Thursday, January 27, 2022

ইয়াহিয়ার জীবনে জেনারেল কুইন আকলিমা ও নুরজাহান কাহিনি


আব্দুল বারী: জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের পতিত সামরিক শাসক। তার দাম্পত্য জীবন না থাকলেও ছিলো জৌলুসে ভরা যৌনজীবন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি পাঁচশ’রও বেশি সুন্দরী নারীর সাথে বিকৃত যৌন শখ চরিতার্থ করেছেন।
তার শাসনামলে এমন কোন শীর্ষ সামরিক কিংবা বেসামরিক কর্মকর্তার এমন কোন বেগম ছিলেন না যার ভিতর ও বাহিরের ম্যাপ তার অচেনা ছিলো। একাজে তিনি যে জোর খাটিয়েছেন তা নয়। বেগমদের সাহেবরা প্রমোশন ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কোন বিশেষ সুবিধার জন্য কখনো সুন্দরী স্ত্রী কখনো বান্ধবীকে ইয়াহিয়া খানের মদের আসরে উপঢৌকন দিতেন। এই আসরে আমন্ত্রণ পেতে তারা জেনারেল কুইন নামে ব্যাপক পরিচিত ইয়াহিয়ার বিশ্বস্ত বান্ধবী আকলিমা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করতেন।
প্রেসিডেন্টের মদের আসরে যাওয়া বেগমদের সবাই তার বেডরুম পর্যন্ত যেতে পারতেন না। কাদের বেডরুমে নেওয়া হবে তা ঠিক করতেন প্রেসিডেন্ট স্বয়ং। এরপর আকলিমা আক্তার বাছাই করা সুন্দরীদের ব্রিফিং দিয়ে পোষাক পরিচ্ছদ ঠিক করে দিতেন। তারা কিভাবে ইয়াহিয়া খানের সাথে এনজয় করবেন সেটার রিহার্সেলও তিনি দিতেন। এরপর সে বা তারা যেতেন ইয়াহিয়া খানের শয়ন কক্ষে। যারা শয়ন কক্ষে যেতো তাদের হাতে ধরা দিত সিন্দাবাদের দৈত্য। সেই রাতে সে যা চাইতো তাই পেত। বিনিময়ে প্রেসিডেন্টকে দিতে হতো শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রবেশের অবাধ ভিসা।
১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বিকার করে পাকিস্তান। ২০ ডিসেম্বর এই ব্যর্থতার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত হন ইয়াহিয়া খান্। নয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেন।
এরপর তিনি ইয়াহিয়া খানকে কারাগারে পাঠান। তার বান্ধবী আকলিমা আক্তারকে গৃহবন্দী করেন। ইয়াহিয়া খানের অনিয়ম দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচার তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেন। ইতিহাসে এটা হামদুর রহমান কমিশন নামে পরিচিত। এই কমিশনের গোপন রিপোর্টে বর্ণিত নানা তথ্য নিয়ে পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে পতিত সামরিক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের যৌন জীবনের নানা উপাখ্যান। যেমনটি জেনারেল এরশাদের পতনের পর হয়েছিলো ঠিক সেভাবেই মার্কেট পেয়েছিলো জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাহিনীগুলো।
সেই কমিশনের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় ২০০১ সালে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিলো, সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান যে কেবল প্রকাশ্যে নারীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন তা নয়। দিনের বেশির ভাগ সময় মদ্যপ অবস্থায় থাকতেন। প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেও তিনি মদ পান করতেন।
ওই রিপোর্টে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং আকলিমা আক্তার (জেনারেল রাণীখ্যাত) এর প্রেমেরে নানা ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়। সেই বর্ণনায় বলা হয়, আকলিমা আকতার তার বিশ্বস্ত বান্ধবী ছিলেন। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খানের সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন এমন ৫০০ জন সুন্দরী নারীর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এদের মধ্যে তৎকালীন পাকিস্তানের আইজিপি পতœী বেগম শামীম, এ এন হোসেন, বেগম জুনাগাদ, নূরজাহান বেগম, আকলিমা আক্তার রাণী, করাচির ব্যবসায়ী মনসুর হিরজির স্ত্রী, নাজলি বেগম, ঢাকার শিল্পপতি লিলিখান, ঢাকার আরেক সুন্দরী ধনকুবের লায়লা মুজাম্মিল, অভিনেত্রী শবনম, অভিনেত্রী সাগুফতা, নাগিমা, তারানা এবং আরো অন্যান্যরা ছিলেন।
