওয়ে কোম্পানির লোগোসম্বলিত কিছু ব্যাগে এগুলো ভরে সরবরাহ করা হতো। নানা প্রলোভনে জনগণকে ফাঁদে ফেলতো তারা। তাদের প্রতারণার নতুন ভাবনায় সংযোজিত হয়েছিল চলচ্চিত্রের কিছু বেকার ও লোভী শিল্পী। চলচ্চিত্র শিল্পীদের ব্যবহার করে তারা প্রতারণা শুরু করেছিল। এক সময়ের জনপ্রিয় নায়ক রুবেল, অমিত হাসানকে এ কোম্পানির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে এইমওয়ের বিভিন্ন কনফারেন্সে রুবেল, অমিত হাসান, ইমন, নীরবসহ চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখদের দিয়ে উপস্থাপনা করানো হতো। ওইসব বেকার শিল্পীরা এইমওয়ের গুণকীর্তন করতেন সামান্য টাকার বিনিময়ে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ জনগণ যারা এইমওয়ের কনফারেন্সে আসতেন তাদের মাঝে এইমওয়ে সম্পর্কে একটা পজিটিভ ধারণা জন্ম নিত।
প্রিয় নায়ক যখন বলেছেন তা তো মিথ্যা হতে পারে না’ এ ধারণা নিয়েই বাড়িতে চলে যেত। পরবর্তীতে গচ্ছিত টাকা-পয়সা এনে জমা করতো এইমওয়ের অ্যাকাউন্টে। বিনিময়ে কয়েক ব্যাগ মানহীন হারবাল পণ্যের ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে যেত। হারবাল পণ্যে স্ত্রীর রূপচর্চায় একটু সুবিধা হলেও দ্বিগুণ টাকা ফেরত পাওয়া যেতো না। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু লোকজন এইমওয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় চলচ্চিত্রের দুয়েকজন দালালের মাধ্যমে এইমওয়েতে বিভিন্ন প্রলোভনে লোক যোগদান করিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিল। চলচ্চিত্রের অবস্থা নাজুক হওয়ায় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ একটু ভালো থাকার আশায় যোগদান করছিল এইমওয়েতে ।
অথচ ভালো থাকার আশায় কখন যে প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে সে নিজেও জানে না। চলচ্চিত্রের সাইনবোর্ড লাগিয়ে এ ধরনের প্রতারণামূলক ব্যবসা কারো মঙ্গল বয়ে আনে না। এ ধরনের কার্যক্রমে চলচ্চিত্র তারকারা সম্পৃক্ত হওয়ায় তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে যেমনটি হয়েছিল ডেসটিনির দালাল হওয়া নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের বেলায়।

এইমওয়ে’র এমডি গ্রেফতার
মূল নায়ক চরমোনাই পীরের পুত্র

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ‘এইমওয়ে’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মূল নায়ক মাসুদ রানাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। গভীর রাতে পল্টন থানা পুলিশের একটি দল তাকে রমনা থানার টঙ্গি ডাইভারশন সড়ক থেকে গ্রেফতার করে। মাসুদ রানা এ সময় অস্ট্রেলিয়া পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরে রওনা হয়েছিলেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রোদোয়ান বিন ইসহাককে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়।
ডেসটিনির সাবেক পরিচালক মাসুদ রানা এবং চরমোনাই পীর সাহেবের দ্বিতীয় ঘরের পুত্র সৈয়দ রোদোয়ান বিন ইসহাক ডেসটিনি ছেড়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নতুন প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে ২০১২ সালের প্রথম দিকে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানির (এমএলএম) ‘এইমওয়ে’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুরু করেন। ‘টাকা জমা রাখলেই ৬ মাসে দিগুণ’ এমন লোভনীয় প্রচারণা চালিয়ে মাত্র ৮ মাসেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ৫০/১, পুরানা পল্টনের একটি ভবনের ৫তলা মিলিয়ে বিশাল আকারের কার্যালয়টি দেখে অনেকেই জীবনের সর্বশেষ আয়ের অর্থ জমা রেখেছিলেন মাত্র ৬ মাসে দিগুণের আশায়।
ডেসটিনির অনিয়ম আর দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি শুরু হলে এইমওয়ে’র সকল কর্মকর্তা গা ঢাকা দেন। প্রায় ১ মাসেরও অধিক সময় ধরে পালিয়ে থাকায় টাকা জমা দেয়া বেশ কয়েকজন পল্টন থানায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও এমডিসহ সকল পরিচালকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেন। এরপর পল্টনের কার্যালয়ে এইমওয়ে’র কোনও কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। এক সময় প্রতিষ্ঠানটিতে তালা লাগিয়ে কেটে পড়েন সকল কর্মকর্তা। আর তাতেই টাকা জমা দেয়া গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
পুলিশ জানায়, গত ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে হালিমা বেগম ও ইদ্রিস আলী নামে দুই ব্যক্তি বাদী হয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ এনে আলাদাভাবে পল্টন থানায় দুটি মামলা (৩১ ও ৩২) দায়ের করেন। ৩১ নম্বর মামলায় চেয়রম্যান ও এমডিসহ ১৬ জন এবং ৩২ নম্বর মামলায় চেয়রম্যান ও এমডিসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলাগুলোর অন্যতম আসামী ছিলেন বর্তমান এ´িলেন্ট ওয়ার্ল্ড- এর রয়েল রানা ও একরামুল হক ভুয়া।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পল্টন থানায় সর্বশেষ এ মামলা দুটি দায়েরের পর ‘এইমওয়ে’র এমডি মাসুদ রানা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কয়েকদিন আগেই মালয়েশিয়ার একটি বিমানের টিকেট ক্রয় করেন। রাত ১২টার দিকে রমনা এলাকা থেকে বেরিয়ে বিমান বন্দরের উদ্দেশে টঙ্গি ডাইভারশন রোড থেকে বিমান বন্দরের দিকে যাওয়ার সময় পল্টন থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সারোয়ারের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকধারী পুলিশ তার গাড়ির গতি রোধ করে। এ সময় মাসুদ রানা গাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড় দেয়। পুলিশও তার পিছু নেয়। প্রায় অর্ধ কিলোমিটার দৌড়ে পুলিশ তাকে জাপটে ধরে। এছাড়া চিত্র নায়ক রুবেল ও অমিত হাসান এ অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণা মামলার আসামি বলে পুলিশ জানায়।

