Monday, September 20, 2021

আমি ডাক্তার দেখেছি : পর্ব-১

রাজা সিরাজ,
হ্যা আমি ডাক্তার দেখেছি। দেশের ডাক্তার যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি বিদেশি ডাক্তারও। কসাই ডাক্তার যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি মানবতার সেবক ডাক্তার। দেখেছি প্রতারক ডাক্তার, আবার দেখেছি গরীবের ডাক্তার। দেখেছি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় লিপ্ত লোভী ও ব্যবসায়ী ডাক্তার, তার বিপরীতে দেখেছি রোগীর কাছ থেকে ফি না নিয়ে নিজের টাকায় রোগীকে ঔষধ কিনে দেয়া ডাক্তারও। সর্বশেষ দেখলাম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদেরকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানানো সরকারি হাসপাতালের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ডাক্তার, প্রাইভেট চেম্বার ও ক্লিনিক/ হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পালিয়ে থাকা ডাক্তার এবং দেখলাম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের আর্šÍজাতিক মানসম্পন্ন সেবা দান ও বিনয়ী আচরণ করা ডাক্তারও।
ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর খবর প্রায়ই শোনা যায়। শোনা যায় মৃতকে আইসিইউতে ভর্তি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেবার কাহিনী। এছাড়া প্রতারণার কাহিনী তো আছেই, সেই সাথে আছে ভুয়া ডাক্তার ও ভুয়া ডিগ্রী ব্যবহারের কাহিনীও। তবে দেশে অধিকাংশ মানুষ ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে এবং সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অন্য কারো কাহিনী নয়, নিজের স্ত্রীর কাহিনী দিয়েই শুরু করছি লেখাটা।
২০০০ সালের ঘটনা। মাসের নাম মনে নেই। বিকালে অফিসে বসে কাজ করছি- এসময় বাড়িওয়ালীর টেলিফোন ‘আপনার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, তাড়াতাড়ি বাসায় আসুন।’ সম্পাদকের কাছ (তখন আমি একটি পাক্ষিক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক) থেকে ছুটি নিয়ে বেবিট্যাক্সিতে (তখন সিএনজিচালিত অটোরিকসা ছিল না।) চড়ে দ্রুত বাসায় গিয়ে দেখলাম পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছে বেচারী। ছেলেরা জানাল ‘ব্যথানাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু ব্যথা কমছে না।’ ইউসুফ শরীফ ভাইর সেদিন ছিল ‘ডে-অফ, বাসায়ই ছিলেন তিনি, বললেন ‘ধানম-ির বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।’ তাই করলাম। বেবিট্যাক্সিতে চড়ে দ্রুত হাজির হলাম ধানমন্ডির সেই হাসপাতালে। ৫০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে নিয়ে গেলাম জরুরী বিভাগে। রাতের বেলা-তাই সিনিয়র কোন ডাক্তার ছিল না। একজন ইন্টার্নী ডাক্তার রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দিতে বলে একটা ইনজেকশন লিখে দিলেন। ইনজেকশন রোগীর শরীরে পুশ করার পর আধা ঘন্টা পার হলো কিন্তু ব্যথা কমলো না। ডাক্তার এবার বললেন ‘একটা এক্স-রে করতে হবে।’ জরুরী ভিত্তিতে এক্স-রে করানো হলো। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বলল ‘তার গলব্লডারে পাথর হয়েছে, অপারেশন করতে হবে।’ আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলার পর তিনি বললেন ‘এখনতো সীট খালি নেই, পরে আসতে হবে। এখন একটা আলট্রাসনোগ্রাম করতে হবে। আমাদের এখানে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন নেই, ল্যাবএইডে যেতে হবে।’ ল্যাবএইড-এ আলট্রাসনোগ্রাম করার পর ডাক্তার বললেন ‘গলব্লাডারে পাথর নেই, পাথর যেটাকে বলেছে সেটা আসলে ব্লাউজের বোতাম, তবে গলব্লাডারে ইনফেকশন আছে।’ তিনি রোগীকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিলেন। রাত তখন সাড়ে ৯টা। ব্যথায় কাতরানো রোগীকে নিয়ে গেলাম হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। জরুরী বিভাগের ডাক্তার প্যাথেডিন ইনজেকশন নিয়ে আসতে লিখে দিলেন। গেলাম ফার্মেসীতে। দোকানী বলল ‘১৫০ টাকা দেন, এনে দিতে হবে।’ এত দাম কেন ? জানতে চাইলে দোকানী বলল ‘এটা ব্লাকে কিনতে হয়, তাই এত দাম। আশেপাশে আর কোন দোকানে পাবেন না।’ আমি তখন কথা না বাড়িয়ে ১২টাকা মূল্যের ইনজেকশন ১৫০ টাকায় কিনে নিলাম। ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করে রোগীকে প্রফেসর ডা.জিয়াউল হকের অধীনে ভর্তি করে দিলেন। ওয়ার্ডে নেবার পর রোগীকে স্যালাইন দেয়া হলো। আমি সারারাত রোগীর পাশে বসে রইলাম, রোগী ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন ডা. জিয়াউল হক এলেন। রোগী দেখে আরো কিছু পরীক্ষা দিলেন। তরও পরদিন রিপোর্টগুলো দেখে বললেন ‘গলব্লাডারে পাথর নেই, ইনফেকশন আছে। এটা ঔষধের মাধ্যমেই ভাল হয়ে যাবে। আর দুইদিন হাসপাতালে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে।’ পাঁচদিন পর রোগী পুরোপুরি সুস্থ হলে বাসায় নিয়ে গেলাম। তিনি কিছু ঔষধ লিখে দিলেন। সেগুলো একমাস খেতে বললেন এবং কোন সমস্যা হলে হাসপাতালের বর্হিবিভাগে তাকে দেখাতে বললেন। এক সপ্তাহ পর সকালবেলা, আমি অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রচ- ব্যথা শুরু হলো রোগীর। অফিসে যাওয়া বাদ দিয়ে রোগী নিয়ে গেলাম হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের বর্হিবিভাগে। ডা. জিয়াউল হক তখন রোগী দেখছিলেন। ১৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে গেলাম তার কাছে। আমার আগেই অপেক্ষায় ছিলেন বেশ কয়েকজন রোগী। আমার রোগীর অবস্থা দেখে সবাই আমাকে সুযোগ দিলেন। জিয়াউল হক রোগীর অবস্থা দেখে রোগীকে ডা. কানিজ মওলার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কানিজ মওলা রোগীকে ভর্তি করতে বললেন এবং ইনজেকশন লিখে দিলেন। তিনদিন রোগী কানিজ মওলার অধীনে ছিল, এরপর জিয়াউল হক আবার চিকিৎসা শুরু করলেন। এক সপ্তাহ পর রোগী সুস্থ হলে তাকে ছুটি দেয়া হলো। কিন্তু জিয়াউল হক ধানম-ির (কলাবাগান) এলকার ‘সেভ লাইফ’ নামক ক্লিনিক থেকে একটা আলট্রসনোগ্রাম করিয়ে তার সাথে হাসপাতালের আউটডোরে দেখা করতে বললেন। দুইদিন বিশ্রাম নেবার পর গেলাম সেভ লাইফে। একজন মহিলা ডাক্তার কিছুক্ষণ দেখে বললেন ‘আজ ওনার পেটে গ্যাস বেশি, কিছু দেখা যাচ্ছে না।’ এক প্রকার ট্যাবলেটের নাম লিখে দিয়ে বললেন ‘রাতে শুইবার সময় ২টি ট্যাবলেট খাওয়াবেন এবং খালি পেটে আগামীকাল সকালে নিয়ে আসবেন।’ পরদিন সকালে আলট্রসনোগ্রাম করে রিপোর্ট নিয়ে হাজির হলাম ডা. জিয়াউল হকের দরবারে। রিপোর্ট দেখে তিনি বললেন ‘পাথর নেই, তবে গলব্লাডারটা একটু বড় হয়ে গেছে এবং তেরা-বাঁকা হয়ে গেছে, সমস্যা নেই, ঔষধ লিখে দিচ্ছি ঠিকমত খাওয়াবেন, ব্যথা ওঠলে ওমিপ্রাজল ৪০ মি.গ্রাম খাওয়াবেন। তৈল-চর্বিযুক্ত খাবার খাবেন না।’ এভাবেই চলতে থাকল জীবন। অবস্থা এমন হলো যে, দুইবেলা খেতে হয় ওমিপ্রাজল। আর একটু পোলাও-মাংস খেলেতো রক্ষাই নেই, একেবারে বিছানায়।
এক বন্ধু বললেন ডা. মবিন খানকে দেখাতে। টেলিফোন নম্বরও দিলেন। টেলিফোনে সিরিয়াল দিয়ে এক সন্ধ্যায় হাজির হলাম খান সাহেবের চেম্বারে। একজন জুনিয়র ডাক্তার রোগের পুরো ইতিহাস একটি খাতায় লিখলেন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর ডাক পড়ল ডাক্তার সাহেবের কক্ষে। দু’জনে গিয়ে বসলাম তার সামনে। তিনি খাতায় লেখা ইতিহাসের দিকে চোখ বুলালেন, রোগীকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই কতগুলো টেষ্ট করাতে বললেন, টেষ্টগুলো কোথায় করতে হবে তাও লিখে দিলেন এবং পরদিন ভোরে এসে এন্ডোসকপি করতে বললেন। সময় দিলেন মাত্র ২মিনিট, কোন কথা বলার সুযোগ দিলেন না। পরদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠে রওনা দিলাম ধানমন্ডির দিকে। তালতলা গিয়ে বেবিট্যাক্সি নষ্ট হয়ে গেল। আবার অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বেবিট্যাক্সি ধরে হাজির হলাম খান সাহেবের চেম্বারে। তিনি নিজেই এন্ডোসকপি করলেন। এন্ডোসকপি করার পর চলে গেলাম অন্যান্য পরীক্ষা করতে। খালি পেটে রক্ত দিয়ে নাস্তা করতে গেলাম। ২ঘন্টা পর আবার রক্ত ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি পরীক্ষার জন্য দিয়ে চলে যেতে হলো ফার্মগেট। কারণ আলট্রাসনোগ্রামের জন্য তিনি আনন্দ সিনেমার উল্টো পাশে একজনের কাছে পাঠিয়েছেন নাম ‘সিদ্দিকী আলট্রসনোগ্রাম।’ সেখানে গিয়ে জানলাম তিনি আসেন বিকাল ৫টায়। মার্কেটের দোতালায় সাঁটার লাগানো দোকানের মত একটি কামড়া। আশেপাশে রয়েছে ডাক্তারের চেম্বার, চশমা ও ঔষধের দোকান। পাশের দোকানদার জানালেন ‘ওনি বিকাল ৫টার আগে আসেন না।’ তখন সময় বেলা ১১টা। কি আর করবো, বিভিন্ন মার্কেট ও পার্ক ঘুরে সাড়ে ৪টায় আবার এলাম। তখনও দোকান বন্ধ। পৌণে ৫টার দিকে একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে সাঁটার খুললেন। একটি কামড়ার মাঝখানে পার্টিশন দিয়ে দুইভাগ করা হয়েছে, সামনে ছোট্ট একটা টেবিল, টেবিলের সামনে একটি লম্বা টোল পাতা আছে যা-তে সর্বোচ্চ দুইজন বসা যায়। টেবিলের ওই পাশে গিয়ে একটি ছোট চেয়ারে বসল মহিলা। কাগজটা দেখালাম মহিলাকে, তিনি বসতে বলে বললেন ‘স্যার কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে, উত্তরা থেকে আসেনতো, গাড়ি ঘুরাতে দেরি হয়ে যায়।’ স্যারের কক্ষটি তালা দেয়া। প্রায় সাড়ে পাঁচটার দিকে এলেন সিদ্দিকী সাহেব। একটি জীপ গাড়ি নিজেই চালিয়ে এলেন। সাদা জিপ গাড়িটিতে গোলাপী রংয়ের আঁচড় দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে। সিদ্দিকী সাহেব নিজেও পড়েছেন সাদা ও গোলাপী ডোরাকাটা ফুলহাতা গেঞ্জি। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। কক্ষে ঢুকেই আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নিজের কক্ষের তালা খোলে ভিতরে গিয়ে কলিং বেল বাজালেন। মহিলাটি তখন আমাদের নিয়ে ভিতরে গেলেন। আমি কাগজটি তার হাতে দেবার পর আমাকে বাইরে বসতে ইশারা করলেন। ভিতরে রইল ওই মহিলা আর আমার স্ত্রী। আমি বাইরে হাটাহাটি করে সময় কাটাতে লাগলাম। এক ঘন্টা কেটে গেল কেউই কক্ষ থেকে বের হচ্ছে না। অগত্যা দরজায় টোকা দিলাম। মহিলাটি দরজা খোলে ‘আর কয়েক মিনিট বসেন, হয়ে গেছে।’ বলে আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন। প্রায় পনের মিনিট পরে মুখে একটা বিরক্তি ভাব নিয়ে বেরিয়ে এলো আমার স্ত্রী, পেছনে রিপোর্ট হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো সেই মহিলা। আলট্রসনোগ্রামের টাকা দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে এলাম। স্ত্রী বিরক্তি সহকারে বলল ‘চল বাসায় চল, আমার আর চিকিৎসার দরকার নেই।’
: কি হয়েছে বল, আমি ধরি শালাকে।’ বললাম আমি।
: আরে তেমন কিছু না, বদমাইশ বেডা! খালি উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে, উল্টাপাল্টা পরামর্শ দেয়। এসব করেই এক ঘন্টা কাটিয়েছে। তুমি দরজায় টোকা না দিলে আরো দেরি করতো। সবশেষে বলেছে গলব্লাডার কখনও নষ্ট হয় না, আপনার কোন সমস্যা নাই, টেনশন করবেন না।’ পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম সিদ্দিকী হচ্ছেন মবিন খানের বন্ধু। কোন মহিলার আলট্রসনোগ্রাম প্রয়োজন হলে তার কাছে পাঠিয়ে দেন খান সাহেব। আর সিদ্দিকী সাহেব মহিলার সাথে গল্প করে এবং সুড়সুড়িমূলক যৌন আলোচনা করে সময়টা কাটান। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন আর কোন রোগী ছিল না তার।
পরদিন সব রিপোর্ট নিয়ে সন্ধ্যায় মবিন খানের চেম্বারে গেলাম। সব রিপোর্ট দেখে তিনি ঔষধ লিখে দিলে একজন সহকারী আমাদেরকে পাশের কক্ষে নিয়ে গেলেন এবং ব্যবস্থাপত্র বুঝিয়ে দিলেন। এবারও সময় ৩মিনিট, কোন কথা বলার সুযোগ পেলাম না (কথা বলতে চাইলে সহকারীরা ইশারা দিয়ে থামিয়ে দিলেন- ভাবটা এরকম ‘যেন তিনি জ্যোতিষ এবং সবজান্তা।)’ তিনটি ঔষধ লিখেছেন তিনি ১। কৃমির ট্যাবলেট (বেন-এ) ৪টি, ১টি করে ৪দিন রাতে ঘুমানোর আগে খেতে হবে, ভিটামিন বি-কমúেøক্স (অপসোভিট) প্রতিদিন ১টি করে একমাস ও ওমিপ্রাজল-২০মি.গ্রা. (প্রোসেপটিন) ক্যাপসুল খাবার আধঘন্টা আগে প্রতিদিন সকালে ও রাতে খেতে বললেন। আমি তাকে বললাম রোগী তো বর্তমানে ওমিপ্রাজল-৪০ মি.গ্রা. খায়। উত্তরে সহকারী বললেন ‘একমাস পরে আবার যখন আসবেন তখন বলবেন, কোন সমস্যা হলে সিরিয়াল ছাড়াই নিয়ে আসবেন।’
বাসায় ফেরার পথে ঔষধ কিনে নিলাম। ৪দিন কৃমির ঔষধ খাবার ফলে রোগী আরো কাহিল হয়ে পড়ল, ওমিপ্রাজল-২০ মি.গ্রা. খাওয়াতে গ্যাস বেড়ে যাওয়ায় আবারো ওমিপ্রাজল-৪০ মি.গ্রা. খাওয়া শুরু করল রোগী। মবিন খানের চিকিৎসার এখানেই ইতি ঘটলো, মাঝখান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডাক্তারের ফি মিলিয়ে আমার পকেট থেকে চলে গেল ১৪ হাজারেরও অধিক টাকা। বোনাস হিসেবে পেলাম সিদ্দিকী নামক একজন বিকৃত রুচির ডাক্তারের সন্ধান।
এভাবে খেয়ে না খেয়ে, ব্যথা বেদনায় কেটে গেল কয়েক বছর। ২০১১ সালের কোন একদিন বৃষ্টি হলো, বাসায় ভুনা খিচুড়ি পাকানো হলো গরুর মাংস দিয়ে। খিচুড়ি খেয়ে রওনা দিলাম অফিসে। অর্ধেক রাস্তা যেতেই বড় ছেলের ফোন ‘আম্মুর ভীষণ পেটব্যথা।’ বুঝলাম তিনি খিচুড়ির লোভ সামলাতে পারেননি। ফোন দিলাম ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটুকে (তিনি তখন আমার পারিবারিক চিকিৎসক ও উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান। মানবতার সেবক-গরীবের ডাক্তার অকাল প্রয়াত লিটু সম্পর্কে বিশেষ লেখা থাকবে শেষ পর্বে।) লিটু একটি ইনজেকশন পুশ করতে বললেন। ছেলেকে ইনজেকশনের নাম বলার পর বাসার পাশের ফার্মেসী থেকে লোক এনে ইনজেকশন পুশ করার পর ব্যথা কমে গেল। পরদিন সকালে আবার ব্যথা, আবারো ফোন দিলাম লিটুকে। লিটু বললেন ‘উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসুন।’ ১০০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেখানোর পর এখানেও ইনজেকশন পুশ করা হলো কিন্তু ব্যথা কমলো না। কর্তব্যরত ডাক্তারের কথায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর তিনি জানালেন ‘গলব্লাডারে পাথর আছে, অপারেশন করতে হবে।’ কাগজ নিয়ে চলে গেলাম লিটুর চেম্বারে। লিটু ফোন দিলেন প্রফেসর ডা. ফিরোজ কাদেরকে, রিপোর্টের বিস্তারিত জানার পর রোগীকে ভর্তি করতে বললেন তিনি। রোগী ভর্তি হলো, ফিরোজ কাদের বললেন ‘ব্যথা না কমলে অপারেশন করা যাবে না।’ ব্যথা কমতে এবং অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে ৩দিন লেগে গেল। এসময়ের মধ্যে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হলো। চতুর্থ দিন সকালে ফিরোজ কাদের তার ডা. রোকনকে নিয়ে অপারেশন সম্পন্ন করলেন। ডা. রোকন অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে বললেন ‘আপনার স্ত্রীর গলব্লাডারটা অনেক বড় হয়ে গিয়ে পাথরের ভারে নিচে নেমে গিয়েছিল, আর কিছুদিন হলে ফেটে যেতো এবং তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যেতো। আমাদের অনেক ভুগিয়েছে, বিল বাড়িয়ে করতে হবে।’
আরো তিনদিন পর রোগী বাসায় নেয়া হলো। খরচ হলো ৪৫ হাজার টাকা। ২দিন পর ব্যান্ডেজ খুলে দিলেন, আরো ২দিন পর সেলাই কেটে দিলেন। এক সপ্তাহ পর সেলাইয়ের এক স্থানে ইনফেকশন দেখা দিলে আবার নিয়ে গেলাম। ডা. রোকন ইনফেকশনের স্থানটি পরিস্কার করে বললেন ‘ওখানে একটা চুল ঢুকে গিয়েছিল তাই এরকম হয়েছে, ঔষধ লিখে দিচ্ছি, ঠিক হয়ে যাবে।’ ইনফেকশন শুকিয়ে গেল ঠিকই কিন্তু একমাস পেরিয়ে গেলেও অপারেশনের স্থানটিতে অস্বস্তি লাগা ও হাল্কা ব্যথা কমছিল না। আবার গেলাম ডা. রোকনের কাছে। তিনি ৩০০টাকা দিয়ে টিকেট কেটে ফিরোজ সাহেবকে দেখাতে বললেন। ফিরোজ কাদের সাহেব রোগীর বর্ণনা শোনে ট্যানাক্সিট ট্যাবলেট একমাস, পেন্টোনিক্স-২০ মি. গ্রা. ট্যাবলেট প্রতিদিন ২বার আজীবন ও ব্যথা হলে টুডল ট্যাবলেট খেতে লিখে দিলেন এবং বললেন ‘ওনার অপারেশনটা অনেক বড়, এসব ক্ষেত্রে পুরো ঠিক হতে এক থেকে দুই বছরও লেগে যায়, ভয়ের কিছু নেই। তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার একদম খাবেন না।