এছাড়াও উচ্চ পর্যায়ের বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তা তাদের সুন্দরী বান্ধবী বা স্ত্রীদের নিয়ে প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও রংমহলে যেতেন। তারা সেখানে মদ্য পান করতেন আর স্ত্রী কিংবা বান্ধবীকে উপটোকন হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামনে উপস্থাপন করতেন। ডিনারের পর প্রেসিডেন্ট এক বা একাধিক সুন্দরীকে রেখে অন্যদের বিদেয় করতেন। যেই নারী ওই রাতের সৌভাগ্যবতী হতে পারতেন তার ভাগ্য বদলে যেত। যারা স্ত্রীকে নিয়ে হাজির হতেন তাদের মিলতো প্রোমোশন কিংবা বিশেষ কোন সুবিধা। জেনারেল নাসিম, হামিদ, লতিফ, খুদাদ, শাহিদ, ইয়াকুব, রিয়াজ, পরীজাদা, মিঞা এবং আরো অনেকের স্ত্রীরা ছিলেন ইয়াহিয়ার আসরের নিয়মিত অতিথি।
ইয়াহিয়া খানের সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও আলোড়িত নারী আকলিমা আক্তার পেয়েছিলেন জেনারেল কুইন খেতাব। এই কুইনই ইয়াহিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের গায়িকা নূরজাহারকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর নূরজাহানই হয়ে উঠেছিলেন ইয়াহিয়ার জিন্দেগীকি রানী।
কুদা কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যখন জীবন বাঁচাতে মরিয়া তখন তিনি মানসিক চাপে বিষন্ন থাকতেন। বিষন্নতা কমাতে তিনি শিল্পী নূরজাহানকে নিয়ে লাহোরের গর্ভনর হাউজে রাত কাটাতেন। নূরজাহান নানা রঙ ও ঢংয়ে দিনে ৩/৪ বার নিজেকে ইয়াহিয়া খানের সামনে উপস্থাপন করতেন। এ প্রসঙ্গে জেনারেল রাণী (কুইন) খ্যাত আকলিমা আক্তার আইজি প্রিজন হাফিজ কাশিমকে বলেন, জেলারেল ইয়াহিয়া নূরজাহানের নগ্ন শরীরে মদ ঢেলে তা চেটে চেটে খেয়ে খুব তৃপ্তি পেতেন।
আকলিমা আক্তার জানিয়েছিলেন, নূরজাহান এর কাছে পাকিস্তানি ট্যাক্স ডিপার্টেমেন্ট কয়েক হাজার রুপি ট্যাক্স দাবি করে। সেই ট্যাক্স না দেওয়ার সুযোগ নিতে আকলিমার সাথে তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছিলেন। এরপর আর ইয়াহিয়ার সঙ্গ ছাড়তে পারেননি নূরজাহান।

কে ছিলেন এই জেনারেল কুইন আকলিমা আক্তার: ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালের শেষ পর্যন্ত আকলিমা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের উপর প্রভাব বিস্তারকারীদের মধ্যে ছিলো শীর্ষে। এই জন্য তাকে ‘জেনারেল কুইন’ উপাধি দিয়ে পাকিস্থানের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা রিপোর্ট করেছিলো। পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক আমলা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা ইয়াহিয়া খানের করুণা লাভের আশায় আকলিমার দুয়ারে ধর্ণা দিতেন।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, আকলিমা আক্তার রানী পাকিস্তানের গুজরাট শহরে স্বচ্ছল এবং রক্ষণশীল এক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। দিগুণ বয়সী এক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে তার বিয়ে হয়। পারিবারিক রক্ষণশীলতার কারনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পর্দানশীন। তিনি ছয় সন্তানের জননী হওয়ার পরও বেপর্দা চলাফেরা করতেন না। কোনো এক বিকালে তিনি স্বামীর সঙ্গে মুরি পর্বতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। স্বামীর হাত ধরে হাটছিলেন। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিলো আকলিমার মুখের পর্দার একটি অংশ। পর্দার সেই অংশ তিনি আর ধরলেন না। পুলিশ স্বামী তাকে শরীরের পর্দা ঠিক করার কথা বললেন। আকলিমা তাতে গুরুত্ব দিলেন না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে একটা থাপ্পড় দিলেন স্বামী। এরপর আকলিমা আরো বেপরোয়া হয়ে বোরকা খুলে ছুড়ে দিলেন স্বামীর মুখে।
