Tuesday, December 7, 2021

ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক- সিলেটের কিনব্রিজ

-মিলু কাশেম : পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কিছু কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে যার নাম শোনার সাথে সাথে চোখের সামনে ভাসে সেই শহরের ছবি যেখানে সেই স্থাপনার অবস্থান। সেইসব স্থাপনাকে সেই শহরের প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়।
যেমন আইফেল টাওয়ার। আইফেল এর নাম শুনলেই চোখে ভাসে প্যারিস নগরী আর সিন নদী। টাওয়ার ব্রিজের কথা মনে হলেই চোখে ভাসে লন্ডন সিটি আর টেমস নদী। তাজমহল এর নাম শুনলেই মনে পড়ে আগ্রা শহর আর যমুনা নদীর কথা।চার্লস ব্রিজ এর ছবি দেখলে বা নাম শুনলে চোখে ভাসে বিশ্ব ঐতিহ্য প্রাগ নগরী আর ভ্লাতুভা নদীর ছবি। চেইন ব্রিজেরর নাম শুনলে বা ছবি দেখলে চোখে ভাসে বুদাপেস্ট আর দানিয়ুব নদীর দৃশ্য। তেমনি আমাদেও শহর সিলেটের ও রয়েছে সে রকমের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক আর স্থাপনা। আর সেটা হলো সুরমা নদীর উপর স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী কিনব্রিজ। কিনব্রিজ এর ছবি দেখলে বা নাম শুনলে বাংলাদেশের মানুষের চোখে ভাসে পূণ্যভূমি সিলেটের ছবি। কিনব্রিজের অবস্থান সিলেট শহরের দক্ষিন প্রান্তে সুরমা নদীর উপর। লোহা দিয়ে তৈরী ধনুকের ছিলার মতো বাঁকানো সেতু এই কিনব্রিজ। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন আসাম প্রদেশের গভর্নর মাইকেল কিন এর সিলেট সফর উপলক্ষে তৎকালীন আসাম সরকারের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্ত সি আই ই এবং আসামের শিক্ষামন্ত্রি আবদুল হামিদের প্রচেষ্টায় ১৯৩৩ সালে ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৩৬ সালে কাজ শেষে ব্রিজটি চালু হয়। গভর্ণর মাইকেল কিন এর নামানুসারে ব্রিজটির নাম করন করা হয়। কিনব্রিজের দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট আর প্রস্থ ১৮ ফুট।ব্রিজটির পুরো অবকাটামো লোহা দিয়ে তৈরী।
তখনকার আমলে কিনব্রিজ তৈরীতে ব্যায় হয়েছিল ৫৬ লাখ টাকা।
কিনব্রিজ চালু হওয়ার পর ব্রিজ পারাপারের জন্য জন্য প্রতিবার জন প্রতি ১ পয়সা হারে টোল আদায় করা হতো। যানবাহনের জন্যও ছিল বিভিন্ন হারে টোল আদায়ের বিধান। গবাদি পশু পারাপারে ও দিতে হতো টোল। অবশ্য ৪ বছর পর ১৯৪০ সালে টোল প্রথা বাতিল হয়ে যায়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার পাক বাহিনী ডিনামাইট দিয়ে কিনব্রিজের উত্তর পাড়ের একাংশ উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর কাঠ ও বেইলী পার্টস দিয়ে বিধ্বস্ত অংশটি মেরামত করে হালকা যানবাহন ও পথচারীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহযোগীতায় বিধ্বস্ত অংশ টুকু কংক্রিট দিয়ে পুনর্নিমান করা হয়। এর পর কয়েক বছর পূর্বে এম সাইফুর রহমান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রি থাকা কিনব্রিজে কিছু সংস্কার কাজ করা হয়। তখন ব্রিজকে দৃষ্টি নন্দন করতে ব্রিজের দুই দিকের প্রবেশ মুখে দুইটি বৃহৎ আকারের তোরণ নির্মাণ করা হয়। এতে কিনব্রিজের মুল কাটামো কিছুটা পরিবর্তন হয়ে যায়। সংস্কার ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্রিজ টির কাটামো দূর্বল হয়ে পড়ে। তাই অনেক দিন থেকে ভারী যানবাহন চলাচল করতে পারে না। পথচারী এবং হালকা যানবাহন চলে। ২০১৯ সালে আগস্ট মাসে ঐতিহ্যের এই সেতু সংরক্ষণ করতে যান চলাচল বন্ধ করা হয়। কিনব্রিজকে ঘিরে বিকল্প পরিকল্পনা করেছিলো সিলেট সিটি কর্পোরেশন। ঝুকিপূর্ন এই সেতু দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে পদচারি সেতুতে পরিনত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেই উদ্যোগের অংশ হিসাবে সেতুর দুই মুখে লোহার বেস্টনি লাগিয়ে বন্ধ করা হয় যান চলাচল। কিন্ত দক্ষিণ সুরমা বাসীর আপত্তির মুখে সেই উদ্যোগ সফল হয় নি। লোহার বেস্টনি ভেঙে ফেলা হয়। এখন আবার নড়বড়ে ব্রিজ দিয়ে পদচারির সাথে যানবাহন চলাচল করছে। বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক এই ব্রিজটি সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্যোগ নিলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে নড়বড়ে ঝুকিপূর্ন হয়ে পড়েছে ব্রিজটি। সম্প্রতি কিনব্রিজ সংস্কারের একটি নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। অচিরেই সড়ক জনপথ বিভাগের নিয়ন্ত্রনাধীন ব্রিজটি সংস্কার করবে রেলওয়ে বিভাগ। তারপর হয়ত ব্রিজটি আরো আকর্ষনীয় হবে। ঐতিহাসিক তথ্যমতে গত শতকের ৩০ এর দশকে আসাম প্রদেশের গভর্নর মাইকেল কিন এর সিলেট সফরকে স্মরনীয় করে রাখতে এই ব্রিজ নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৩৩ সালে। ১৯৩৬ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে জন সাধারনের চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। মাইকেল কিন ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের গভর্ণর ছিলেন।আর সিলেট ছিল আসামে একটি জেলা শহর।
একটি সেতু এভাবেই একটি অঞ্চলকে চিহ্নিত করে রেখেছে প্রায় ৮৫ বছর ধরে। কিনব্রিজ সিলেট অঞ্চলের দীর্ঘতম নদী সুরমার উপর নির্মিত প্রথম সেতু। ঐতিহ্যের গৌরব আর গরিমায় যা আজও ঠিকে আছে এ অঞ্চলের প্রতীক হিসাবে। তাই কিনব্রিজ আজ সিলেটবাসীর ভালোবাসার অহংকার।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021

Rajpath Bichitra E-Paper 28/09/2021