Monday, September 20, 2021

‘অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল’এর সাইনবোর্ডে আখতারুজ্জামানের জঙ্গী তৎপরতা

  • মাউশির এখতিয়ার বহির্ভূত অনুমোদন
  • অনুমতি নিম্ন মাধ্যমিকের, চলছে প্লে থেকে এ লেভেল পর্যন্ত
  • মালিকানা দ্বন্দ্বে বেরিয়ে এসেছে আসল তথ্য
    বিতর্কিত কার্যক্রমে লিপ্ত থাকার দায়ে ৪ বছর আগে সরকার রাজধানীর লালমাটিয়ার পিস ইন্টারন্যাশনাল স্তুলের নিবন্ধন বাতিল করেছে। সেই প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে আরেকটি স্তুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পিস স্তুলেরই অধিকাংশ পরিচালক যুক্ত আছেন এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। লালমাটিয়া, উত্তরা ও মিরপুরে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনহীন শাখাও পরিচালিত হচ্ছে। মিরপুরের শাখা ক্যাম্পাসের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে তথ্যটি প্রকাশ পায়। মূলত: অনলাইন গ্রুপের আখতার খানের গোপন তত্ত্বাবধানেই চলছে স্তুলটি। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় দেড় হাজার ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করছে। পিস স্তুলই ‘অ্যাভেরোজ’- এ তথ্য প্রকাশের পর অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে অভিভাবকদের অনেকেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে যোগাযোগ করছেন।
    যোগাযোগ করা হলে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্তুলের উপাধ্যক্ষ ডালিয়া নওরিন মোবাইল ফোনে জানান, তিনি পিস স্তুলের উপাধ্যক্ষ ছিলেন। অ্যাভেরোজের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কয়েকজন পিস স্তুলের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
    ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারী অন্তত দু’জন জঙ্গি ভারতের ইসলামিক বক্তা জাকির নায়েকের বক্তব্যে প্ররোচিত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর ১১ জুলাই দেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়। তখন জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা এবং বিতর্কিত কার্যকলাপের অভিযোগে ৩ আগস্ট পিস স্তুল বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
    সূত্রমতে, এরপর একই স্থানে নাম বদল করে ‘রেড ব্রিজ’ নামে আরেক স্তুলের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। রেড ব্রিজে চারজন যুক্ত ছিলেন- খান সাইফুল্লাহ রেড ব্রিজের প্রতিষ্ঠাতা, আনিছুর রহমান চেয়ারম্যান, আনিসুর রহমান সোহাগ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জেডএম রানা পরিচালক আর নেপথ্যে ছিলেন আখতার খান। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর রেড ব্রিজ বন্ধ করা হয়। পরে ‘অ্যাভেরোজ’ নামে স্তুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটির সঙ্গে আনিসুর রহমান সোহাগ ও জেডএম রানা যুক্ত আছেন। সোহাগ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রানা মিরপুর ক্যাম্পাসের পরিচালক। এ দু’জন অবশ্য পিস স্তুলের সঙ্গে ছিলেন না। কিন্তু অ্যাভেরোজের চেয়ারম্যান খান আখতারুজ্জামান পিস স্তুলের পরিচালক, পিস স্তুলের চেয়ারম্যান মুফতি ইব্রাহিম অ্যাভেরোজের পরিচালক আর পিস স্তুলের পরিচালক গোলাম মোস্তফা অ্যাভেরোজের পরিচালক (অর্থ) হিসেবে আছেন। এছাড়া পিস স্তুলের অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ জামান ‘উইটন’ নামে লালমাটিয়ায় আরেকটি স্তুল প্রতিষ্ঠা করেছেন।
    বিলুপ্ত রেড ব্রিজ স্তুলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে জেডএম রানা বলেন, জামায়াতপন্থীদের বাদ দিয়ে পিস স্তুলের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে তারা রেড ব্রিজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুলিশের চাপে তারা আর স্তুলটি চালাতে পারেননি। তখন রেড ব্রিজের কয়েকজন সাবেক পিস স্তুলের উদ্যোক্তাদের নিয়ে অ্যাভেরোজ প্রতিষ্ঠা করলে তিনি বেরিয়ে যান। পরে ব্যবসায়িক চিন্তা করে তিনি মিরপুরে অ্যাভেরোজের একটি শাখা নেন। তিনি যে শাখাটি নিয়েছেন সেটির শুরুতে অনুমোদন ছিল না। অনুমোদন নিয়ে দেবে- এ শর্তেই তিনি শাখাটি নেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও বৈধতা সংক্রান্ত কাগজপত্র না দেয়ার পর তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন অ্যাভেরোজের অনুমোদন প্রক্রিয়াও বৈধ নয়। এ নিয়েই তার সঙ্গে উদ্যোক্তাদের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
    সূত্রমতে, অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্তুলটির নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) ঢাকা অঞ্চল থেকে ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি অনুমোদন নেয়া হয় অভৈধভাবে বেনজীর আহমেদকে মোটা অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ করে। কিন্তু আইন অনুযায়ী এ সংস্থা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেয়ার এখতিয়ার রাখে না। ১৯৬২ সালের বেসরকারি স্তুল নিবন্ধন অধ্যাদেশ এবং ২০১৭ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী বিদেশি কারিকুলামের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধন দেবে (ঢাকা) শিক্ষা বোর্ড। সেই হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন সঠিক হয়নি। পাশাপাশি মাউশির ঢাকা অঞ্চলও অবৈধ কাজ করেছে। বিষয়টি রহস্যজনক বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
    এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির চারজন উদ্যোক্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে উপাধ্যক্ষ ডালিয়া নওরিন জানান, তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরি করেন। বিস্তারিত তথ্য দেয়ার এখতিয়ার তার নেই।
    অ্যাভেরোজের বর্তমানে লালমাটিয়ায় তিনটি ক্যাম্পাস আছে। এগুলো আছে বি-ব¬কের ৪/৯, ৭/১৬ এবং ৬/৭ ঠিকানায়। প্রথম ঠিকানায়ই ছিল পিস স্তুল। সরকারের চোখ ফাঁকি দিতে অ্যাভেরোজ অনুমোদন নেয়া হয়েছিল ১/৫ লালমাটিয়ায়। সেখানে ক্যাম্পাস পরিচালিত হচ্ছে না। এছাড়া উত্তরায় ৭ নম্বর সেক্টরে এবং মিরপুরে ৫/৫ রূপনগরে শাখা চালু করা হয়। অনিয়মের এখানেই শেষ নয়, মাউশি থেকে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের অনুমোদন নেয়া হলেও শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই ‘ও’ লেভেল পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি ব্যাচের পরীক্ষাও হয়েছে এ প্রতিষ্ঠান থেকে। আর পাঠদান চলছে প্লে গ্রুপ থেকে ‘এ’ লেভেল পর্যন্ত।
    মিরপুর শাখার পরিচালক জেডএম রানা বলেন, এমন অনিয়ম ও অবৈধ কার্যক্রমের প্রতিবাদ করার কারণেই আমার সঙ্গে বিরোধ বাধে। একটি চুক্তির অধীনে ২ বছর আগে রূপনগরে মিরপুর ব্রাঞ্চ প্রতিষ্ঠা করি। ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। এখানে ইংলিশ মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১৯০ জন শিক্ষার্থী আছে। চুক্তি ভঙ্গ করে ছাত্রছাত্রীদের প্রধান ক্যাম্পাসের মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস করাতে নোটিশ দেয়া হয়। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি, শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগ করেছি। এছাড়া মিরপুর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
    আসাদুজ্জামান নামে এক অভিভাবক জানান, স্তুলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তারা শিক্ষার্থীর টিউশনসহ অন্য ফি জমা দিতেন। সম্প্রতি এসএমএসে টিউশন ফি পরিশোধ না করা এবং শাখা স্থানান্তরের বার্তা আসে। এরপর তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন মিরপুর শাখার পরিচালকের সঙ্গে মূল শাখার বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। তার দুই বাচ্চা স্তুলে পড়ে। এখন তিনি সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। কয়েকজন অভিভাবক জানান, শাখা নিয়ে বিরোধের পর তারা জানতে পারেন যে, পিস স্তুলেরই বর্ধিত রূপ অ্যাভেরোজ। এটা জানার পর তারা আতঙ্কিত। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের স্তুল পরিদর্শক অধ্যাপক আবুল মনসুর ভূঞা বলেন, বোর্ড থেকে ১১০টি বিদেশি কারিকুলামের স্তুল অনুমোদন নিয়ে চলছে। এর মধ্যে অ্যাভেরোজ নামে কোনো স্তুলের অনুমোদন নেই। আইন অনুযায়ী স্তুলের অনুমোদন নিতে হয় শিক্ষা বোর্ড থেকেই। স্তুলটির অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বোর্ডে লিখিত অভিযোগ এসেছে। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া খান আখতারের ইসিবি থেকে কালশি মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে সরকারি খাস জমি দখল করে জাল দলিল বানিয়ে হাইরাইজ ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

Related Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles

ধারাবাহিক : পলাশ রাঙা দিন

নুসরাত রীপা পর্ব-১৬ তুলির বিয়েতে মীরা আসবে না শুনে বিজুর খুব মন খারাপ । মীরাকে মায়ের কলিজা বলে মা কে ক্ষ্যাপালেও মীরাকে ও আপন বোনের মতোই...

প্রকৃতিকন্যা সিলেট- নয়নাভিরাম রাতারগুল

মিলু কাশেম অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা...

হাওড়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের জমকালো উদ্বোধন

দুই নায়িকা নিয়ে জায়েদ খান মিশা ডিপজল রুবেল হেলিকপ্টারে চড়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট উদ্বোধন করতে এসেছিলেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান, জনপ্রিয় খল অভিনেতা মিশা...

মৎস্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদমৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৭২ শতাংশ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে...

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ

মৎস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। পরিকল্পনা মাফিক যুগোপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করায় এই সাফল্য এসেছে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ।...