এই ঘটনা অনেক বড় হয়ে দু‘জনকে আলাদা করে দিল। ছয় সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিষয়টি মিমাংশা করার পরামর্শশ দিলেন আকলিমার বাবা মা। সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে স্বামীর সংসার ছেড়ে কর্পদকহীন অবস্থায় অজানায় রওয়ানা হলেন আকলিমা।
কর্মের দিশা পেতে তিনি বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবের আড্ডায় যাওয়া শুরু করলেন। সখ্যতা হলো অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে। তাদের একেক জনের কাঁধে সওয়ার হয়ে তিনি করাচী, রাওয়ালপিন্ডি আর লাহোরের নাইট ক্লাব গুলোতে হয়ে উঠলেন পরিচিত মুখ। সেখান থেকে অনেক রাজনীতিক সেনাকর্মকর্তা এবং ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের সাথে জমলো আড্ডা। যাদের দাম্পত্যে আগুন জ্বলতো আ্কলিমা তাদের টার্গেট করতো। তাদের জন্য ‘ড্যান্স পার্টির’ আয়োজন করতে করতে বনে গেলেন মাসি।
সাহেবদের মনোরঞ্জনের জন্য অর্থাভাবে জর্জরিত, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সুন্দরী তরুণীদের নিয়ে আসতো। নতুন আমদানীতে বাড়লো রঙমহলের পরিধি। তাদের জায়গা সংকুলানের জন্য রাওয়ালপিন্ডির একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে তৈরী অভিজাতদের জন্য তৈরী করলেন সিক্রেট রেড জোন। ১৯৬৭ সালের কোন একদিন এই জোনে আড্ডা দিতে এলেন পাকিস্তানের ভবিষ্যত একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন আকলিমা। আকলিমার সেবায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আদর করে আকলিম বলে ডাকা শুরু করলেন। এরপর হলো প্রেম। বাড়লো বিশ্বস্ততা। বিয়ে না করেই তারা হয়ে গেলেন স্বামী-স্ত্রী।
১৯৬৯ সালে আন্দোলনের মুখে জেনারেল আইয়ুব খান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়ে পদত্যাগ করলেন। ইয়াহিয়া খান বনে গেলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। আর আকলিমা হলেন ‘জেনারেল রানী’। এই নারী নবাব সিরাজের আলেয়ার মতো ইয়াহিয়া খানকে নীতিগত ও রাজনৈতিক পরামর্শ দিতেন। সাংবাদিকরা বলেছেন ‘যৌবনে পুলিশের ঘরে প্রশিক্ষণ পাওয়া আকলিম রাজনৈতিক বিষয়ে ইয়াহিয়ার চেয়ে বেশি দক্ষ ছিলেন। এই জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আমলা এবং সেনাবাহিনীর জেনারেলরা তার কাছে আসতেন। তারা আকলিমকে টাকা দিয়ে পার্টির আয়োজন করতেন। তাকে দিয়ে বিভিন্ন তদবীর করতেন।’
জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, আমলা এবং রাজনৈতিক নেতাদের যারা আইয়ুব খান এবং ইয়াহিয়ার সরকারকে সমর্থন করেছিল তাদের গ্রেফতার করলেও আকলিমকে জেলে না পাঠিয়ে গৃহবন্দী রেখে সুসম্পর্কের নৈতিক অনৈতিক সুবিধা ভোগ করতেন। আকলিম ১৯৭২-৭৭ পর্যন্ত গৃহবন্দি ছিলেন। বিখ্যাত আইনজীবী এস এম জাফর মামলায় লড়ে তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন।
১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে সেনা অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা দখলের পর আকলিমা অবশেষে গৃহবন্দি দশা থেকে মুক্ত হলো। কিন্তু এরই মধ্যে অর্থবৈভবের বেশিভাগই হারিয়ে ফেলেছেন আকলিমা।
আবারো কর্মফলশূন্য অবস্থায় তিনি।
জানা যায় ১৯৮০’র দশকের শুরুতে কেউ একজন তাকে মাদক ব্যবসার প্রতি উৎসাহী করেন। পরে তিনি মাদক চোরাচালানের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটেন। কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় তিনি জেল থেকে মুক্ত হন এবং জিয়ার শাসনামলের শেষের দিকে ১৯৮৮ সালে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোও বাতিল করে দেয়া হয়। যদিও এরই মধ্যে তার সব ছেলে মেয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন এবং যার যার মতো জীবনযাপন করছিলেন। তবে আকলিম হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ, একাকী জীবনের হতাশ এক যাত্রী। ছেলেমেয়েদের আপত্তির কারণে মিডিয়া অথবা সরকারের বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলাও ছিল নিষেধ। তিনি বন্ধুদের ত্যাগ করলেন। যদিও এটা ছিল শূন্যতা, একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতায় ভরা। জীবনের শেষ পর্যায়ে মরনব্যাধি ক্যান্সার বাসা বাঁধে তার শরীরে।
২০০২ সালে ৭০ বছর বয়সে নীরবে নিভৃতে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান রহস্যময়ী আকলিসমা।
আকলিমা এবং ইয়াহিয়ার গভীর প্রনয়ের গল্প সে সময় পাকিস্তান, লন্ডনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম এ প্রকাশিত হতো নিয়মিত। জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনামলে তিনি সংবাদ মাধ্যমের তোপের মুখে পড়েন। বিশেষ করে পাকিস্তান পিপলস পার্টির মুখপাত্র উর্দু দৈনিক মুসাওয়াত এর। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ইয়াহিয়ার সঙ্গে তাকেও অভিযুক্ত করা হয়। জুলফিকার আলী ভট্টোকে সরিয়ে ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতায় আসেন। অবশেষে আকলিম এর কঠিন অবস্থার অবসান হয়।
আকলিম আক্তার মাদক ব্যবসায় জড়িত হওয়ার অভিযোগে আবারো সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হতে শুরু করলেন। যদিও অন্যান্য মামলার মতো এ মামলাগুলোতেও তিনি নির্দোষ প্রমানিত হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন অনেক সেনাকর্মকর্তা আর আমলাদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে জেনারেল রানী বা আকলিমার নাম উঠে এসেছে। তার চরিত্র নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যবসা সফল পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র। ‘মাদাম রানী’ নামে এ চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রে অভিনয় করেন পাঞ্জাবের সুপারহিট অভিনেত্রী আঞ্জুমান।

পাকি শীর্ষ সেনাকর্মকর্তাদের লুচ্চামির অধ্যায়ের উন্মোচন

(বিচারপতি হামদূর রহমান কমিশনের রিপোর্টের আংশিক অনুবাদ এবং প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্যানুসন্ধান)
৭১’এর শোচনীয় পরাজয় এবং ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর জনগণের চাপে তৎকালীন পাকিস্তানের সরকার পূর্বপাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত এবং সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামদূর রহমান কে প্রধান করে এই পরাজয়ের পিছনের রাজনৈতিক এবং সামরিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করার জন্যে তিন সদস্যবিশিষ্ঠ এক কমিশন গঠন করে “হামদূর রহমান কমিশন” নাম দিয়ে। এই কমিশনের অন্য দুই সদস্য ছিলেন পাঞ্জাব হাই কোর্টের বিচারপতি শেখ আনওয়ার-উল-হক এবং সিন্ধ হাই কোর্টের বিচারপতি তোফায়েল আলি আবদুল রেহমান। এদের সাথে কমিশনের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আলতাফ কাদির। কমিশন দুই বছরের কিছু বেশি সময় নিয়ে রিপোর্ট তৈরী এবং দাখিল করলেও তৎকালীন এবং পরবর্তী সামরিক ও বেসামরিক সরকারগুলো স্পর্শকাতরতার বিচার করে এই রিপোর্ট লোকচক্ষুর আড়ালেই রেখে দেয়। এটা সহজেই অনুমেয় যে যার নির্দেশে এই কমিশন গঠিত হয় সেই জুলফিকার আলী ভুট্টোকেও এই কমিশন রিপোর্টে ছেড়ে কথা বলেনি। তাছাড়া কমিশন যাদের অপকর্ম এই রিপোর্টে তুলে ধরে তাদের মধ্যে ইয়াহিয়া খান ১৯৮০ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং তার বশংবদ জেনারেলদের অধিকাংশই ২০০০ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। সুতরাং এই দল মূলত তাদের প্রভাব খাটিয়ে রিপোর্টটাকে অপ্রকাশিতই রেখে দেয়। এই রিপোর্টের অংশবিশেষ ২০০০ সালের অগাষ্ট মাসে ইনডিয়া টুডে পত্রিকা ফাঁস করে দেয়। এবং এর পরের দিন পাকিস্তানের ডন পত্রিকাও একটা সাপ্লিমেন্ট ছেড়ে দেয়। ইনডিয়া টুডের রিপোর্ট প্রকাশের পরপরই বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের কাছে এই রিপোর্টের কপি চেয়ে পাঠায়।