চরমোনাই পীরের ছেলে গ্রেফতার
রাজধানীর বাড্ডায় কুয়েতি মসজিদ এলাকা থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার মামলায় রেদওয়ান বিন ইসহাককে (৪২) গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। রেদওয়ান এমএলএম কোম্পানি এইমওয়ে করপোরেশন লিমিটেডের মালিক ও চরমোনাই পীর মরহুম মাওলানা ফজলুল করিমের ছেলে। রাত আড়াইটায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। বাড্ডা থানার তৎকালীন ওসি ইকবাল হোসেন জানান, বাড্ডা কুয়েতি মসজিদ এলাকায় কয়েকজন টাকা পেতেন বলে রেদওয়ানকে মারধর করে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে রাত সাড়ে ৮টায় বাড্ডা থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে পল্টন থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পল্টন থানার পরিদর্শক আলমগীর ভূঞা জানান, রেদওয়ানের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় সাত-আটটি অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণা মামলা রয়েছে। তাকে উদ্ধারের পর বাড্ডা থানা পুলিশ পল্টন থানায় যোগাযোগ করলে রাত আড়াইটার দিকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরও জানান, এইমওয়ে কোম্পানির অধীনে এমএলএম ব্যবসা রয়েছে। পল্টন থানা সূত্র জানায়, ৫ জুলাই পল্টন থানায় আবদুস সাত্তার নামে এক ব্যক্তি সোয়া ২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এমএলএম কোম্পানি এইমওয়ে করপোরেশনের মালিক রেদওয়ানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ওষুধ আইনে এমএলএম ও হকারি করে ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও কিছু ইউনানি-আয়ুর্বেদ কোম্পানি এমএলএম সিস্টেমে ও হকারি করে ফুটপাতে ওষুধ বিক্রি করে। এমনকি ফুটপাতে ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রেতার কাছেও ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ বিশেষ করে যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে।

একই কায়দায় ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’
এইমওয়ের মামলার আসামী হয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পর তিন বছর আগে রানা ও একরাম ঢাকায় এসে মুগদা এলাকায় ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ নাম দিয়ে এইমওয়ের কায়দায় এমএলএম কোম্পানী খোলে প্রতারণার ব্যবসায়
লিপ্ত হয়ে এখন শত কোটি টাকার মালিক। এইমওয়ের কায়দায় তৈরি করেছেন ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ গ্রুপ। এই গ্রুপে রয়েছে অসংখ্য নাম সর্বস্ব কোস্পানী। এগুলোর মধ্যে এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড ফুড এ- কসমেটিক্স, ‘এক্সিলেন্ট ফার্মাসিটিক্যাল এ- ইউনানী ল্যাবরেটরী, এক্সিলেন্ট টিভি, এক্সিলেন্ট টাচ ক্রিয়েশন (মিডিয়া হাউজের সাইনবোর্ডে গোপন প্রমোদকেন্দ্র), ইআরটিসি- এক্সিলেন্ট রিসার্চ এ- ট্রেনিং সেন্টার, উইন-উইন (সার্ভিস প্রোভাইডার), পিআর হোল্ডিং এ- ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিঃ, ম্যান ফর ম্যান ফাউ-েশন, রয়েল এইড স্কুল এ- কলেজ ইত্যাদি। তাছাড়া কেরানীগঞ্জ এলাকায় বানিয়েছে একটি আলীশান রেস্টহাউস, সেই রেস্ট চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। রানা ও একরামের অপকর্মের ফিরিস্তি এক সংখ্যায় লিখে শেষ করা সম্ভব নয়।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...