আবারো ট্যাবলেটের উপর দিয়ে ব্যথা-বেদনা সয়ে খেয়ে না খেয়ে কেটে গেল ৯বছর। মাঝখানে কয়েকবার নামী-দামী ডাক্তার দেখানো হলো, ল্যাবএইডসহ অনেক নামী-দামী ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রামসহ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হাজার হাজার টাকা খরচ করা হলো কিন্তু জটিল কোন রোগ ধরা পড়ল না। ২০২০ সাল অর্থাৎ এবছরের শুরু থেকেই গলব্লাডারের স্থানটিতে প্রতিদিন ব্যথা শুরু হয় আর ব্যথানাশক ট্যাবলেট খেয়ে তা থামানো হয়। বললাম ‘চল ডাক্তর দেখাই।’ তার এক উত্তর ‘এভাবেই মরবো, ডাক্তারকে আর টাকা খাওয়াবো না।’ কয়েকবার ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ডাক্তারের সিরিয়াল দিয়েও তাকে নিয়ে যেতে পারলাম না। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারী তারিখে (আমি নিজেও তখন মিরপুরস্থ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালেই ভর্তি) অসম্ভব রকম ব্যথা ওঠল তার, ট্যাবলেটেও ব্যথা কমে না। অবস্থা বেগতিক দেখে ডাক্তার দেখাতে রাজি হলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ডা. ব্রি: জে: হাফিজুর রহমানকে দেখালাম। তিনি নিজেই রোগীর এন্ডোসকপি করলেন এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম করার নির্দেশ দিলেন। রিপোর্ট দেখে তিনি বললেন ‘রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ, তাড়াতাড়ি ভর্তি করুন। তার গলব্লাডার এবং লিভারে পাথর আছে, ইনফেকশন হয়ে পুঁজ বেরুচ্ছে।’ তিনি সিটি স্ক্যান ও এমআরসিপি করতে নির্দেশ দিলেন। ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় ১৪ ফেব্রুয়ারী আমার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে আমাকে ছেলেরা মিরপুর ১১ এর ডেল্টা হেলথকেয়ার হসপিটালের আসিইউতে নিয়ে যায়, সাথে তাদের মা’কেও নিয়ে যায়। পরদিন তাকে ডেল্টা হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সহকারী অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান (এলাকার সবচেয়ে বড় সার্জন বলে কথিত) তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন এবং পপুলার থেকে পরীক্ষাগুলো করাতে বলেন। ১৪ হাজার টাকা দিয়ে পপুলার থেকে পেটের সিটি স্ক্যান ও এমআরসিপি করানো হয় আর ১১ হাজার টাকায় ডেল্টা হাসপাতালে অন্যান্য পরীক্ষা করানো হয়। আর ২দিনে ডা. আতিয়ারের কনসালটেশন ফি ধরা হয় ১১ হাজার টাকা। এছাড়া সিট ভাড়া, ঔষধ ও অন্যান্য সেবার জন্য প্রতিদিন দিতে হচ্ছে ১০ হাজারেরও বেশি টাকা। সব রিপোর্ট দেখে ডা. আতিয়ার বললেন ‘রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন, আগের অপারেশনের সময় গলব্লাডারের কিছু অংশ এবং কিছু পাথর রয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে পাথর ছিটকে পড়েছে লিভারে, ফলে লিভারে ইনফেকশন হয়ে পুঁজ বেরুচ্ছে, একইভাবে গলব্লাডারের ইনফেকশন থেকে পুঁজ বের হচ্ছে। আমি ডা. ফিরোজ কাদের সাহেবকে চিনি। ওনি খুব ভাল ডাক্তার। আমার বিশ্বাস ওনি নিজে অপারেশনটা করেননি। এখন ছোটখাট কোন ডাক্তার এই অপারেশন করতে সাহস পাবেনা। তবে আমি করবো। আমার সাথে আরো ৪জন ডাক্তার ও ২জন নার্স থাকবে। সারাদিনে আর কোন অপারেশন করা যাবে না, অতএব দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি খরচ হবে।’
অবস্থা বেগতিক দেখে এবং ডা. আতিয়ারের কথা-বার্তায় হতাশ হয়ে আমার মেঝ ছেলে বাপ্পী কাগজপত্র নিয়ে চলে গেল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে দেখা করল ডা. মোস্তফা আজিজ সুমনের সাথে। তিনি সব রিপোর্ট দেখে রোগীকে আজই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করতে বললেন। সেমতে সেদিনই বিকালে ডেল্টা হাসপাতালের মোটা অংকের বিল পরিশোধ করে রোগীকে নিয়ে যাওয়া হলো কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। পরদিন ডা. সুমন রোগীকে দেখলেন এবং আরো কিছু পরীক্ষা দিলেন। পরীক্ষাগুলো অল্প টাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেই করা হলো। একদিন পর রিপোর্ট দেখে রোগীর ক্যান্সার আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য ধানমন্ডির আনোয়ারা মেডিকেল সার্ভিসে যোগাযোগ করতে বললেন। ক্যান্সার রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর ডা. সুমন রোগীকে ডা. মবিন সাহেবের নিকট রেফার করলেন। মবিন সাহেব আবারো সিটিস্ক্যান করতে রোগীকে পপুলার ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে পাঠালেন এবং একজন ডাক্তারকে ফোন করে বিষয়টা দেখতে বলে দিলেন। নতুন সিটিস্ক্যান রিপোর্ট দেখে ডা. মবিন সাহেব বললেন ‘গলব্লাডার ও লিভারে পাথরের অস্তিত্ব নেই, ভয়াবহ ইনফেকশন কিংবা পুঁজ পড়ে পাকস্থলী নষ্ট হবার কথাটাও সত্য নয়। তবে আগের অপারেশনের স্থানটিতে গলব্লাডারের কিছু অংশ থেকে যাওয়ায় সেখানে টিস্যু বেড়েছে এবং হাল্কা ইনফেকশন হয়েছে। তিনি আরো কয়েকটি পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট দেখে রোগীকে সার্জারী বিভাগে পাঠিয়ে দিলেন। সার্জারী বিভাগে ডাক্তার আশরাফুজ্জামান কাগজপত্র পর্যালোচনা করে নিজেই অপারেশন করবেন বলে জানালেন। বলা বাহুল্য ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু বেঁচে থাকলে আমাকে ভুল চিকিৎসার শিকার হতে হতো না, এত হয়রানী হতে হতো না এবং এত বিপূল অংকের টাকাও (প্রায় তিন লাখ টাকা) নষ্ট হতো না।
এখন দেশের নামী-দামী সেইসব চিকিৎসকদের কাছে আমার স্ত্রীর একটাই প্রশ্ন ‘কি অপরাধ করেছিলাম আমি? ভুল চিকিৎসা করে ২০টি বছর আমাকে কষ্ট দিয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি কেন নিয়ে যাওয়া হলো?’
ডাক্তার সাহেবদের কাছে এর কোন উত্তর আছে কিনা জানি না তবে আমি কোন জবাব দিতে পারিনি।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...