Wednesday, August 4, 2021

ইতিহাসের পাতা থেকে : সিলেট যেভাবে বাংলার হলো


মিলু কাশেম :
বৃহত্তর ভারতের সিলেট অঞ্চলে রাজা বাদশা তথা মোগল আমলের অবসান হলে সিলেট অঞ্চলকে ঢাকা ডিভিশনের সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে আসাম সরকারের ব্যয়ভার বেশি হয়ে পড়লে আসাম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে যায়, তাই আসাম সরকারের ব্যয় সংকুলানের জন্য সম্পদশালী সিলেট অঞ্চলকে ১৮৭৪ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আসামের সাথে জুড়ে  দিলে সিলেটবাসী প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।উত্তাল হয়ে উঠে সিলেট।  তখন গভর্ণর জেনারেল ছিলেন নর্থব্রুক।  পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি এলেন সিলেটে। তাকে অভ্যর্থনার জন্য সিলেটের চাঁদনীঘাটে সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়, যা আজো সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে টিকে আছে। ১৮৭৬ সালে আসাম ডিভিশনের সিলেট জেলাকে চারটি সাব ডিভিশনের ঘোষণা দেয়া হয়। ১৮৭৭ সালে সুনামগঞ্জ, ১৮৭৮ সালে করিমগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সাব ডিভিশন খোলা হয়। সদর সাব ডিভিশনের আয়তন বড় হয়ে যাওয়ায় ১৮৮২ সালে দক্ষিণ শ্রীহট্ট বা মৌলভীবাজার সাব ডিভিশন চালু হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশ গঠিত হলে সিলেট আসাম থেকে পৃথক হয়ে পূর্ববঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯১২ সালে আবারো পূর্ববঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সিলেট আসাম প্রদেশের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সিলেট আসামের সাথে যুক্ত থেকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখলেও আসামের কট্টরপন্থী কংগ্রেস সরকার সিলেটের সাধারণ নিরীহ মুসলমানদের উপর নানামূখী নির্যাতন চালাতো। বিভিন্ন নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হয়ে সিলেটের আলেম সমাজ তথা সাধারণ মুসলমানগণ কংগ্রেস সরকারের জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে তারই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি গঠনের লক্ষ্যে সিলেটের মুসলিম সমাজ তৎপর হয়ে উঠেন। কিন্তু ভারত বিভক্তির ক্রান্তিলগ্নে আসাম প্রদেশেভুক্ত সিলেটে জমিয়তে উলামার একটি দল পাকিস্থানভূক্তির বিরোধী ছিলো। এ কারণে সিলেটবাসীর মতামত যাচাই করার জন্য গণভোটের (Referendum) আয়োজন করা হয়। সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মিঃ ডামব্রেকের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত গণভোটে গণভোট কমিশনারের দায়িত্ব দেয়া হয় মিঃ এইচ. এ. স্টর্ককে। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সোম ও মঙ্গলবার গণভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়।
চারদিক থেকে উভয় পক্ষে প্রচার-প্রচারণা জমজমাট হয়ে উঠে। পাকিস্থানের প্রতীক কুড়াল আর বিরোধী পক্ষের প্রতীক ঘর। সিলেটের সর্বত্রই “আসামে থাকবো না, গুলি খেয়ে মরবো না”, “কংগ্রেস সরকার জুলুম করে, নামাজেতে গুলি করে”, “ভূতের ঘরে কুড়াল মারো” প্রভৃতি স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হতে থাকে। সিলেটের সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে পাকিস্থানের পক্ষে মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। এখানে উল্লেখ্য যে গণভোটের কিছু দিন আগে ১৯৪৭ সালের ২৪শে এপ্রিল সিলেটে থানা প্রাঙ্গনে বৃটিশ পতাকা নামিয়ে পাকিস্থানের পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে আলকাস আলী নামক একজন পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে তার শহীদ হওয়ার ঘটনাটি পাকিস্থানের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে গণভোটে ব্যপক প্রভাব ফেলে।এই শহীদ আলকাছের নামানুসারে জিন্দাবাজার এলাকাকে শহীদ আলকাছ রোড হিসাবে নামকরন করা হয়।


গণভোটের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। রাত পোহালেই ভোট।সবাই যখন ভোরের আলোর প্রতিক্ষায় ঠিক তখনি প্রকৃতির মেজাজ বিগড়ে গেলো। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো। কিন্তু না, মাঝে মাঝে প্রকৃতিও হার মেনে যায়, সূর্য্যের আলো ফোটার সাথে সাথে কাদা-জল মাড়িয়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পিচ্ছিল পথে নর-নারী সাধারণ মানুষেরা ছুটলো ভোট কেন্দ্রে, ভোট দিতে। খুবই শান্তিপুর্ণ ভাবেই নির্ধারিত টানা দুই দিন ভোট গ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষিত হলো।
 ফলাফলে পাকিস্থানের পক্ষে ভোট পড়েছে ২,৩৯,৬২৯টি আর বিরোধী পক্ষে ১,৮৪,০৪১টি। ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথে সিলেট সদর, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, করিমগঞ্জ  ও কাছাড় জেলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মহকুমা হাইলাকান্দির বিস্তির্ণ জনপদসহ সর্বত্রই শুরু হয় জয়ধ্বনির সাথে আনন্দ উল্লাস। কিন্তু সিলেটবাসীর জন্য এই আনন্দ স্থায়ী হলেও করিমগঞ্জ তথা করিমগঞ্জ মহকুমার পাথারকান্দি, রাতাবাড়ি, বদরপুরসহ অনেক এলাকাই সীমানা কমিশনার রেডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী পাকিস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। ইতিহাস ও অখন্ড ঐতিহ্যের অধিকারী সিলেটবাসী মনের মাঝে চাপা যন্ত্রণা নিয়েও আসাম প্রদেশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্নে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের সাথে মিশে যায়।তার পরের ইতিহাস আমাদের জানা।ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্থান রূপান্তরিত হয় বাংলাদেশ রাস্ট্রে।আর এখন আমাদের সিলেটবাংলাদেশের অন্যতম বিভাগ।আর সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমার পাথারকান্দি রাতাবাড়ি বদরপুর সহ অনেক এলাকা ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। রাজনৈতিক ভাবে বিভাজন সৃষ্টি হলেও এই অঞ্চলের মানুষের সাথে রয়ে গেছে আমাদের ভাষা সাংস্কৃতিক ধর্মীয় আত্মীয়তার সেতু বন্ধন। যা অনন্তকাল থাকবে।

Related Articles

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে: সৈয়দ টিটু

আনিসুজ্জামান খোকন :নিজস্ব প্রতিবেদক: কিশোরগঞ্জে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,...

দীপিকার পায়জামা খুলে যাওয়ার রহস্য ফাঁস

কয়েক মাস বিরতির পর আবারও নেটমাধ্যমে ফিরেছেন বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোন। ফিরেই ইনস্টাগ্রামে নতুন একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভৌতিক কায়দায় সেই ভিডিওতে মুগ্ধ নেটাগরিকরা।...

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে জয়যাত্রা টিভি

আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও এফবিসিআই-এর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপি টিভির অফিসে অভিযানে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র‍্যাব। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই)...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে: সৈয়দ টিটু

আনিসুজ্জামান খোকন :নিজস্ব প্রতিবেদক: কিশোরগঞ্জে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অবদানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,...

দীপিকার পায়জামা খুলে যাওয়ার রহস্য ফাঁস

কয়েক মাস বিরতির পর আবারও নেটমাধ্যমে ফিরেছেন বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোন। ফিরেই ইনস্টাগ্রামে নতুন একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভৌতিক কায়দায় সেই ভিডিওতে মুগ্ধ নেটাগরিকরা।...

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে জয়যাত্রা টিভি

আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও এফবিসিআই-এর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপি টিভির অফিসে অভিযানে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র‍্যাব। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই)...

হেলেনা আক্তার থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীর

বিভিন্ন সময় নানা ভাবে আলোচনা-সমালোচনায় আসা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) দিবাগত রাতে গুলশানের নিজ বাসা থেকে আটক করে র‌্যাব। কখনও ব্যবসায়িক আবার কখনও...

আটকের পর রহস্যজনক হাসি হেলেনার

আওয়ামী লীগের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামসর্বস্ব সংগঠন ‘চাকরিজীবী লীগ’ নিয়ে আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও এফবিসিআই’র পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গুলশানের বাসায় থেকে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে।...