রিপোর্ট জেনারেল আইয়ুব খানকে সরাসরি লুচ্চামি এবং মাতলামির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। রিপোর্ট বলছে, “যেখানে শাস্তিপ্রদান আবশ্যক, দ্রুত এবং যথাযথ পদক্ষেপ কেবলমাত্র জাতির এই দাবী পুরনই করবে না বরঞ্চ ৭১ এ তাদের দ্বারা সংঘটিত সব লজ্জাষ্কর আচরণের পুনরাবৃত্তির বিপক্ষে ব্যবস্থাগ্রহণ নিশ্চিত করবে।”

কমিশনের রিকমেন্ডেশনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো-
নিম্নবর্ণিত সেনাকর্মকতাদের মুহাম্মদ আইউব খানের কাছ থেকে জোরপূর্বক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রকাশ্য বিচারের সন্মূখীন করা হোক (প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে)-
১। জেনারেল ইয়াহিয়া খান,
২। জেনারেল আবদুল হামিদ খান,
৩। লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসজিএমএম পীরজাদা,
৪। লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান,
৫। মেজর জেনারেল উমর, এবং
৬। মেজর জেনারেল মিট্ঠা।

নিম্নবর্ণিত ৫ জন জেনারেল এবং ৩ জন প্রিগেডিয়ারকে ইচ্ছাকৃত কর্তব্যে গাফিলতির কারণে বিচারের সন্মূখীন করা হোক-
১। জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী,
২। জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ,
৩। জেনারেল এম রহিম খান,
৪। জেনারেল ইরশাদ আহমেদ খান,
৫। জেনারেল বি এম মুস্তাফা,
৬। ব্রিগেডিয়ার জি এম বাকির সিদ্দিকী,
৭। ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়াত, এবং
৮। ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজী।
জেনারেল নিয়াজির ছেলে আমানুল্লাহ নিয়াজী অবশ্য বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তার পিতার অপকর্মকে আড়াল করার জন্যে অন্যদের উপর দোষ চাপিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
ক. পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাসসৃষ্টিকারী সমস্ত কর্মকান্ডের হোতা জেনারেল রাওফরমান আলি এবং জেনারেল টিক্কা খান।
খ. পরবর্তীতে যখন জেনারেল নিয়াজী দায়িত্বে আসলেন, তখন লুঠতরাজের সাথে সংশ্লিষ্ঠ সকলের বিপক্ষে তিনি ‘কোর্ট-অব-ইনকোয়্যারি’ গঠন করলেন এবং তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন কোর্ট মার্শালে নেওয়ার জন্যে।
গ. কমিশনের রিপোর্টের একটা ছোট অংশ মাত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং ভুট্টো সমস্ত রিপোর্টের তথ্যবিকৃতি ঘটিয়েছেন।
ঘ. কমিশনের টার্মস অব রেফারেন্স যারা তৈরী করেছিলেন সেই ভুট্টো, গুল হোসেন এবং টিক্কা খান, এই তিনজনই মূলত পাকিস্তান ভাঙার পিছনে দায়ী।
ঙ. আসলে এটা ছিলো ক্ষমতার লড়াই। বন্দুকের ক্ষমতার জোরেই ভু্ট্েটা এবং ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের সাথে ক্ষমতা বন্টন প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং যতক্ষণ না আমরা রাষ্ট্রীয়পর্যায়ের বৃহদায়তনে সমস্যাটা দেখছি, আমরা সত্যি ঘটনাটা জানতে পারছি না।
চ. (ভাবানুবাদ) কমান্ডার হিসেবে আমার পিতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। কিন্তু আপনি যখন ইনডিয়া বা শত্রুর বিপক্ষে লড়াই করবেন, তখন হত্যা অনিবার্য। ধর্ষণ ও অন্যান্য যে ধ্বংষযজ্ঞ হয়েছে তা বানোয়াট। আর যেটুকু হয়েছে তা বাঙালিরা নিজেরাই করেছে।
ছ. অডিও এ্যাড করতে পারলাম না ফরম্যাটে সাপোর্ট করছেনা বলে। তবে এখানে অডিওটা পাওয়া যাবে।
কমিশন ৭১এ পরাজয়ের পিছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সেনাকর্মকর্তাদের পেশাগত অদক্ষতাকে, সেনা-নৌ-বিমানবাহিনীসমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এবং সেনা হাইকমান্ডের নৈতিক অবক্ষয়কে। সেখানে সামরিক পরিকল্পনা আশাহতকর ত্রুটিপূর্ণ ছিলো এবং ঢাকাকে প্রথম থেকেই শত্রুর আকষ্মিক এবং ব্যাপক আক্রমন থেকে মুক্ত রাখার কোনওরকম সমন্বিত প্রয়াস ছিলো না। সামরিক বৈশিষ্ট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কমিশন জ্যোষ্ঠ সেনাকর্মকর্তাদের দোষী সাব্যাস্ত করে বলেছেন যে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে এদের ‘কর্তব্যে চরম গাফিলতি’ এবং ‘প্রতিরক্ষাবুহ্য ফেলে এদের কেউ কেউ লজ্জাজনকভাবে পালিয়ে যাওয়ার দোষে দোষী, যেখানে তাদের প্রতিরোধ করার দায়িত্ব ছিলো’। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রধান জেনারেল নিয়াজী এবং তার উপাধিনায়ক তাদের স্বভাবজাত গাফিলতির জন্যে নিদারূনভাবে নিন্দিত হয়েছেন।
এবার একটু ফিরে যাই শিরোনামে। রিপোর্টের সবথেকে স্পর্শকাতর অংশ ছিলো জ্যোষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের নৈতিক অবক্ষয়। যখন পাকিস্তান ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে, “অভিজাত সেনারা তখন লুচ্চামিতে ব্যস্ত”। রিপোর্ট খুঁজে বের করেছে যে ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের প্রবর্তিত সামরিক আইনের সময়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালেই এদের এই নৈতিক অবক্ষয়ের ব্যাপারটা দেখা যায়। পরে ১৯৬৯ সালের ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের আমলে এসে এদের সেই বদভ্যাস আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং আরও ঘনীভূত হয়। জমি, বাড়িঘর ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিপুল অবৈধ সম্পদ অধিগ্রহণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অনৈতক জীবনযাপনের যে অভিযোগ জ্যোষ্ঠ সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শোনা যেতো, কমিশন তারও সত্যতা খুজে পায়। এই বিষয়গুলো তাদের পেশাদারী দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলীকে ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছিলো।
জেনারেল ইয়াহিয়ার ডেপুটি চিফ জেনারেল হামিদ সম্পর্কে কমিশন বলেছে, “এটা জাতির জন্যে চরম দুঃখজনক যে তিনি জেনালের ইয়াহিয়ার লুচ্চামি অভিযানের নিয়মিত সঙ্গী ছিলেন”। তারা দুজনে নিয়মিত জেনারেল ইয়াহিয়ার রাওয়ালপিন্ডির হার্লে ষ্ট্রিটের বাড়িতে গোপনে ঢুকে যেতেন তাদের বান্ধবীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজী সম্পর্কে কমিশন বলেছে যে তিনি শিয়ালকোট এবং লাহোরে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে অপরাধী এবং চোরাকারবারীদের কাছে থেকে লাখ লাখ রূপী কামিয়েছিলেন তাদের কেসগুলো মার্শাল ল কোর্ট থেকে নিষ্পত্তি করে দেওয়ার বিনিময়ে। তিনি লাহোরের নারী সাঈদা বোখারীর সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ঠ ছিলেন যিনি গুলবাগে সিনেরিটা হোম নাম দিয়ে একটা ব্রথেল পরিচালনা করতেন। তার এই ব্রথেলে আলাদা আলাদা কামরায় সুন্দরী যুবতীরা থাকতেন। আরও একজন নারী, শিয়ালকোটের শামিম ফিরদৌস, যিনিও একই ধরনের ব্যবসা করতেন, তিনিও জেনারেল নিয়াজির ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কমিশন বলেছে যে সাঈদা নিয়মিত পূর্ব পাকিস্তানে এসেও নিয়াজীর সাথে মিলিত হতেন। এটা শহরের সবাই জানতো যে নিয়াজী গভীর রাতে খুবই উচ্ছল এবং মজাদার সময় কাটাতেন। তিনি ধানমন্ডির কিছু বাঙলোতে নিয়মিত যাতায়ত করতেন। এমনকি রমজান মাসেও জেনারেল নিয়াজী এবং তার অন্যান্য কমান্ডারদের জন্যে নৃত্যশিল্পী আনা হতো। “নিয়াজী ওইসব নৃত্যশিল্পীদের আস্তানায় যেতেন তার তিন তারকা খচিত এবং পতাকাবিশিষ্ঠ গাড়িতে এবং সমস্ত সামরিক সাজপোষাক সহকারে”, কমিশন বলেছে।
লেখক: আব্দল বারী, সিনিয়র সাংবাদিক

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...