Thursday, January 27, 2022

আনভীরের লালসার শিকার মুনিয়া : তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে পরিবারের অসন্তোষ


রাজধানী গুলশান ফ্ল্যাটে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে পরিবারের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি পুলিশ। গত ৩১ মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও তদন্ত শেষ হয়নি জানিয়ে সময় আবেদন করেছে পুলিশ। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাসান জানান, নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত শেষ না হওয়ায় তারা আদালতে মুনিয়ার মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। পরবর্তী তারিখের জন্য সময় আবেদন করা হয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া বাদী হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলা করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, সায়েম সোবহানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। প্রতিমাসে এক লাখ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে সায়েম সোবহান মুনিয়াকে ওই ফ্ল্যাটে রেখেছিল। আনভীর নিয়মিত ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো করে থাকতেন। মুনিয়ার বোন অভিযোগ করেন, তার বোনকে বিয়ের কথা বলে ওই ফ্ল্যাটে রেখেছিল। একটি ছবি ফেসবুকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সায়েম সোবহান তার বোনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তাদের মনে হচ্ছে, মুনিয়া আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। মামলার পর গত ২৭ এপ্রিল আদালত বসুন্ধরার এমডির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন তৈরি এখনও শেষ হয়নি। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ বলেন, ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার জন্য দেড় থেকে দুমাস সময় লাগতে পারে।’
গত ২৬ এপ্রিল সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় ওই কলেজশিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুই পা বিছানার সঙ্গে লেগে ছিল এবং উভয় হাঁটু কিছুটা বাঁকা অবস্থায় ছিল। ঘটনার পরের দিন তার বোন আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই কলেজশিক্ষার্থীর বোন বলেন, ‘আমরা এখনও হুমকি পাচ্ছি। আমাদের পরিচিত মানুষ ও আত্মীয় স্বজনরাও আমাদেরকে বলছে মামলা নিয়ে না এগোতে।’ দ্য ডেইলি স্টারের কুমিল্লা সংবাদদাতাকে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবারে একজন আমাদেরকে চুপ থাকার শর্তে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।’ তবে কে বা কারা তাকে টাকা নেওয়ার পরিবর্তে চুপ থাকার প্রস্তাব দিয়েছে তা বলতে অপারগতা জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাদের দুজনকেই হুমকি দিয়েছেন (অভিযোগকারী ও তার স্বামী) ব্যাংকের চাকরি থেকে চাকরিচ্যুত করে দেওয়ার। তাদের প্রস্তাব মেনে না নেওয়ায় তারা এখন আমাদেরকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন। আমরা ভয়ে আছি।’ অভিযোগকারীর স্বামী মিজানুর রহমান জানান, তারা আনভীরের বিরুদ্ধে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে চাপের মুখে রয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বসুন্ধরা গ্রুপ মামলাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অজ্ঞাতনামাদের কাছ থেকে হুমকি পেয়ে তারা পহেলা মে কুমিল্লার কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছেন। মিজানুর রহমান বলেন, তিনি গুলশান পুলিশকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানার জন্য ফোন করলে তারা শুধু তাকে এটুকুই জানিয়েছে যে তদন্ত চলছে। তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ আমাদেরকে এটাও বলেছে যে তদন্তের জন্য তারা কুমিল্লা আসবেন।’ গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবুল হাসানের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। পুলিশ এখনও আনভীরকে গ্রেপ্তার কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করতে না পারায় ওই কলেজশিক্ষার্থীর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যরা হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নিহতের বড় বোন বলেন, ‘আমার বোনের সঙ্গে আনভীরের সম্পর্ক ছিল এবং তিনি তাকে বিয়ে করে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২৬ এপ্রিল সকালে আমার বোন আমাকে ফোন করে জানায়, আনভীর তাকে বিয়ে করবে না এবং তিনি তাকে বকাঝকা করেছেন। সে আরও জানায় যে সে বিপদে আছে এবং যেকোনো সময় কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’

তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে পরিবারের অসন্তোষ
‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ মামলার তদন্তে অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজধানীর গুলশানে মৃত কলেজশিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, মামলায় অভিযুক্ত বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েব সোবহান আনভীরকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার এমনকি জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত না করায় তারা হতাশ।
বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীর বড় বোন বলেন, ‘আমার বোন আনভীরের সঙ্গে একটা সম্পর্কের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। আনভীর তাকে বিয়ে করে দেশের বাইরে স্থায়ী হওয়ার কথা দিয়েছিল। ২৬ এপ্রিল সকালে সে (কলেজশিক্ষার্থী) আমাকে ফোন করে বলে যে, আনভীর তাকে বিয়ে করবে না এবং সে তাকে বকাঝকাও করেছে। আমার বোন এ কথাও জানায় যে, সে একটা সমস্যার মধ্যে আছে। যেকোনো মুহূর্তে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
‘আমার বোনের মরদেহ উদ্ধারের পর দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। কিন্তু, পুলিশ এখনো আনভীরের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড সংগ্রহ করেনি’, বলেন আনভীরের বিরুদ্ধে করা মামলার এই বাদী।
মামলার বিবৃতিতে বাদী উল্লেখ করেন, ২৬ এপ্রিল পুলিশ শোবার ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় কলেজশিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে। সে সময় তার পা বিছানা ছুঁয়ে ছিল। হাঁটুগুলো ছিল সামান্য বাঁকানো।
নিহতের বোন জানান, পুলিশ তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাওয়ায় গত বুধবার তিনি ও তার স্বামী ঢাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে তারা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি), একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলেন।
গুলশান থানার ওসি এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এখানেই গত ২৭ এপ্রিল মামলাটি দায়ের করা হয়।
শিক্ষার্থীর বোন বলেন, ‘আমার বোনের আত্মহত্যার পেছনে যে আনভীরের প্ররোচনা আছে, সেই প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে পুলিশ আমাদের নিশ্চিত করেছিল।’ সাক্ষাতে উপস্থিত এডিসি তদন্ত শেষে আনভীরের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার বিষয়ে তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘সাক্ষাৎকালে ওই কর্মকর্তা বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কিছু সমস্যা আছে বলে আমাদের জানান। তিনি (এডিসি) জানান, উপর মহলের অনুমতি ছাড়া তারা আনভীরকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না। যেহেতু ৩০৬ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।’ কলেজশিক্ষার্থীর বোনের ভাষ্য, বোনের মৃত্যুর পর তিনি একটা ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। যে কারণে মামলার এজাহারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ করতে পারেননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘ফুল ফার্নিশড ফ্ল্যাটটি আনভীরই পছন্দ করেছিলেন। তার মানে ফ্ল্যাট বা ভবন কর্তৃপক্ষ তার পরিচিত। ফ্ল্যাটটির ডাইনিং রুম সংলগ্ন বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই। এক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরা এড়িয়ে পেছন থেকে ওই বারান্দা দিয়ে কিংবা পাশের ভবন অথবা ফ্ল্যাট থেকে যেকেউ এখানে ঢুকতে পারবে।’
‘আমরা পুলিশকে এই বিষয়টি তদন্ত করতে বলেছিলাম। কিন্তু, তারা স্পষ্টতই সেটা গ্রাহ্য করেনি’, যোগ করেন তিনি। বাদীর অভিযোগ, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিই তার বোনকে হত্যা করেছেন। ‘আনভীর যদি নির্দোষই হবে, তাহলে তার পরিবারের কিছু সদস্য দেশ ছাড়ল কেন?’, বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ প্রভাব খাটিয়ে গণমাধ্যমের একটা অংশকে আমার বোনের চরিত্র হননের কাজে লাগাচ্ছে। এমনকি সম্ভবত আনভীরের দিক থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য শারুনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করতে বসুন্ধরা গ্রুপ আমার একমাত্র ভাইকে প্ররোচিত করেছে।’
গত ১ মে এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন কলেজশিক্ষার্থীর ভাই। তবে, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত দুই বছর ধরে ভাইয়ের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না বলে দাবি করেন তার বড় বোন। এক্ষেত্রে বাদীর বক্তব্য শোনার পর আদালত কলেজশিক্ষার্থীর আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যা মামলার সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।
কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সফিউল আহমেদ বাবুল বলেন, ‘ওই কলেজশিক্ষার্থী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। আমরা চাই এর সঠিক তদন্ত হোক। দ্রুত বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিকে গ্রেপ্তার করা হোক।’
এই কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যুতে দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। প্রতিবাদ হয় কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়।

Related Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

পুনর্গঠিত হলো বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ

সভাপতি আলহাজ্জ্ব ফেরদৌস স্বাধীন ফিরোজ : সাধারণ সম্পাদক এড. মো: ফারুক উজ্জামান ভূইয়া টিপু আকাশ বাবু:বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক স্বাধীন...

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

Rajpath Bichtra E-Paper: 20/10/2021

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী আজ

আজ (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী। ১৯৬৪ সালে আজকের এই দিনে রাশিদা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন...

‘আইএমইডি’র নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন করোনা দূর্যোগেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’

তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে...